Ajker Patrika

সংস্কার প্রচেষ্টা: সরকারের উদ্যোগে সন্দেহে বিরোধীরা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
সংস্কার প্রচেষ্টা: সরকারের উদ্যোগে সন্দেহে বিরোধীরা

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের বাস্তবায়ন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল উত্তপ্ত। বিরোধী দল অভিযোগ করছে, সরকার ক্ষমতার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা আরও বলছে, জুলাই চেতনার বিপরীতে গিয়ে গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সরকার। এই পদক্ষেপ দেশের কাঠামোগত পরিবর্তনকে বিলম্বিত করছে বলে মনে করছে বিরোধীরা।

তবে বিএনপি বারবার বলছে, তারা সংস্কারের বিপক্ষে নয় এবং জুলাই সনদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতি পালন করবে। তাদের নিজেদের ৩১ দফার কিছু প্রতিশ্রুতি জুলাই সনদেও অন্তর্ভুক্ত আছে।

বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের (এলজিআরডি) মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল হবিগঞ্জে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘কিছু রাজনৈতিক মহল আমাদের “সংস্কার-বিরোধী” হিসেবে উপস্থাপন করছে। বিএনপি বরাবরই জুলাই চেতনার পক্ষে এবং সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। দেশের মানুষের স্বার্থে গণতান্ত্রিক সংস্কার নিশ্চিত করতে আমাদের প্রতিশ্রুতি অটল।’

অধ্যাদেশ বিষয়ে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটি গত বৃহস্পতিবার তাদের প্রতিবেদনে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধনীসহ সংসদে পাসের জন্য সুপারিশ করেছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ পরে নতুন বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও ৯ এপ্রিলের মধ্যে বিল পাস না হলে এই অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ, সরকার ধীরগতি অবলম্বন করছে এবং দেশের কাঠামোগত সংস্কারের মূল প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাচ্ছে। এই ধীরগতি ক্ষমতার একক নিয়ন্ত্রণ রক্ষার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

যদিও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গতকাল ঝিনাইদহে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সঙ্গে গণভোট বাতিল হওয়ার বা না-হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করব। বিএনপি মনেপ্রাণে জুলাই চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে।’

রাজপথে আন্দোলনের শুরুর প্রেক্ষাপট এসেছে বুধবার সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর। পরদিন বৃহস্পতিবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বৈঠক করে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেয়। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, গতকাল শনিবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে তারা।

সমাবেশে সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলে ফলাফল সরকার জন্য সুখকর হবে না। সময়মতো গণভোটের রায় মেনে চললে দেশের চলমান সমস্যা সমাধান হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতা বলেন, সরকার গঠনের মাত্র এক-দুই মাস পেরিয়েছে। এত প্রশ্ন ওঠার কোনো কারণ নেই। দেশের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কার সময়মতো করা হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন সমাবেশে বলেন, গণভোট কার্যকর করলে সংবিধান অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে। তবে সরকারের অনিচ্ছা একক কর্তৃত্ব রক্ষার ইঙ্গিত দেয়। তারা মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন চায় না, তাই গণভোটের রায় কার্যকর হচ্ছে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অধ্যাদেশগুলোতে কিছু অসংগতি থাকতে পারে। তবে তারা আশাবাদী যে সরকার জুলাই সনদকে সামনে রেখে সমস্যাগুলো সমাধান করবে। যদি অধ্যাদেশ বাতিল হয়, পরে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন করে আইন হিসেবে রূপ দেওয়া হবে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দলীয় স্বার্থে সরকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যাদেশ বাতিল করতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ব্যাহত হবে। আমরা চাই নতুন ফ্যাসিবাদের উত্থান না হোক। এই অধ্যাদেশগুলোই তা ঠেকাবে।’

অভিযোগ ও ব্যাখ্যা—উভয়ই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াত মনে করছে, সরকারের ধীরগতি গণতান্ত্রিক সংস্কারকে বিলম্বিত করছে। অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে দৃঢ় এবং সমস্যাগুলো সংবিধান অনুযায়ী সমাধান করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, এবং জনগণের নজর এখন অধ্যাদেশ ও সংস্কারপ্রক্রিয়ার দিকে। তাঁরা আশা করছেন, সঠিক সময়ে সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো আরও শক্ত হবে। তবে রাজনৈতিক দ্বিধা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিরোধী পক্ষের আন্দোলনের কারণে পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান গতকাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিরোধী পক্ষ রাজপথকে বেছে নিচ্ছে জনমত গঠনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে। সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে নতুন বিল আকারে আইন প্রণয়ন হলে তা সবাই মেনে নেবে। তা না হলে রাজপথ আবার উত্তপ্ত হবে। পরিস্থিতি মনে হয় সেদিকেই যাচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

অবশেষে অনশনরত স্বামীর হাত ধরে ঘরে ফিরলেন সেই স্ত্রী

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

ভূপাতিত বিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধারের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবে ইরান থেকে বের হতে পারেনি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত