মিডল ইস্ট মনিটরের নিবন্ধ

ইরানে যুদ্ধ সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। এর সূচনা হয়েছিল আরও কয়েক দশক আগে। ১৯৫৩ সালের দমবন্ধ করা আগস্টে, সিআইএ কর্মকর্তা কারমিট রুজভেল্ট জুনিয়রের দপ্তরে। তিনি ছিলেন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাতি এবং একটি অভ্যুত্থানের নকশাকার।
এই যুদ্ধের শুরুটা তখনই হয়, যখন মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সিদ্ধান্ত নেয় যে—‘গণতন্ত্র খুবই বিপজ্জনক জিনিস।’ একটি জাতির নিজের তেল, নিজের সার্বভৌমত্ব, নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তাদের কাছে ছিল নিছক এক অসুবিধা, যেটিকে নিঃশেষ করে দিতে হবে।
ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ছিলেন ঠিক সেই ধরনের নেতা, যাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিমা বিশ্ব মুখে মুখে সমর্থন করার দাবি করত। মোসাদ্দেক ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত, পার্লামেন্ট এবং শাহ রাজপরিবার—উভয়ের অনুমোদিত। তিনি বিশ্বাস করতেন—হয়তো সরলভাবে, অথবা হয়তো প্রাণঘাতী ভুল করে—যে আইন একটি দেশের সম্পদের ওপর তার অধিকার রক্ষা করতে পারে।
সেই বিশ্বাস থেকেই ১৯৫১ সালে তিনি যখন অ্যাংলো–ইরানিয়ান ওয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করেন, তখন তিনি পশ্চিমাদের চোখে এক অমার্জনীয় অপরাধ করেন। কারণ তিনি সত্যিই তা করতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মেয়াদ ফুরিয়ে এলেও, এই সত্য মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। আর ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের নিভু নিভু প্রাণবায়ুটুকু ধরে রাখতে তিনি দ্বারস্থ হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি. আইজেনহাওয়ারের। আইজেনহাওয়ার সাড়া দেন। জন্ম নেয় অপরেশন অ্যাজাক্স।
পতন হয় ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারের। রেজা শাহ পাহলভীকে আবার ফিরিয়ে আনা হয় তাঁর ময়ূর সিংহাসনে। নমনীয়, অলঙ্কারসর্বস্ব, পশ্চিমাপন্থী এক শাসক। তেল আবার প্রবাহিত হতে থাকে লন্ডন ও ওয়াশিংটনের দিকে। আর ইরানিরা পায় এক শিক্ষা, যা পরবর্তী সত্তর বছরকে সংজ্ঞায়িত করে দেয়—আমেরিকার গণতন্ত্র এমন এক অস্ত্র, যা সে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, কখনো উপহার হিসেবে দেয় না।
মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় নিরাপদ হয়ে ওঠা শাহ এরপর সংযমের ভানটুকুও ত্যাগ করেন। তিনি গড়ে তোলেন সাভাক। সিআইএ ও ইসারয়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক গোপন পুলিশ বাহিনী, যা ছিল মূলত নির্যাতন ও গুমের যন্ত্র। বিদেশি হস্তক্ষেপের বাস্তব ফলের জীবন্ত প্রতীক হয়ে ওঠে এই বাহিনী। ভিন্নমতাবলম্বীদের গ্রেপ্তার, প্রহার ও হত্যা করা হয়। উদারপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়। রাজনৈতিক ভারকেন্দ্র শূন্য হয়ে যায়। সেই শূন্যতায় টিকে থাকে একমাত্র শক্তি—মসজিদ।
আমেরিকা শুধু একটি সরকার উৎখাত করেনি। তারা কার্যত ইরানিদের পরবর্তী বিপ্লবী নেতৃত্বও বেছে দিয়েছিল। বিপ্লবীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানত, যে মার্কিন দূতাবাস আসলে শাসন পরিবর্তনের কমান্ড সেন্টার। তারা তা ঘটতে দেখেছে। তার পরিণতির মধ্যেই তারা বড় হয়েছে। ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ স্লোগান কেবল ইরানিদের কাছে কোনো স্লোগান ছিল, ছিল এক তরতাজা স্মৃতি।
কিন্তু রুহুল্লাহ খোমেনির বিপ্লব ইরানের সীমান্তে থেমে থাকেনি। এটাই দ্বিতীয় মৌলিক পাপ, যা একটি আঞ্চলিক শক্তিকে আঞ্চলিক বিপর্যয়ে পরিণত করে। খোমেনি ঘোষণা করেন, ইসলামি বিপ্লব কোনো জাতীয় ঘটনা নয়, এটি সর্বজনীন। তিনি এটি রপ্তানি করবেন। উপসাগরের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজতন্ত্রগুলোকে ভেঙে ফেলবেন। আমেরিকার স্বার্থরক্ষাকারী পুতুল রাজা-আমিরদের সরিয়ে দেবেন। ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত ও সৌদি আরবের শিয়া জনগোষ্ঠীকে জ্বালিয়ে তুলবেন নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অগ্রদূত হিসেবে।
উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো এই হুমকি সঙ্গে সঙ্গেই, প্রবলভাবে বুঝতে পারে। এসব আদর্শিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল না তেলসম্পদ ও পশ্চিমা সামরিক সুরক্ষায় টিকে থাকা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো। খোমেনি তাদের আখ্যা দেন অনৈসলামিক, অবৈধ, ‘মহা শয়তানের’ দাস হিসেবে। এটি ছিল কার্যত মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা। সৌদি আরবে শিয়ারা সংখ্যালঘু ছিল। দেশটির ইতিহাসে ১৯৭৯ সালে মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ বা কাবা দখল করতে গিয়েছিল একদল উগ্র সুন্নিরা। সেই দখলের অভিজ্ঞতা থেকে রিয়াদ তেহরানকে দেখতে থাকে অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা–জিসিসি কোনো অর্থনৈতিক জোট ছিল না; ছিল ইরানি বিপ্লবী সংক্রমণের বিরুদ্ধে এক প্রকার প্রতিরক্ষামূলক জোট।
ইরাকে অবশ্য সাদ্দাম হোসেন এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করেননি। তিনি যুদ্ধ শুরু করেন। আট বছরের যুদ্ধে প্রায় ১০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। যুক্তরাষ্ট্র নীরবে সাদ্দামকে সমর্থন দেয়, কারণ, খোমেনি ছিল বড় শত্রু। ওয়াশিংটন তাঁকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল।
এটাই প্রত্যাঘাতের নকশা–কৌশল। ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান শুধু মোসাদ্দেককে উৎখাত করেনি। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি মধ্যপন্থী, গণতান্ত্রিক ইরানের সম্ভাবনাই বন্ধ করে দেয়। ভবিষ্যৎ তুলে দেয় কট্টর শক্তির হাতে—প্রথমে শাহের উগ্রতা, পরে আলেমদের। আর খোমেনির বিপ্লব রপ্তানির কৌশল শুধু উপসাগরকে অস্থিতিশীল করেনি। এটি পুরো অঞ্চলকে ঠেলে দেয় উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে এক সাম্প্রদায়িক শীতল যুদ্ধে। যার আগুনে পুড়েছে লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং বাহরাইন। এই প্রক্সি সংঘর্ষের আগুন নিভে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
কারমিট রুজভেল্ট দেশে ফিরে স্মৃতিকথা লিখেছেন, পুরস্কার পেয়েছেন। ইরানিরা পেয়েছে তাদের মৃতদের দেহ। অঞ্চল পেয়েছে যুদ্ধের পর যুদ্ধ। এই সংঘাতে নিক্ষিপ্ত প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রে লেগে আছে ১৯৫৩ সালের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি সাম্প্রদায়িক নৃশংসতায় প্রতিধ্বনিত হয় খোমেনির বিপ্লবী অহংকার। মোসাদ্দেকের ভূত এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের শহীদেরা শান্তিতে নেই। তারা বর্তমানের অস্বীকৃত স্থপতি। যত দিন আমরা যা ঘটেছিল তা সত্যিকারভাবে, মেদহীন ভাষায় স্বীকার না করব, তত দিন পুরোনো বিপর্যয়ের ভিত্তির ওপর নতুন বিপর্যয় গড়ে যেতে থাকবে।
আগুন জ্বালানো হয়েছিল বহু আগেই। সেই আগুনে এখনো পুড়ছে পুরো অঞ্চল।

এই হত্যাকাণ্ড এবং এর বিপরীতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে...
১১ ঘণ্টা আগে
গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কয়েক দশ আগেই। এই সত্যটাই ধীরে ধীরে সামনে আসছে এখন। এই বিষয়ে গাজায় দায়িত্ব পালন করা চারজন ইসরায়েলি সেনার সাক্ষ্য শোনা যাক।
১৮ ঘণ্টা আগে
বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও যুদ্ধের সময় সাধারণত সোনার বাজার চাঙা হয়ে ওঠে। নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগকারীরা তখন ঝুঁকে পড়েন এই মূল্যবান ধাতুর দিকে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সোনাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
১ দিন আগে
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র অস্থিরতার কারণে চলতি বছর ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে বাজার থেকে তারল্য বা বিনিয়োগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কারণে বাজার এখন এক প্রকার ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছে। ফলে তেলের
২ দিন আগে