Ajker Patrika

গাড়ির ফিটনেস এবং রাষ্ট্রের ফিটনেস

স্বপ্না রেজা
আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০৮: ০১
গাড়ি কিংবা দেশ—উভয়ের ফিটনেস ধরে রাখতেই চালকদের উপযুক্ত জ্ঞান থাকতে হয়। ফাইল ছবি
গাড়ি কিংবা দেশ—উভয়ের ফিটনেস ধরে রাখতেই চালকদের উপযুক্ত জ্ঞান থাকতে হয়। ফাইল ছবি

ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের বড় অসুবিধা হলো, চালক পরিবর্তন হলেই গাড়ি বিষয়ে তাঁদের হাজারটা অবজারভেশন থাকে, অভিযোগ থাকে। যেমন গাড়ির ফিটনেস ঠিক নেই, অমুক পার্টস বদলানো দরকার, এটা নেই, সেটা নেই, আগের চালক এটা করেছে, ওটা করেনি ইত্যাদি ইত্যাদি। আগের চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রাই বেশি থাকে নতুন চালকের কাছে। সঙ্গে সুপারিশ থাকে এ রকম যে, তাঁর পরিচিত গ্যারেজ আছে যেখানে এইসব কাজ সুন্দরভাবে করা যাবে। মানে গাড়ির যাবতীয় সমস্যা সমাধান করা যাবে। তথ্যটাকে সমর্থন দিতে আরও বলে, গ্যারেজ তাঁর বিশ্বস্ত খুবই। মালিক যেন তাঁর ওপর আস্থা রাখেন, বিশ্বাস রাখেন। সাধারণত নতুন চালক ড্রাইভিং সিটে বসে এত এত কথা বলতে পছন্দ করে। গাড়ি চালানোর পারদর্শিতা যা-ই থাকুক না কেন, সেটার চেয়ে সে কথা বলতে পটু হয়। তাঁর অভিজ্ঞতা, দক্ষতা থাকুক আর না-ই থাকুক। যদি তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ফিটনেস বলতে তিনি কী কী বোঝাতে চাইছেন, তাহলে তিনি সঠিক উত্তর দিতে ব্যর্থ হন তো বটেই, সেই সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে উল্টাপাল্টা উত্তর করেন, ব্যাখ্যা দেন। গাড়ির মালিকের মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। চালক অসংলগ্ন কথা বলেন। অপরিণত, অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ চালক হলে তো ভয়ংকর পরিণতি ও পরিস্থিতির জন্ম হয় এবং সেটা কথায় ও কাজে উভয় ক্ষেত্রেই। এটা না বললেই নয় যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার নেপথ্যে দেখা যায় অপরিণত, অদক্ষ চালক দ্বারা গাড়ি চালানোর বিষয়টি একটি অন্যতম কারণ। যাহোক, অদক্ষ, অপরিণত, অনভিজ্ঞ চালক দ্বারা গাড়ি চালানোর খেসারত গাড়ির মালিককেই দিন শেষে দিতে হয়।

গাড়ি ও গাড়িচালকের এই বিষয়টার মতো অনেক ঘটনা সমাজের অন্য ক্ষেত্রেও দেখা যায়। যেমন, যার বা যাদের চিকিৎসা, শিক্ষা বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই, দেখা যায় যে সেই সব বিষয়ে তাঁকে বা তাঁদের দায়িত্বশীল করা হয়েছে। আর দায়িত্বশীল পদে বসে তাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। ফলে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় না, কখনো পাওয়া যায়নি। ইতিহাসে নেই। যা হয়, তা হয় হযবরল। এই মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি যদি অ্যাপ্লাই করা হয় সর্বত্র, সর্বস্তরে তা হলে কী দাঁড়াবে? গাড়ির নতুন চালকের ক্যারেক্টারই কিন্তু ফিরে আসবে। এতে ফলাফল যেটা বেরিয়ে আসবে বা আসে, তা কিন্তু কল্যাণকর হয় না। সব কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পরিণত বয়স, শিক্ষা, মেধা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অত্যন্ত জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইদানীং এমন চিরন্তন সত্যকে আমলে না নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। দিন দিন যোগ্যতা, মেধার কদর কমে যাচ্ছে। শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ বাড়ছে। অর্থবিত্ত, স্বার্থের পেছনে মানুষ পাগলের মতো ছুটছে।

যাহোক, গাড়ি সার্ভিসিং করাতে এক অটোমোবাইল সার্ভিসিং সেন্টারে আসা হলো রুটিনমাফিক। গাড়ির লম্বা সিরিয়াল থাকায় বসে অপেক্ষা করা। যদিও ঢাকা শহরে বেশ প্রতিষ্ঠিত সেবা প্রদানে এবং দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও আয়তনে বড় অটোমোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার এটা, তথাপি ম্যানেজারের শ্রদ্ধা-ভক্তির কারণে আমার গাড়ির কাজটা তাড়াতাড়ি করার বন্দোবস্ত হলো। তারপরও এসব কাজ সময়সাপেক্ষ, কিছুটা সময় অপেক্ষা তো করতেই হয়। অপেক্ষা করতে করতে শুনছিলাম গাড়ির ফিটনেস বিষয়ে নানান বক্তব্য। অটোমোবাইল সেন্টারের ম্যানেজার দুঃখ করে বলছিলেন, ‘কী যে শুরু হলো, ফিটনেস নিয়ে সবার মাথা নষ্ট। গাড়ির ফিটনেসই বোঝে না ড্রাইভার, তারপরও বলে ফিটনেস ঠিক করে দিন।’ পাশ থেকে একজন মেকানিক বলে উঠলেন, ‘ভাই রে জ্ঞানের অভাব, শিক্ষার অভাব। পড়াশোনা লাগে সবকিছু বুঝতে, কয়জন করে তা?’

একজন অপেক্ষমাণ গাড়ির মালিক বললেন, ‘পড়াশোনার চ্যাপ্টার ক্লোজড অনেক দিন ধরেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেকটা গরুর খামারের মতো হয়ে উঠেছে। শিক্ষক দেখলে আগে আমরা মাথা নিচু করে থাকতাম। চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস পেতাম না। এখন শিক্ষকদের চোখ উঠিয়ে নেওয়া হয়। কলার চেপে ধরে পেটানো হয়। গলা ধাক্কা দিয়ে শিক্ষককে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়। একজন শিক্ষক তো হার্ট অ্যাটাক করেও মারা গেছেন। যে দেশে শিক্ষকসমাজ উপযুক্ত সম্মান পায় না, মর্যাদা পায় না, লাঞ্ছিত হয়, অপমানিত হয় সেই দেশেরই তো ফিটনেস ঠিক নেই। দেশ কী করে সামনে এগোবে? শিক্ষার তো কোনো বিকল্প কিছু নেই। শিক্ষক হলো মানুষ গড়ার কারিগর, তাঁকে পেটালে ভালো মানুষ কে গড়বেন? গাড়ির ফিটনেসের ব্যাপারে যেমন একজন দক্ষ মেকানিক না ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া অন্য কেউ বুঝবে না, করতেও পারবে না।’

বুঝতে চেষ্টা করছিলাম লোকটার হতাশার গভীরতা। তিনি আরও বলছিলেন, যারা দেশটার স্টিয়ারিং ধরার কথা ভাবছে, আগে তো তাদের জানতে হবে রাষ্ট্রের কোন পার্টসের কী কাজ, সেই সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা ও জ্ঞান থাকা লাগবে। কোনো বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা দেওয়ার আগপর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা লাগবে। নতুবা সেসব ‘ফালতু’ হয়ে লোকমুখে ঘোরাঘুরি করবে। ভদ্রলোক বেশ জোর দিয়ে বললেন, শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করার দরকার ছিল সবার আগে। সব সেক্টরে উপযুক্ত শিক্ষা কার্যক্রম লাগে। উপস্থিত প্রায় সবাই তাঁকে সমর্থন করল। মব ভায়োলেন্সকে অনুন্নত শিক্ষার ফল বলে তারা দাবি করল।

মানুষের একটা অংশের ভেতর থেকে ভয় কমে গেছে। এরা বেপরোয়া। দুঃসাহসকে অবলম্বন করে এরা সমাজে অরাজকতা তৈরি করে। জনজীবনে এনে দিচ্ছে ভয়ভীতি। শিক্ষাবিমুখতাকে এর জন্য দায়ী করছে অনেকেই। রাষ্ট্র বা জাতির ফিটনেসের জন্য প্রথম দরকার উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন। অথচ সেই পথের পথিক হয় না কেউ। শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে সবাই রাষ্ট্র মেরামতের কথা ভাবছে। ঠিক নয়। এটা কতটা যুক্তিসংগত তা এখন নয়, অদূর ভবিষ্যতে টের পাওয়া যাবে। আনাড়ি, অদক্ষ, অশিক্ষিত একজন গাড়িচালক ড্রাইভিংয়ের দায়িত্ব পেলে শুধু গাড়ির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না, বরং জনগণের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে বেশি। বাস্তবতা কিন্তু এমনই। আর এটা তো ঠিক যে, অদক্ষ, অযোগ্য, অপরিণত, অশিক্ষিত ব্যক্তিরা অসংলগ্ন, অসংগতিপূর্ণ ও অর্থহীন কথা বেশি বলে, যা জনগণকে বিভ্রান্ত ও বিপন্ন করে।

লেখক:- কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

লতিফ সিদ্দিকী, ঢাবি অধ্যাপক কার্জনসহ ডিবি হেফাজতে ১৫ জন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার

পুলিশের ওপর ৪ দফা হামলা, গাজীপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ছিনিয়ে নিল দুর্বৃত্তরা

বড় ভাইসহ ডিবি হেফাজতে থাকা সবার সসম্মানে মুক্তি চাই: কাদের সিদ্দিকী

‘গ্রেপ্তার জাসদ নেতাকে থানায় সমাদর’, ওসিসহ তিন কর্মকর্তা প্রত্যাহার

এবার কাকে বিয়ে করলেন দুবাইয়ের রাজকন্যা শেখা মাহরা

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত