Ajker Patrika

দেশীয় জাত সংরক্ষণে বীজ মেলা

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র 
দেশীয় জাত সংরক্ষণে বীজ মেলা
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

সম্প্রতি ক্রমেই বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় বীজের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, বীজের বিস্তারের লক্ষ্যে গ্রামীণ বীজ মেলা অনুষ্ঠিত হলো খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায়। এই বীজ মেলায় স্থানীয় ১৭ গ্রামের অর্ধশতাধিক নারী বীজ প্রদর্শন, বিনিময় ও বিক্রি করেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকজ ও মৈত্রী কৃষক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে শত শত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা বিলুপ্তপ্রায় দেশি ধান মরিচশাইল, রানীস্যারোট, হিজলি, দিঘা, মোরগশাইল, কালামানিকের বীজ এনেছিল। এ ছাড়া তারা আলু, পটোল, ধনিয়া, সরিষা, শিম, তিল, তিসি, ডাল ইত্যাদির বীজ নিয়ে এসেছিল। আলু, আদা, হরীতকী, লালশাক, পালংশাক, টমেটো ও কালিজিরার বীজও এনেছিল।

কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ধানের শতাধিক বিলুপ্তপ্রায় জাতের কথা উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, সাদা মোটা, কালাকোরা, কালিজিরা, কাজলশাইল, স্বর্ণ মুসুরি, জামাইভোগ, রাজা, বিন্নি, শালি, লালচল্লিশ প্রভৃতি বহু জাতের ধান আজ বিলুপ্ত বা বিলুপ্তির পথে। এর মূল কারণ আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় উচ্চফলনশীল জাতের অধিক চাষ। কৃষকেরা সেখানে ব্রি-৭১, ব্রি-৭৫, ব্রি-৭৬, ব্রি-২৯, ব্রি-৯৬ জাতের ধান বেশি চাষ করেন। কারণ এতে ফলন যেমন বেশি, লাভও বেশি। দেশি ধানের উৎপাদন কম। তাই কৃষকের কাছে এসব উচ্চফলনশীল ধানের জাতের কদর বেশি। কিন্তু এতে একটা ক্ষতি নীরবে ঘটে যাচ্ছে। এসব উচ্চফলনশীল জাতের ধানের বীজ চাষ করলে জমির উর্বরতাশক্তি ধীরে ধীরে কমে যায়। পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তথ্যমতে, ১৯১১ সালে আমাদের দেশে ১৮ হাজার জাতের ধানের রেকর্ড ছিল। ১৯৮৪ সালে ১২ হাজার ৪৮৭ জাতের ধানের তথ্য পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০১১ সালের জরিপে মাত্র ৮ হাজার দেশি জাতের তথ্য পাওয়া গেছে। যা দেখে স্পষ্ট অনুমান করা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশীয় জাতের ধান শিগগির বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেবে। একটি তথ্যমতে, বাংলাদেশে ১৫ হাজার জাতের ধান চাষ করা হতো।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৭৫ শতাংশ আবাদি জমি ব্যবহার করা হচ্ছে ধান উৎপাদনে। সেচকৃত জমির ৮০ শতাংশেই উৎপাদন হয় ধান। মূলত আউশ, আমন, বোরো ধানের উৎপাদন বেশি। এর মধ্যে বোরো ধান হয় প্রায় ২ কোটি টন, আমন ধান ১.৩ কোটি টন, আউশ ২৩ লাখ টন। এখান থেকে স্পষ্ট, আউশের আবাদ কমে গেছে। অথচ একসময় ধানের প্রধান দুটি মৌসুমের একটি ছিল আমন, অন্যটি আউশ। আর এখন আউশের স্থান দখল করেছে বোরো। এই আউশ ধানের রয়েছে স্থানীয় অনেক জাত। বন্যাপ্রবণ এলাকায় ৮১ জাতের আউশ, বরেন্দ্র অঞ্চলে ৫৬, হাওর অঞ্চলে ২৭ ও উপকূলীয় অঞ্চলে ২৯ জাতের আউশ ধান চাষ হয়। আউশ ধানের চাষ কমে যাওয়ায় এসব জাতের বিলুপ্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবার বোরো ধানের চাষ বেড়ে যাওয়ায় পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। একটি তথ্যমতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে যেখানে পানির স্তর ৬৪ ফুট নিচে ছিল, সেখানে পাঁচ বছরে তা নিচে নেমে গেছে ৯৭ ফুট। এই অবস্থায় সরকার আউশ চাষে কৃষককে বিশেষ প্রণোদনাও দিচ্ছে।

উচ্চফলনশীল জাতের চাষের কারণে স্থানীয় অনেক জাতের ধান শুধু হারিয়েই যাচ্ছে না, পরিবেশের ওপরও পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। এ ছাড়া কৃষকও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা, উচ্চফলনশীল এসব ধান চাষের কারণে কৃষককে নির্ভর করতে হচ্ছে অধিক সার ও কীটনাশকের ওপর। কোনো কারণে ফলন ভালো না হলে কৃষকেরা নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও ধানের রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। একসময় দক্ষিণাঞ্চলে একধরনের আমন ধান চাষ করা হতো। যেমন দলকচু, খুইয়েমটর, শ্রীবালাম; যা পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠত। আবার কিছু ধান ছিল যেগুলোকে জলি ধান বলা হয়; এসব পানিতেই রোপণ করা হতো এবং পানিতেই কর্তন করা হতো। হাওর অঞ্চলে ঝরাবাদল, বাঁশফুল, বর্ণজিরা, তুলসীমালা, গাজী, জোয়ালকোট, মধুমাধব, খাসিয়া বিন্নি, হলিনদামেথি, দুধজ্বর প্রভৃতি চাষ করা হতো। এসব ছাড়াও গৌরীকাজল, হাসবুয়ালে, দলকচু, পঙ্খিরাজ, বাঁশিরাজ, দেবমণি, কালাবায়রা, লতাবোরো, ঠাকুরভোগ, মুরালি, জোয়ালকোট, ময়নামতি, চাপরাস প্রভৃতির ফলন হতো।

এখন বাংলাদেশে গবেষণা হচ্ছে। নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। উৎপাদন হয়তো বাড়ছে। কিন্তু আগের সেই ধানের মতো স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ, রূপ ইত্যাদি হারিয়ে গেছে। কিছু কিছু উদ্যোগ এসব জাত টিকিয়ে রাখার জন্য নেওয়া হচ্ছে। যেমন ব্রি প্রায় ৮ হাজার জাতের ধানের ‘জিন ব্যাংক’ সংরক্ষণ করেছে। এটি বেশ ভালো একটি উদ্যোগ। আবার নয়া কৃষি আন্দোলন প্রায় ৩ হাজার জাতের ধান সংরক্ষণে কাজ করেছে। কিন্তু এসব দেশি জাত সংরক্ষণে যথেষ্ট নয়। সরকার দেশি জাত চাষে কৃষকদের প্রণোদনা দিতে পারে। এতে কৃষকেরা উৎসাহিত হবে স্থানীয় জাত সংরক্ষণ এবং তার চাষবাসে। বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হবে। স্থানীয় জাতের ধানকে সহজলভ্য করতে হবে। এতে করে মানুষ স্থানীয় জাতের ধান কিনতে উৎসাহিত হবে। যেহেতু স্থানীয় জাতের ধান অনেক বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদময়; এটি একটু সহজলভ্য হলেই চাহিদা বেড়ে যাবে। এ ছাড়া এসব জাত চাষ করলে এত সার, কীটনাশক দিতে হবে না। কৃষকেরা লাভ খুঁজে পাবে। জমির উর্বরতা শক্তিও ঠিক থাকবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকেরও জীবন মানের একটা পরিবর্তন আসবে।

বীজ মেলা এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বীজ মেলার মাধ্যমে নানা জাতের বীজ প্রদর্শন এবং এর গুণাবলি জেনে কৃষক ও অন্যরা এর চাষবাস ও রক্ষণাবেক্ষণে অনুপ্রেরণা পাবে। শুধু ধান নয়, নানা জাতের শস্য যেমন ডাল, শাকসবজি প্রভৃতিরও বীজ সংরক্ষণ ও চাষবাসে কৃষকেরা উৎসাহিত হবে। তাই সারা দেশে বইমেলার মতো বীজ মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগ জরুরি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

চীনকে নিয়ে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করবে ইরান! ভারতের জন্য বিপদ

যশোরে খোদ বিচারকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা, বাদী গ্রেপ্তার

পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আর্টেমিস নভোচারীদের ৪০ মিনিট, কী ঘটবে তখন

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, যুদ্ধ বন্ধে ইরানের পাল্টা ১০ দফা

অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রাইম ব্যাংকে নেবে ট্রেইনি অফিসার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত