Ajker Patrika

জাতীয় নির্বাচন এবং দুটি কথা

স্বপ্না রেজা
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণ ঠিক করে নিতে পারে আগামী বাংলাদেশ কোন পথে এগিয়ে যাবে। ফাইল ছবি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণ ঠিক করে নিতে পারে আগামী বাংলাদেশ কোন পথে এগিয়ে যাবে। ফাইল ছবি

জানুয়ারি মাস চলছে নতুন বছরের। আর ২৭ দিন পরেই ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি, এই নির্বাচন হবে ইতিহাসের অন্যতম একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। সুষ্ঠু তো বটেই। তাদের আরও দাবি হলো, বিগত ১৭ বছরে যা হয়নি এক বছর কয়েক মাসে সেটা করে দেখিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও উল্লেখযোগ্য কী করেছে, সেই তালিকা প্রকাশিত হয়নি, যা জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা নিরাপত্তাকে সুস্পষ্ট করতে পারে, শান্তি ও স্বস্তির কারণ হতে পারে। যা করেছে বা হয়েছে তা হলো, জুলাই সনদ প্রকাশ, কিছু তরুণকে ক্ষমতায় বসানো, বিগত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন ও মামলা করা, তাঁদের বিরুদ্ধে দুদককে তৎপর রাখা, সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন, নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা ইত্যাদি। এই সময়ে মব সন্ত্রাস লক্ষণীয় ছিল, যা জনগণের মধ্যে এখন আতঙ্কের কারণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক হেনস্তার শিকার হয়েছিল কেউ কেউ। পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্ব পালনে খুব একটা সক্রিয় থাকতে দেখা যায়নি। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় অনেক পুলিশ মারা যায়, কাউকে কাউকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এবং পরবর্তী সময়ে এই বিষয়ে কোনো কথা না ওঠায় পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতাবোধ কাজ করেছে বলে অনেকের অভিমত। সবকিছুর পর অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, সেটাই বড় কথা। যদিও এখনো কারও কারও ভেতর নির্বাচন নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে—‘আদৌ নির্বাচন হবে তো’ জাতীয় প্রশ্নে তারা ঘুরপাক খাচ্ছে।

যাহোক, নির্বাচন হওয়া জরুরি। সোজা কথা, একটা নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। বিগত সময়ের কারচুপির নির্বাচন নয়, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন। এটা ঠিক যে জনগণ যদি তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের মানুষ চিনতে ভুল করে, তবে তার খেসারত নিজেদেরই দিতে হবে। ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল একবার দিতে হলে পরেরবার তারা সেই ভুল সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবে কি না, সেটাও প্রশ্ন। নির্বাচন নিয়ে জনগণের ভেতরে অনেক মিশ্র অভিজ্ঞতা রয়েছে। ভোটারদের অনেক আশা, ভরসা ও প্রতিশ্রুতি দিয়েও প্রার্থীরা পরে সেসব আর মনে রাখেন না বলে অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। যুগ যুগ ধরে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার সংস্কৃতি চলে আসছে। এর ব্যতিক্রম তথা এমন সংস্কৃতিচর্চা নির্মূল করতে প্রয়োজন ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত প্রয়োগ অর্থাৎ তাঁরা যাঁকে ভোট দেবেন তিনি যেন সঠিক ব্যক্তি হন। বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে প্রার্থী মানুষ হিসেবে কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক, মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ইত্যাদি বিষয় একজন ভোটারের চিন্তাচেতনায় আসা জরুরি। রাজনৈতিক দলের জন্য রাতদিন পরিশ্রম করে ভোট দিয়ে ভোটার বা সমর্থকদের কোনো লাভ হয় না, যতটা লাভ হয় বা হয়েছে নির্বাচিত প্রার্থীর ও বড় বড় নেতাদের। ইতিহাসে এমন অসংখ্য নজির রয়েছে।

রাজনীতি হলো বাংলাদেশের এক অতি লাভজনক পেশা, এমন কথা একজন শিশুও বেশ বোঝে। রাজনীতিতে জড়িয়ে অঢেল ধনসম্পদ, অর্থ উপার্জন করেছে, এমন ঘটনাই রাজনীতির ইতিহাসে বেশি দৃশ্যমান। রাজনীতি করে ক্ষমতাসীন হলে তো আর কথাই নেই। ফলে পড়াশোনার পাট শেষ না করে রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে তরুণদের কেউ কেউ। দেশ গড়ার অভিপ্রায়ে তারা তৎপর হচ্ছে বিধায় শিক্ষাবিমুখতা দেখা দিয়েছে। অতীতে শিক্ষা অর্জনে ছাত্ররা ব্যস্ত থেকে দেশ নিয়ে ভেবেছে, এমন দৃষ্টান্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে ক্রমেই সেই ধরনের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। অনেকেই মনে করেন যে আদর্শচ্যুত রাজনীতি তথা রাজনীতির অপসংস্কৃতি দেশকে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণসমাজের একটা অংশ বিভ্রান্ত। প্রচলিত রাজনীতিতে দেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, জনগণের কল্যাণে নয় বরং ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠছে। এটাও ঠিক যে নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল লাগে। রাষ্ট্র শাসনের জন্য সেই রাজনৈতিক দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজয় লাগে। মোট কথা, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। কথা হলো, রাজনৈতিক দলগুলো আদতে পুরোনো ব্যর্থতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সমর্থ হবে কি না। অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে, জনগণই পারবে রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক পথে আনতে এবং সেটা ভোট প্রয়োগের মাধ্যমে। কারণ, জনগণই সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। এখানে সরকারের মূল কাজ হলো, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা। কোনো কিছুর সঙ্গে আপস না করা। এই জায়গাটা যদি বিশেষ কারও অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় না থাকে তাহলে দেশ এগোবে, দেশ সুরক্ষিত হবে। নতুবা আগের পরিস্থিতি বজায় থাকবে কিংবা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

না বলে উপায় নেই যে জনগণ ভীষণ ক্লান্ত, আশাহত। অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। কী হবে, কেমন হবে, কতটা মানবাধিকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে, বিচক্ষণতায় চলবে দেশ—এসব নিয়ে নানান ভাবনা, দুর্ভাবনা চারপাশে। একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি তা বর্তমান উন্নয়নশীল বাংলাদেশে বড় বেমানান। দেশকে পিছিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা বৈকি। বাংলাদেশের যে ক্রমবর্ধমান আর্থসামাজিক উন্নয়ন তাতে নারীর অংশগ্রহণকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নারী-পুরুষ সবার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশ বিশ্বে তার অবস্থান হারাবে। এমনকি দেশ তার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

রাজনৈতিক দোষারোপের সংস্কৃতি যেন মুখ্য হয়ে না ওঠে। বরং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা ও কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যাওয়া দরকার। কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান যেন ফ্যাসিস্ট রূপে আত্মপ্রকাশ না ঘটায় তার জন্য সচেষ্ট, সচেতন হতে হবে সাধারণ জনগণকে। দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে না পারলে সেটা কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে তাদের দলে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। শোনা যায়, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই প্রক্রিয়া চলছে। যদি সত্য হয় তাহলে হবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অতীত রাজনীতির অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি। এই সংস্কৃতি দিয়ে দেশের অবস্থার পরিবর্তন আসবে না, আসতে পারে না।

এবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণ ঠিক করে নিতে পারে আগামী বাংলাদেশ কোন পথে এগিয়ে যাবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

রাজধানীর উত্তরায় সাততলা ভবনে আগুন: একই পরিবারের ৩ জনসহ নিহত বেড়ে ৬

আজকের রাশিফল: ইগোটা আলমারিতে রাখুন, তেল দিতে গেলে পিছলে পড়বেন

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক, সরকারের আলোচনায় সমর্থন তারেক রহমানের

প্রশ্নটা কেন তামিমকে করেন না, মিঠুনের জিজ্ঞাসা

শূকর জবাইয়ে সহায়তা চেয়ে পোস্ট তরুণীর, পরদিনই হাজারো মানুষের ঢল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত