Ajker Patrika

ইরান যুদ্ধ যেভাবে ধসিয়ে দিতে পারে পেট্রোডলারের একাধিপত্য

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৭: ০৪
ইরান যুদ্ধ যেভাবে ধসিয়ে দিতে পারে পেট্রোডলারের একাধিপত্য
ছবি: সংগৃহীত

ছাব্বিশ বছর আগে ইরাকের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যার ধাক্কা বাগদাদের সীমা পেরিয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছেছিল। তিনি ইরাকের তেল রপ্তানির মূল্য মার্কিন ডলারের বদলে ইউরোতে নির্ধারণের উদ্যোগ নেন। সে সময় অনেক পর্যবেক্ষক এটিকে একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতীকী অবাধ্যতা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার আর্থিক চাপ শিথিলের বাস্তব প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন।

এই পরিবর্তন ইরাকের আজকের ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র কারণ নয়। তবে সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বৃহত্তর সংঘাত চলছিল, তাতে এটি নতুন মাত্রা যোগ করে। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ সবার জানা। আলোচিত ৯/১১—এর ঘটনার পর রাসায়নিক, জৈব ও পারমাণবিক অস্ত্র থাকার অভিযোগে ইরাক আক্রমণ করে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। পরে তদন্তে কোনো সক্রিয় গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যুদ্ধের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যগুলো পরে অগ্রহণযোগ্য বা গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়।

ইঙ্গ–মার্কিন বাহিনীর ইরাক দখল এবং শেষ পর্যন্ত সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যুদণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠায়—যারা জ্বালানি বাণিজ্যে ডলারের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাদের প্রবল রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে পড়ার হুমকি রয়েছে।

ইউয়ানভিত্তিক জ্বালানি বাণিজ্য এবং ডলার আধিপত্যের ক্ষয়

প্রায় দুই দশক ধরে সে বার্তাই কার্যকর ছিল। কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতিগুলো, বিশেষ করে চীন যখন বৈশ্বিক উৎপাদন ও বাণিজ্যে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে থাকে, তখন জ্বালানি বাজারের কাঠামোও বদলাতে শুরু করে। প্রথম পদক্ষেপ নেয় ইরান। ২০২১ সালে তেহরান বেইজিংয়ের সঙ্গে ২৫ বছরের একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ইউয়ানে বিক্রি শুরু করে। যতক্ষণ এটি কেবল ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, ওয়াশিংটন একে নিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু তা সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এরপর, ২০২৩ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি সৌদি আরামকো এবং চীনের সিনোপেকের মধ্যে হওয়া এক চুক্তির ফলে দুই দেশের তেল বাণিজ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হতে শুরু করে। ক্রমেই লেনদেনের বড় অংশ সম্পন্ন হতে থাকে ডিজিটাল ইউয়ান ব্যবহার করে, যা বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থায় ডলারের আধিপত্য দুর্বল করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মুদ্রা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একই বছরে, পারস্য উপসাগরের অন্যতম প্রধান গ্যাস রপ্তানিকারক কাতার ও চীনের পেট্রোচায়নার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চুক্তি করে। এখানেও ডলারকে পাশ কাটানো হয়। ২০২৫ সালের মধ্যে একাধিক ঘটনা ওয়াশিংটনকে অস্থির করে তোলে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) নিজ দেশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিকস দেশগুলোর মাঝামাঝি এক ‘সুইং স্টেট’ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যান, যাতে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বেশি প্রভাব অর্জন করা যায়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরান–চীন বাণিজ্যের এক করেসপনডেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, একই সঙ্গে ইরানের ব্রিকসে যোগদানের দিকেও এগোতে থাকে। রিয়াদ নিজেও সংস্থাটির দোরগোড়ায় অপেক্ষা করছিল। কাতারও একই পথ অনুসরণ করে। এদিকে আঙ্কারা–দোহা অক্ষ আরও গভীর সহযোগিতা গড়ে তোলে। কারণ উভয় দেশই আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে চেয়েছিল। এই পরিবর্তনগুলো প্রতিফলিত হয় উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলের (জিসিসি) উদ্যোগেও। বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও ওমান যৌথভাবে চীন এবং অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস–আসিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করে, যা বিস্তৃত ইউরেশীয় অর্থনৈতিক দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়।

ওয়াশিংটনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরিস্থিতি দ্রুত সতর্ক সংকেত থেকে বিপৎসংকেত রূপ নিচ্ছিল। সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ক্রমবর্ধমান নব্য-বাণিজ্যবাদী অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। প্রথম লক্ষ্যবস্তু হয় ভেনেজুয়েলা। চাপ ও হস্তক্ষেপের সমন্বয়ে ওয়াশিংটন তেলের সরবরাহ লাইন সুরক্ষিত করতে চেয়েছিল এবং একই সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে নিজের প্রভাব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এর ফলে চীনের অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসও বিঘ্নিত হয়।

তবে ইরান অবিচল থাকে। বাহ্যিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা কোনো শাসন পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালায় এই ধারণায় যে ইরান দ্রুত নতিস্বীকার করবে। কিন্তু যুদ্ধের ২৫ তম দিনেই সেই প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে। লড়াই অব্যাহত থাকে এবং পারস্য উপসাগর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা ও মার্কিন মিত্রদের ওপর প্রতিক্রিয়া

সংঘাতকে পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে দেওয়ার তেহরানের কৌশল ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ওপর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব শুধু তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলে সীমাবদ্ধ নয়; বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং শিল্প উৎপাদনেও এর অভিঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ থেকে ৩৮ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। বর্তমানে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পথটি বন্ধ ঘোষণা না করলেও তেলের প্রবাহ প্রায় থেমে যাওয়ার মতো অবস্থায় নেমে এসেছে।

সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার মাত্রা অত্যন্ত গুরুতর। ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে যেত। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ একই পথে পরিবাহিত হয়েছিল। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, পারস্য উপসাগরের জাহাজ চলাচলে বড় ব্যাঘাত ঘটলে বৈশ্বিক সরবরাহ থেকে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল (বিপিডি) কমে যেতে পারে। এতে উৎপাদন নেমে যেতে পারে আগের যে কোনো সময়ের বড় ধাক্কার সময়কার স্তরে।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও কাজাখস্তানের উৎপাদনে আংশিক পুনরুদ্ধার কিছু ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে, তবে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্যহীনতা তীব্রই রয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে জোট যে অভিযান শুরু করেছিল তার প্রথম দিন থেকেই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কোপ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর। এতে হোয়াইট হাউসের হিসাব-নিকাশের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ড। জাপান তার অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে পশ্চিম এশিয়া থেকে, যার বড় অংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। দক্ষিণ কোরিয়া ওই অঞ্চল থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান পায়, যার ৯৫ শতাংশেরও বেশি এই প্রণালি অতিক্রম করে।

যুদ্ধের আগে তেল আবিব সফর করায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দেশে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে রাশিয়ার তেল রপ্তানি বাড়ানোর আগ্রহ কিছুটা চাপ কমিয়েছে ভারতের ওপর। সেই সহায়তা না থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে পারত। বাজারের অস্থিরতা বাড়তে থাকায় জাপান জরুরি মুদ্রানীতি বৈঠক ডেকেছে। দেশীয় বাজার স্থিতিশীল করতে ৬০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মার্কিন সম্পদ বিক্রি করা হবে কি না তা নিয়ে কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন। সিউলের পরিস্থিতিও কম জটিল নয়। রপ্তানিনির্ভর শিল্পভিত্তি আমদানি করা জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বড় কনগ্লোমারেটগুলোর উৎপাদন টিকিয়ে রাখাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

বিকল্প পথ ও নড়বড়ে সরবরাহ সমাধানের চেষ্টা

আঞ্চলিক উৎপাদকেরা ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওপেকের সবচেয়ে বড় উৎপাদক সৌদি আরব মিসরের সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে রপ্তানি ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বসরার প্রধান রপ্তানি চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরাক দক্ষিণ রুমাইলা তেলক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। ১২ মার্চ ইরাকের তেলমন্ত্রী হায়ান আবদুলঘানি জানান, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ লাখ ব্যারেল তেল তুরস্ক, সিরিয়া ও জর্ডান হয়ে ট্যাংকারে পাঠানো যেতে পারে। এতে উত্তরের রপ্তানি সক্ষমতা দৈনিক ৪ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল পর্যন্ত বাড়তে পারে।

চাপের মুখে কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারও পরিকল্পনাটি অনুমোদন দিয়েছে। তবে এই চালান টিকবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইরাকি জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানায় কি না তার ওপর।

আর্থিক বাজারে টালমাটাল, উপসাগরীয় অর্থনীতি সংকোচনের আশঙ্কায়

সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেই শঙ্কা স্পষ্ট হওয়ার পরই বাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। ৪ মার্চ এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস নামে। সাংহাই সূচক প্রায় ১ শতাংশ, জাপানের নিক্কেই ৩ শতাংশের বেশি, কোরিয়ার কসপি ১২ শতাংশেরও বেশি এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং ২ শতাংশ পড়ে যায়। ইউরোপীয় বাজারে সামান্য উত্থান দেখা গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে মাত্রার ব্যাঘাত ঘটছে তার প্রতিফলন শেয়ারবাজারে এখনো পুরোপুরি পড়েনি। সামনে আরও বড় ধাক্কা আসতে পারে।

উপসাগরীয় বাজারে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহর একটি বড় তেল টার্মিনালে ইরানি ড্রোন হামলা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা দেয়। পরে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। দুবাইয়ের প্রধান সূচক ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যায়, মূলত ইমার প্রপার্টিজের শেয়ারদর তীব্র পতনের কারণে। সংঘাত শুরুর পর থেকে সূচকটির বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ কমে গেছে। আবুধাবির বাজারমূল্য ৭৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে। কাতারের প্রধান সূচকও পড়ে গেছে। আঞ্চলিক ব্যাংকিং জায়ান্ট কিউএনবির শেয়ার ২ শতাংশ কমেছে।

বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করেছে, হরমুজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এ বছর কাতার ও কুয়েতের জিডিপি সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এটি হবে তাদের সবচেয়ে খারাপ মন্দা। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিকল্প রপ্তানি পথ থাকায় তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকতে পারে, তবে তাদের অর্থনীতিও ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে।

তেলের দাম বাড়ায় পশ্চিম এশিয়ার বাইরের লাভবান উৎপাদকেরা

কিছু উৎপাদক এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হতে পারে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে রাশিয়া। তাদের জ্বালানি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে শিথিল হচ্ছে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ভারতের নতুন চাহিদা রাজস্ব বাড়াচ্ছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও এখন নিজেদের নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটানোর উপায় নিয়ে ভাবছে। সম্ভাব্য অন্য লাভবানদের মধ্যে রয়েছে উত্তর সাগরের উৎপাদক নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য, শেল-সমৃদ্ধ কানাডা, খনিজ সমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। অস্ট্রেলিয়া ও ব্রুনেইও লাভ দেখতে পারে।

তেলের দাম তীব্র ব্যাপক ওঠানামা করছে। ২৩ মার্চ ১১ শতাংশ পতনের পর উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৪ ডলারের কাছাকাছি উঠেছে, যা যুদ্ধের আগে ৭২ ডলারের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পশ্চিম এশিয়ার বাইরের উৎপাদকেরা অপ্রত্যাশিত বিপুল মুনাফা পাওয়ার অবস্থানে রয়েছে।

পেট্রোডলার, ঋণ এবং বিশ্ব অর্থনীতির অদৃশ্য ইঞ্জিন

উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো শুধু জ্বালানি সরবরাহ করে না, তারা এমন তারল্য সৃষ্টি করে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সচল রাখে। পেট্রোডলার পুনর্বিনিয়োগ লন্ডন ও নিউইয়র্ক থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট ও টোকিও পর্যন্ত বন্ড বাজারকে ভিত্তি জোগায়। এই স্থিতিশীল মূলধন প্রবাহের কারণে বিপুল ঋণে জর্জরিত পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো তুলনামূলক সহজে ধার নিতে পেরেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণই ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ বছর আরও ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শত্রুতার সূচনা থেকে বাজারে যে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তা এই আর্থিক কাঠামো টিকে থাকবে কি না, সে বিষয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রতিফলন। নিরাপদ আশ্রয়ের প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে চুরমার করছে বাজারের অনিশ্চয়তা।

সাধারণত ভূরাজনৈতিক সংকটে বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণসহ নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এবার সেই ধারা ভেঙে গেছে। যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় ৪ শতাংশ কমেছে, নাসডাক হারিয়েছে ৩ শতাংশ। স্বর্ণের দাম কমেছে ৫.৫ শতাংশ, আর রুপার দাম পড়েছে ১৩ শতাংশেরও বেশি। এর একটি কারণ তারল্য সংকট। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানি ব্যয় মেটাতে বাজারের অংশগ্রহণকারীদের স্বর্ণ বিক্রি করতে হয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে ফেডারেল রিজার্ভ, কতটা কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও মূল্যবান ধাতুর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

ডলার সূচকের শক্তিশালী হওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন তথা মাগা অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকদের জন্য কম সুদের হার ও দুর্বল ডলারের ওপর নির্ভর করে শিল্প পুনরুজ্জীবন ও ঋণ পুনঃঅর্থায়ন চালিয়ে যেতে চাওয়ার বর্তমান প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তেলের বাইরে: ঝুঁকিতে নৌপরিবহন, সেমিকন্ডাক্টর ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল

সংকট কেবল জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। হরমুজ প্রণালি এখন বৈশ্বিক পণ্যের ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত নেটওয়ার্কের একটি সংকটপূর্ণ গলদ্বার হয়ে উঠেছে। জাহাজ চলাচল চালু থাকলেও বিমা প্রিমিয়াম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধঝুঁকির বিমার নতুন করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে অথবা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সামুদ্রিক পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর প্রভাব জ্বালানি ও অ-জ্বালানি উভয় বাণিজ্যেই পড়ছে।

অপ্রত্যাশিত দুর্বলতাও প্রকাশ পাচ্ছে। কাতারের রাস লাফান জ্বালানি কেন্দ্রের বিঘ্নের কারণে বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বন্ধ হয়ে গেছে। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও চিকিৎসা ইমেজিংয়ের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সারের ঘাটতি আরও গুরুতর হুমকি তৈরি করেছে। পারস্য উপসাগর ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া ও সালফারের একটি বড় উৎস। রপ্তানি কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক সার সরবরাহ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সংকুচিত হয়েছে, যা বিস্তৃত খাদ্য সংকটের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

লজিস্টিক জটিলতার কারণে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রপ্তানির জন্য নির্ধারিত ২১ লাখ টন ইউরিয়ার প্রায় অর্ধেক জাহাজে পৌঁছাতে পারেনি। ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ ইতিমধ্যে মূল্য পূর্বাভাস বাড়িয়েছে।

কৌশলগত ভাঙন, যা বদলে দিতে পারে মুদ্রাব্যবস্থার রূপরেখা

ওয়াশিংটন যদি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে হরমুজের বিঘ্ন একটি ধ্রুপদি ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ঘটনায় পরিণত হতে পারে। বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের হিস্যা ইতিমধ্যে ৭১ শতাংশ থেকে কমে ৫৯ শতাংশে নেমে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট এই পতনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। গত ১২ মার্চ হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটিও ট্যাংকার না চলাচলের নজিরবিহীন তথ্য হয়তো এমন এক যুগের প্রতীকী সমাপ্তি, যখন তেল ও ডলার ছিল অবিচ্ছেদ্য। পেট্রোডলার ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এর ভূরাজনৈতিক প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির গল্প নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে। তার আর্থিক আধিপত্য ক্ষয় হতে পারে। আর ইউরেশিয়া ও বৈশ্বিক দক্ষিণ জুড়ে দেশগুলো উদীয়মান বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পথ আরও জোরালোভাবে খুঁজবে। সোজা কথায় পেট্রোডলারের আধিপত্য ভেঙে যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জিয়ার নাম না বলায় বিএনপির স্বাধীনতার অনুষ্ঠান বর্জন, ইউএনও বদলি

বিশ্বের সবচেয়ে অপছন্দের দেশের তালিকা প্রকাশ

ইসরায়েলের পরমাণু বোমার তথ্য ফাঁসকারী আরব ইহুদি ভানুনুর ভাগ্যে কী ঘটেছিল

ট্রাম্পের নীতিতে খেপেছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাতে খুঁজছে দুর্বল জায়গা

খারগ দ্বীপের দখলে ভেঙে পড়বে আইআরজিসি, শেষ হবে যুদ্ধ: হোয়াইট হাউস

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত