
কেউ অপরাধী হলে তাঁর বিচার হবে, শাস্তি হবে, এটাই নিয়ম, এটাই রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব। কিন্তু সেই রাষ্ট্র যদি কেবল শাস্তির যন্ত্রে পরিণত হয়, যদি আইন-প্রশাসন-বিচার বিভাগের ভেতর থেকে মানবিকতা নির্বাসিত হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্র আর মানুষের থাকে না। রাষ্ট্র কোনো জড় বস্তু নয়; রাষ্ট্র মানে মানুষ, মানুষের জীবন, মানুষের দুঃখ-সুখ, আশা-নিরাশা। আইন তৈরি হয় মানুষের জন্য, মানবিকতা রক্ষা করার জন্য। কিন্তু যখন আইন নিজেই অমানবিক হয়ে ওঠে, তখন তার নৈতিক বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
জুয়েল হাসান সাদ্দাম, তাঁর স্ত্রী স্বর্ণালী এবং তাঁদের শিশুপুত্রের মৃত্যুর গল্প যদি কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি হতো, তাহলে হয়তো আমরা চোখ ভিজিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকতাম, তারপর অন্য খবরে চলে যেতাম। কিন্তু এই গল্প আসলে একটি সময়ের দলিল। এটি এমন একটি সময়ের সাক্ষ্য দেয়, যেখানে রাষ্ট্র তার মানবিক মুখটি গুটিয়ে নিয়েছে, আর আইনের নামে নেমে এসেছে একধরনের নীরব, ঠান্ডা, প্রশাসনিক বর্বরতা।
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ২০২৬ সালে এসে আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? পরিবর্তন কোথায় হলো? নাকি পরিবর্তনের নামে আমরা আরও পিছিয়ে গেলাম?
জুয়েল ১১ মাস ধরে কারাগারে। এই ১১ মাসে একটি শিশু জন্ম নিয়েছে, একটি নারী ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত দুটি প্রাণ নিভে গেছে। জুয়েল তাঁর সন্তানকে কখনো কোলে নিতে পারেননি। শুনতে এটি আবেগময় তথ্য মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর রাজনৈতিক সত্য। কারাগার কেবল একজন অভিযুক্তকে বন্দী করেনি; বন্দী করেছে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন, ভালোবাসা, ভবিষ্যৎ। একটি শিশুর বাবার স্পর্শ, একটি স্ত্রীর সঙ্গ, একটি পরিবারের সম্মিলিত জীবনের সম্ভাবনা—সবকিছুই কারাগারের লোহার দরজার ভেতর আটকে গেছে।
স্বর্ণালী যখন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁর স্বামীকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছেন, তখন হয়তো তাঁর মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল, ‘কত দিন?’ তিনি জানতেন না, এই ‘কত দিন’-এর উত্তর লেখা আছে একটি লাশে মোড়া অধ্যায়ের শেষে। মাত্র ২২ বছরের একটি মেয়ে—যাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টি কাটার কথা ছিল মাতৃত্বের আনন্দে, নতুন সংসারের স্বপ্নে—সেই সময় কাটিয়েছে জামিনের কাগজ, আইনজীবীর ফি, থানার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এবং মানুষের অবহেলার মুখোমুখি হয়ে।
আমরা প্রায়ই গর্ব করে বলি, আইন অন্ধ। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে মনে হয়, আইন শুধু অন্ধ নয়; সে বধিরও। সে স্বর্ণালীর কান্না শোনেনি, তার সন্তানের ক্ষুধা দেখেনি, তার অপমান, নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, মানসিক ভাঙন—কিছুই রাষ্ট্রের রাডারে ধরা পড়েনি। অথচ এই দেশেই, আগের বছরগুলোতে, এমনকি আরও কঠিন রাজনৈতিক সময়েও, বিচারব্যবস্থার ভেতরে একধরনের মানবিক স্পেস ছিল। জামিন ছিল অধিকার, বিশেষত যখন অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। পরিবারের কেউ মারা গেলে অন্তত শেষবিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া হতো। প্যারোল কেবল একটি আইনি শব্দ ছিল না; ছিল মানবিক বিবেচনার একটি জানালা।
তাহলে ২০২৪ সালের পর কী বদলাল? যদি কোনো পরিবর্তন হয়ে থাকে, তা মানবিকতার বিপরীতে। একধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ কঠোরতা এখন আইনের শরীরে ঢুকে গেছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় একজন মানুষকে আর নাগরিক হিসেবে নয়, বরং শিকার হিসেবে চিহ্নিত করে।
অভিযোগ আছে—৫ আগস্টের পর থেকে একটি ভয়ংকর বাজার গড়ে উঠেছে। ‘আগে ধরো, পরে ছাড়ানোর নামে টাকা আদায় করো’। এই অভিযোগ পুরোপুরি সত্য না-ও হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বর্ণালীর মতো মানুষের কাছে আইন এখন আর আশ্রয় নয়, আতঙ্ক। রাষ্ট্র যেখানে শেষ ভরসা হওয়ার কথা, সেখানে সে পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তার উৎসে।
জুয়েল জেল থেকে চিরকুটে লিখেছেন, ‘তবু চেষ্টা করো’। এই একটি বাক্যই আসলে একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র। কারণ, একটি সভ্য দেশে একজন বন্দীকে তাঁর স্ত্রীর কাছে এই অনুরোধ জানাতে হয় না। চেষ্টা করার দায়িত্ব স্ত্রীর নয়, রাষ্ট্রের। কিন্তু এখানে রাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, আর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে একজন নিঃস্ব নারীর কাঁধে।
স্বর্ণালী চেষ্টা করেছেন। যতটুকু পারা যায়, করেছেন। টাকা শেষ হয়েছে, সম্মান শেষ হয়েছে, আশাও শেষ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি বাবার বাড়িতে ফিরে গেছেন—যা আমাদের সমাজে প্রায়ই ‘পরাজয়ের স্বীকৃতি’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সেখানে গিয়েও তিনি শান্তি পাননি। তাঁর ভাই বলেছেন, সে ইদানীং ‘পাগলামি করছিল’। আমরা খুব সহজেই এই শব্দটি ব্যবহার করি—পাগলামি। কিন্তু এই পাগলামির জন্ম কোথায়? অনাহারে? অনিশ্চয়তায়? নাকি প্রতিদিন নিজের অসহায়ত্ব আয়নায় দেখতে দেখতে?
একজন মা তাঁর সন্তানকে হত্যা করেছেন—এটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ অপরাধ। কিন্তু এটিকে যদি আমরা আলাদা করে একটি অপরাধ হিসেবেই দেখি, তাহলে পুরো চিত্র অস্বীকার করা হয়। এটি ছিল একটি মানসিক বিস্ফোরণ। আর এই বিস্ফোরণের দায় কেবল স্বর্ণালীর নয়। দায়ী সেই ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা একজন নারীকে এমন এক প্রান্তে ঠেলে দেয়, যেখানে জীবনের সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যায়।
এই গল্পের আরেকটি দিক আরও ভয়ংকর। যে মামলায় জুয়েল এখনো কারাগারে, সেই ঘটনার দিন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন—এই দাবি তিনি করেছেন, পাসপোর্টের প্রমাণের কথাও বলেছেন। এটি সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণ করবেন আদালত। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তদন্ত ও বিচার কি যথাযথ গতিতে এগোচ্ছে? নাকি ‘ধরো আগে, দেখব পরে’ নীতিই এখন নিয়ম?
একবার জামিন পাওয়ার পরও জেলগেট থেকে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনা শুধু জুয়েলের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি বার্তা—এখানে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আজ জামিন, কাল আবার গ্রেপ্তার। আজ আইন, কাল প্রশাসনিক জটিলতা। এই অনিশ্চয়তা মানুষকে শুধু ভীতই করে না, ধীরে ধীরে ভেঙেও দেয়।
সবচেয়ে পীড়াদায়ক বিষয় হলো—স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পরও জুয়েল প্যারোলে মুক্তি পাননি। কারণ, জেলা প্রশাসকের চিঠি পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি। এই একটি বাক্যের ভেতরেই পুরো ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে আছে। কাগজ না পৌঁছানো মানে কি মানুষের শোক অপেক্ষা করবে? একটি লাশ কি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার চেয়ে কম জরুরি?
জেলগেটে যখন স্বর্ণালী ও তাঁর শিশুপুত্রের মরদেহ আনা হলো, তখন সেই দৃশ্য আর ব্যক্তিগত থাকেনি। কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা—‘মৃত সন্তান দেখা করতে গেছে জীবিত পিতার সাথে’—এটি কেবল কবিতা নয়, এটি ২০২৪ সালের বাংলাদেশের একটি নির্মম প্রতিকৃতি। এমন একটি দেশ, যেখানে মৃতরা জীবিতদের দেখতে যায়, কারণ জীবিতরা বাইরে আসতে পারে না।
এখন প্রশ্নটি এড়ানো যায় না যে এই দায় কার? জুয়েলের দলের, যারা বিপদের সময় নিজেদের কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ? প্রশাসনের, যারা মানবিক বিবেচনাকে ফাইলের নিচে চাপা
দেয়? নাকি আমাদের সবার, যারা এসব দেখে নির্বিকারভাবে বলি—‘আইন তো আইনই’?
আইন যদি মানবিক না হয়, তবে তা কেবল শক্তির যন্ত্রে পরিণত হয়। আর শক্তির যন্ত্র একদিন সবার ওপরই পড়ে।
ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর উচ্চকণ্ঠে যে নৈতিক ভাষণগুলো দিয়েছিলেন, আজ সেগুলোয় ফিরে তাকালে গভীর অস্বস্তি তৈরি করে। বলা হয়েছিল—বাংলাদেশ সভ্য হয়ে গেছে, এই দেশ থেকে বিশ্ব শিখবে মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও শাসনের নতুন পাঠ। দেড় বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—বিশ্ব ঠিক কী শিখল?
একজন বন্দী বাবাকে কী শেখানো হলো, কীভাবে সন্তানের মরদেহ কারাগারের গেট থেকে দেখতে হয়? একজন তরুণী মাকে কী শেখানো হলো, কীভাবে রাষ্ট্রের উদাসীনতায় ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যেতে হয়? নাকি শেখানো হলো—কাগজ না পৌঁছালে শোকও স্থগিত থাকে, মানবিকতা প্রশাসনিক ফাইলে আটকে যায়?
যদি এটাই হয় ‘সভ্যতা’, যদি এটাই হয় নতুন বাংলাদেশের পাঠ, তাহলে বিশ্ব হয়তো শিখেছে এই সত্যটি—আইনের ভাষা যতই সুন্দর হোক, তার ভেতর থেকে মানুষকে মুছে ফেললে তা শেষ পর্যন্ত নিছক ক্ষমতার প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
মানুষের হৃদয় যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়—পুরো রাষ্ট্রই তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে শুরু করে। এই বিস্ফোরণ থামানো না গেলে, একদিন আর কোনো জেলগেটই যথেষ্ট উঁচু থাকবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি হলো, বিশ্বের কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাদের আনুগত্য না মানলে সেখানে যেকোনো উপায়ে তাঁকে উৎখাত করা। যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। সেই
৪ ঘণ্টা আগে
দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের মধ্যে দুটি ধারা দেখা যাচ্ছে। প্রথমটি—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কিছু কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বিএনপি ও তার নেতাদের গতানুগতিক কাজকর্ম। এই দুই ধারার মধ্যে মিলের চেয়ে যেন অমিলই বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছেন না, আগামী দিনগুলোতে ঠিক...
৪ ঘণ্টা আগে
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে চোখ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। প্রশ্ন একটাই, এখন কী হবে? যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের লক্ষ্যবস্তু ইরানের ইসলামি শাসকগোষ্ঠীর পতন হবে কি? হলে কী হবে সেই ইরানের চেহারা! মুহুর্মুহু হামলার মুখে কতক্ষণ...
৪ ঘণ্টা আগে
আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর। ডাকসুর নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনঃপাঠ’, ‘বার্মা: জাতিগত সংঘাতের সাত দশক’, ‘শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম’, ‘গ্রামসি ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই।
১ দিন আগে