
আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর। ডাকসুর নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনঃপাঠ’, ‘বার্মা: জাতিগত সংঘাতের সাত দশক’, ‘শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম’, ‘গ্রামসি ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জুলাই সনদ এবং নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের গুণগত পরিবর্তনের আশা করেন আপনি?
তারেক রহমানের আসার আগেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু গুণগত এবং পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটে গেছে। আসলে, কোনো ব্যক্তির দেশে থাকা না-থাকায় তো সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তন থেমে থাকে না। দেশে না থাকলেও দল পরিচালনার মাধ্যমে তারেক রহমান দেশের বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তবে সে সময় তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কেবল দলীয় কর্মী-সংগঠকদের তথ্য ও ব্যাখ্যা শুনেছেন। সমাজের ভেতরে থেকে সমাজকে বোঝা এবং বিদেশে বসে বোঝার চেষ্টার মাঝে গুণগত একটা ফারাক থাকে। এখন তাঁর সুযোগ রয়েছে দেশকে এবং ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া সামাজিক পরিবর্তনকে বোঝার।
আপনার মূল প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়, তারেক রহমানের আগমন, নির্বাচন, বিএনপির বিজয় এবং তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়া একদিকে বাংলাদেশের রাজনীতির তেমন কোনো গুণগত পরিবর্তন নির্দেশ করে না, আবার করেও। যেমন, ১৯৯১ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি দুটি পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এখনো আমরা তার মধ্যেই আছি এবং সেটা অব্যাহত থাকার লক্ষণ আছে।
আবার এও সত্য, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি জিয়াউর রহমান কিংবা খালেদা জিয়াকে অল্পই ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ তারেক রহমান নিজের শক্তি ও চিন্তায় বিএনপির রাজনীতিকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি সরকার গঠনের পর তাঁর চারপাশে মন্ত্রী ও উপদেষ্টার যে বলয় তিনি নির্মাণ করছেন, সেখানেও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরাসরি সহযোগীদের উপস্থিতি কম। তারেক রহমান বিএনপিতে প্রজন্মান্তর ঘটাচ্ছেন। দলটিতে জেনারেশনাল একটা পরিবর্তন ঘটছে তাঁর মাধ্যমে।
একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতির পুরো পরিসরেও একটা প্রজন্মান্তর ঘটছে। সব দলে নতুন প্রজন্ম নেতৃত্বে আসছে—যে প্রজন্ম আবার নিজ রাজনৈতিক ভাবনাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে পারেনি এখনো, মাঠপর্যায়ে সংযোগের চেয়ে যারা সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে সামাজিক প্রভাব বাড়াতেই বেশি সময় দেয়। রাজনীতি, ক্ষমতা, নেতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে তাদের বেশ আগ্রহী ও উৎসাহী মনে হচ্ছে। এদের মাধ্যমে রাজনীতির ধরনও পাল্টাচ্ছে। গভীর আদর্শবাদের চেয়ে পপুলিজম রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠছে।
এর মাঝে মনে হচ্ছে উন্নয়ন প্রশ্নকে রাজনীতির প্রধান ইস্যু করে তুলতে চাইছেন তারেক রহমান। কিন্তু ঐতিহাসিক নানান বিবাদ এবং ধর্মীয় প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে এত বেশি যে তাকে পুরোপুরি উন্নয়নমুখী অ্যাজেন্ডার দিকে নেওয়া যাবে কি না বলা মুশকিল। আবার এখানে সমাজ পরতে পরতে এত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত যে তাকে পরিশুদ্ধ করার মতো সংগঠক গোষ্ঠী বিএনপিতে আছে কি না সন্দেহ হয়। ফলে দেশে এখনই কোনো গুণগত পরিবর্তন আশা না করা ভালো হবে।
সব মিলিয়ে আমার মনে হয়, বাংলাদেশ আপাতত একটা টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যাবে—অন্তত আরও চার-পাঁচ বছর। ২০২৪-এ এখানে নতুন যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটা এখনো তরল অবস্থাতেই আছে। তারেক রহমান তাতে দানা বাঁধাতে চাইছেন হয়তো, কিন্তু খুব অর্গানিক একদল সহযোগী তিনি পেলেন কি না—আমার সন্দেহ হচ্ছে।
আওয়ামী লীগবিহীন এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেল, তা কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ‘বাই-পোলার’ বা দ্বিমুখী ধারার সূচনা করল?
আপাতত বাংলাদেশের রাজনীতিতে মধ্যপন্থা ও ডানপন্থার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। বিএনপি পুরোনো মধ্য-ডান অবস্থান থেকে সরে মধ্যপন্থী অবস্থান নিচ্ছে। তারা আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মধ্যপন্থী প্রভাবশালীদের কাছে টানতে চাইছে।
অন্যদিকে, জামায়াতও পূর্বের অতি ডান অবস্থান থেকে কিছুটা সরে নমনীয় ডানপন্থী হিসেবে নতুন ইমেজ তৈরি করতে সচেষ্ট। এই দুই দলের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক এমন একটা মনোভঙ্গি তৈরি হয়েছে যে তারা এভাবে একটা দ্বিদলীয় ব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে। তবে এ রকম অবস্থা স্থায়ী নাও হতে পারে। নির্বাচনী পরিসংখ্যান দেখুন, বিএনপি ও জামায়াত মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকের মাত্র প্রতিনিধিত্ব করছে। বিগত নির্বাচন পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। একটা বড় দল নির্বাচনের বাইরে পড়ে থাকায় রাজনীতির ভবিষ্যৎ চিত্রটা অস্পষ্টই থাকছে।
একাধিক কারণে বিএনপি বনাম জামায়াত বর্তমান দ্বিদলীয় ব্যবস্থা তৃতীয়-চতুর্থ শক্তির তরফ থেকে চ্যালেঞ্জে পড়বে। প্রথমত, আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই সক্রিয় হবে একসময়। নেতৃত্ব সংকটের কারণে আগের অবস্থান ফিরে না পেলেও তৃতীয় শক্তি হিসেবে তাদের উপস্থিতি ঘটবে। তবে সে জন্য তাদের পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
অন্যদিকে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আদর্শিক লক্ষ্যে ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ তরুণসমাজ ছোট ছোট নতুন দল করছে। এদেরও সম্ভাবনা আছে ধীরে ধীরে নতুন শক্তি হয়ে ওঠার। এই শক্তিসমূহ যেভাবেই হোক রাজনীতিতে একটা জায়গা পেতে মরিয়া। সেটা কী আকারে ঘটবে, তার রূপ দেখতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে বিএনপির প্রভাব কিছুটা কমতে থাকলেও অদূর ভবিষ্যতে তাতে দলটির বর্তমান প্রভাবের আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে মনে হয় না।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়নে নতুন সরকারের সদিচ্ছাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এ দেশে সংস্কারের পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা দুটি: প্রথমত আমলাতন্ত্র; দ্বিতীয়ত রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার দুর্বলতা। ২০২৫-২৬-এ সেটা আরেকবার প্রমাণিত হলো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রত্যাশা ছিল বিপুল। ‘জুলাই সনদে’ তার সামান্য প্রতিফলন ঘটেছে। জুলাই সনদকে যেভাবে গণভোটে পাঠানো হয়েছে, তাতে অপরিণত রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ছাপ ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রশক্তিও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ফলে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। কারণ, এর জন্য ঐক্যবদ্ধ কোনো জাতীয় চাপ শিগগির আর দেখব না আমরা। ইতিহাসের সোনালি মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে গেছে।
বিএনপি আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা কমিয়ে প্রশাসনকে জনমুখী করা বা বিদ্যমান ঔপনিবেশিক আইনকানুন আমূল বদলাতে হাত লাগাবে বলে মনে হয় না। এটা তাদের দোষ নয়। তারা সে রকম শক্তি নয়। সেটা তাদের অতীত রাজনীতিও নয়। ন্যূনতম কিছু সংস্কার তারা করবে। তাতে বর্তমান অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বড় কোনো বদল ঘটবে না।
রাষ্ট্র সংস্কারের মতো রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে এখনো তৈরি হয়নি। যে তরুণেরা এসব বলে তারা নিজেরা সেভাবে নৈতিক, সাংগঠনিক ও আদর্শিকভাবে সংঘবদ্ধ নয়। বলার জন্য বলে। এসব বলে ফেসবুকে জনপ্রিয় থাকা যায়। আর বড় দলগুলো চাপে পড়লে, বিরোধী দলে থাকলে, কোণঠাসা অবস্থায় পড়লে, কিংবা সভা-সেমিনারে এ রকম বলে যে ক্ষমতায় গেলে তারা সংস্কার করবে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা সেসব ভুলে যায়।
যদি বিএনপি সরকার ‘জুলাই সনদ’ এবং বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনগুলো বাস্তবায়নের পথে না এগোয়, তাহলে তারা কি আওয়ামী লীগের মতো ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ হয়ে উঠবে? এর গ্যারান্টি কতটুকু?
বিএনপি চেষ্টা করবে নির্বাচনী গণতন্ত্র চালু রাখতে। এর বেশি আশা করা ঠিক হবে না এখনই। এ দেশে আপাতত এক দল ও এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনই চলবে। আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থাটাই ওরকম। নির্বাচনী সংস্কৃতির বাইরের রাষ্ট্রীয় বাকি সবকিছুই ঔপনিবেশিক আমলের থাকছে। এমনকি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়িত হলেও এখানে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকাঠামোর সামান্যই অদল-বদল হবে।
একটা বড় সংস্কার হতো যদি স্থানীয় সরকারকে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া হতো। এ ছাড়া স্থানীয় উন্নয়ন বাজেট যদি স্থানীয় সরকারের জিম্মায় দেওয়া হতো। আরেকটা প্রয়োজন সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির নির্বাচনী ব্যবস্থা। এ রকম অনেক অনেক জরুরি সংস্কার দরকার দেশটিতে। কিন্তু স্থানীয় সরকার সংস্কার তো গত আমলে আলোচনাতেই এল না।
অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিতে প্রচণ্ডভাবে নিমজ্জিত এখন। শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো সরকারি প্রশাসনকে পুরোপুরি পকেটে পুরে রাখে। জনগণ ধারণাও করতে পারবে না এখানে কী পরিমাণে এবং কত বড় বড় অঙ্কে দুর্নীতি হয়। বিএনপি এসবের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে বলে মনে করি না। তারা সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের চাপে থাকবে, এটা সত্য। ফলে রাজনৈতিক সরকার, মন্ত্রিসভা লাগামহীন আচরণ করতে পারবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক ধরন বদলের কোনো প্রবল চাপ তাদের মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে হয় না। কারণ, সে রকম কোনো শক্তিশালী বিরোধী দলও নেই আমাদের।
আমি একটা উদাহরণ দিতে চাই। বাংলাদেশে ২৮ ভাগ মানুষ দরিদ্র। এখন উচ্চ ধনীদের ওপর বাড়তি করারোপ করে সেই অর্থ দিয়ে এই ২৮ ভাগের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে খরচ করার জন্য কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ কি বিএনপির ওপর আছে? বা সংসদে বর্তমান বিরোধী দল সে রকম চাপ গড়ে তুলবে কি? আমার মনে হয় না। বরং বর্তমান বিরোধী দল এই রাষ্ট্রযন্ত্রে সরকার হতে চেষ্টা করবে ধীরে ধীরে। আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে হারানোর জন্য এখন থেকে দল গোছাতে নেমেছে তারা।
যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষ তৈরি করে, সেটা বদলে ফেলার কোনো কর্মসূচি জামায়াত, এনসিপি, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির নেই। ফলে এখানে ব্যবস্থাটা জনবিরোধীই থাকছে। প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্যেরই থাকছে। এখানে বেসামরিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র মানে ৩৫০ জন এমপি, ৭০-৮০ জন সচিব, ৬৪ জন ডিসি এবং থানাগুলোর ওসি সাহেবরা। এদের কেউ আপনার পরিচিত হলে নাগরিক হিসেবে আপনি কোনো বিপদে একটু সহায়তা পেতে পারেন। আরেকটু সহায় হতে পারে যদি আপনার বিপুল অর্থ থাকে।
আবার নাগরিক সমাজ যে এই অবস্থা পাল্টাতে মরিয়া হয়ে বিকল্প খুঁজছে, এমনও নয়। এবারের নির্বাচনে তেমন একজনও এমপি হননি, যাঁরা রাষ্ট্রের আমূল বদল চেয়েছেন। জনগণ এখানে মার্কা বা প্রতীক দেখে ভোট দেয়। ব্যক্তি বা সংস্কার কর্মসূচি দেখে নয়।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ধারণা তৈরি হয়েছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার কি সফল হতে পারবে?
বিএনপি নিজে গণ-অভ্যুত্থানের আগে ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল। তারা নিশ্চয়ই তার কিছু কিছু বাস্তবায়ন করবে। তবে ওই ‘৩১ দফা’র মূল প্রবণতা হলো রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতের সংস্কার বিষয়ে তারা কমিশন গঠন করতে চায়। কথা হলো, এ রকম কমিশন এ দেশে অনেক হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমাদের অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন হয়েছে। স্থানীয় সরকার কমিশন হয়েছে। এসব কমিশন প্রতিবেদন দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কিছু হয়নি তেমন। আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল ধরুন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বে কেউ গোনে না। আমাদের দেশে অসুস্থ হওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনায় মরে যাওয়া ভালো। এসবে আপনি শিগগির কোনো পরিবর্তন আশা করতে পারেন না।
২০২৪-এর আগস্টে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বলে একটা কথা বা ধারণা তৈরি হলেও সেটা নির্বাচন-পূর্ববর্তী ১৮ মাসে মারা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার গণ-অভ্যুত্থানের কিছু বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে আমরা যা পেয়েছি তা হলো একটা নির্বাচন মাত্র। একটা নতুন সরকার পাওয়া গেছে। এর বাইরে গণ-অভ্যুত্থান আমাদের আর কিছু দেয়নি। আপনি ভূমি অফিসে যান, থানায় যান, হাসপাতালে যান—কোথাও ২০২৩ আর ২০২৬-এর মাঝে তেমন কোনো ফারাক দেখবেন না। পরিবর্তন হয়েছে কেবল মন্ত্রিসভায়, পরিবর্তন হয়েছে উপজেলা ও জেলায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ও পরিচয়ে। পরিবর্তন হয়েছে বিটিভির স্ক্রিনে কেবল।
বিএনপি চেষ্টা করবে বিদ্যমান পুরোনো ব্যবস্থাতেই সুশাসন কায়েম করতে। কিন্তু সেটাও তারা কতটা পারবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ আছে দুটি। একটার কথা আগেই বলেছি, তাঁর টিমে সংস্কারের পক্ষে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অর্গানিক রাজনীতিবিদ কম—যাঁরা সামাজিক ও প্রশাসনিক বাধা চুরমার করে পরিবর্তন আনবেন; দ্বিতীয়ত বিএনপির মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকেরা আমূল পরিবর্তনবাদী বৈশিষ্ট্যের নন, বরং তাঁরা রাষ্ট্র ও সমাজের সুযোগ-সুবিধাগুলো পেতেই বেশি সচেষ্ট হবেন।
তবে এই দুই সমস্যা পেরোনোর সুযোগ তারেক রহমানের সামনে এখনো আছে। দলে এবং প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান চালানোর মতো জনবল সমাজ থেকে খুঁজে পেতে হবে তাঁকে। সেটা সম্ভব। কিন্তু একা তিনি এ রকম একটা দলকে পাল্টে ফেলতে পারবেন কি না বলা মুশকিল। প্রশাসনে পরিবর্তন আরও দুরূহ। একই সময় বিরোধী দলগুলোও আদৌ তাঁকে সময় দিতে রাজি হবে কি না, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
নতুন সরকার ক্ষমতায় বসার পরই ছয়টি সিটি করপোরেশনে দলীয় নতুন প্রশাসক নিয়োগ, কিছু মন্ত্রণালয়ে সচিবদেরও রদবদল করা এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া—এসব লক্ষণ কিসের বার্তা দিচ্ছে?
যেকোনো নির্বাচিত সরকার প্রশাসনের সব স্তরে তার আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নিজের পছন্দের লোক বসাবে—এটা অস্বাভাবিক নয়। দেখার বিষয় হলো, যাঁদের বসানো হচ্ছে তাঁরা যোগ্য কি না, দক্ষ কি না, অভিজ্ঞ কি না। তাঁদের অতীত রেকর্ড দেখতে হবে এবং দায়িত্ব নেওয়ার পর পদক্ষেপগুলো দেখতে হবে।
সিটি করপোরেশনের কথাই ধরা যাক। আমাদের সিটিগুলো তো নরকতুল্য হয়ে উঠছে। বিএনপি তাদের দলের ছয়জনকে বসিয়েছে প্রশাসক হিসেবে। এখন দেখার ব্যাপার এই ছয়জন শহরগুলোর অবস্থা বদলাতে খাত ধরে ধরে বিশেষজ্ঞদের জ্ঞানকে কাজে লাগান কি না। নাকি বিদ্যমান প্রশাসন দিয়ে চলতি ধাপে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
আমাদের সিটিগুলোতে বিশুদ্ধ পানি নেই, বাতাস দূষিত, পাড়ায় পাড়ায় ময়লার স্তূপ, সবুজ নেই, পার্ক নেই, পাবলিক পরিবহন নেই, পুরো শহর রিকশার জঙ্গল। কেউ এই শহরকে ভালোবাসে না এখানে। শহরগুলোর প্রতিটি সমস্যার সমাধানে দুই-তিনজনের এক্সপার্ট কমিটি করে তাদের দেওয়া সুপারিশগুলো প্রশাসনকে দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ রকম প্রতিটি সমস্যার সমাধানে নতুন চিন্তা, নতুন প্রযুক্তি ও নতুন পদ্ধতি দরকার। দেখার ব্যাপার হলো, বিএনপির প্রশাসকেরা সেটা করেন কি না, নাকি তাঁরা টেন্ডারগুলো, ঠিকাদারিগুলো কেবল দলীয় কর্মীদের মাঝে বণ্টনেই নিজেদের ব্যস্ত ও সীমাবদ্ধ রাখেন। সে রকম হলে শহরগুলোর পুরোনো সমস্যার পাহাড় বাড়তেই থাকবে। মোটকথা, সমস্যা দলীয় প্রশাসক নয়, অ্যাপ্রোচ। নতুন প্রশাসকেরা কী অ্যাপ্রোচ নিচ্ছেন, সেটা হলো আসল বিষয়।
সরকার যাঁদের সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বানিয়েছে তাঁরা কেউ নগর-পরিকল্পনাবিদ নন। তাঁরা রাজনীতিবিদ। কিন্তু নগরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করার প্রতিটি কাজ কারিগরি ধাঁচের অভিজ্ঞতা দাবি করে। রাজনীতি ও কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয় দরকার এখানে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন এবং জামায়াতের সঙ্গে আদর্শিক ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখা নাকি না রাখা—তারেক রহমানের জন্য কোনটি বেশি চ্যালেঞ্জিং হবে?
আমার মনে হয়, বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক খুব বেশি খারাপ হবে না। জামায়াত জানে বিএনপি ধীরে ধীরে অজনপ্রিয় হবে। তারা বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ করবে প্রতিটি নির্বাচনে। রাজপথে নয়।
১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে জামায়াতের সব রুকন আবার পরের নির্বাচনের জন্য কাজে নেমে পড়েছেন। তারা বিএনপিকে আপাতত ক্ষমতায় থাকতে দিতে চায় এবং নিজেরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে চায়। ফলে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো তার দল ও মন্ত্রীরা।
মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা যদি সমাজের প্রত্যাশামতো কাজ না করতে পারেন, আর দলের মাঠপর্যায়ের কর্মী-সংগঠকেরা যদি ক্ষমতাকে মাস্তানি আর চাঁদাবাজির লাইসেন্স ভাবেন, তাহলে তো তারেক রহমানের সর্বনাশ। তাঁর উচিত হবে দলের নেতৃত্ব দূরদর্শী, সৎ, দক্ষ একজন সংগঠকের হাতে ছেড়ে দেওয়া। যে সংগঠক বিএনপিকে ‘নতুন বাংলাদেশে’র উপযোগী একটা দলে পরিণত করবে এবং মন্ত্রিসভার সঙ্গে সমন্বয় করে জামায়াতের দিক থেকে তৈরি হওয়া নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ সামলাবে। তারেক রহমানের প্রয়োজন মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টা পরিষদের কাজের তদারকিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করা। দল ও সরকার দুটোকে মনোযোগ ভাগ করে দিতে গিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যর্থ হন।
৭৭ জন এমপি সামনে রেখে জামায়াত অত্যন্ত শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে উঠতে যাচ্ছে শিগগির। আবার আওয়ামী লীগও ফিরে আসবে। এ ছাড়া মাঠে আছে আহত ও হতাশ এক তরুণসমাজ। বিএনপির জন্য তিনটা সতর্কবার্তা আছে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলের শক্তিশালী অবস্থান লক্ষ করা যাচ্ছে। এটি কি বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
বাংলাদেশে যাদের আমরা ‘ইসলামপন্থী’ বলছি, তারা কে কতটা সহি ধর্মপ্রাণ, সেটা তো বলা মুশকিল। তারা যেটা সফলভাবে করছে সেটা হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার। দক্ষিণ এশিয়া এটার একটা উর্বর জায়গা। ভারতে বিজেপি হিন্দুত্বকে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে কয়েকটি দল ইসলামকে এবং মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কায় কিছু দল বৌদ্ধ বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতি করে এবং তারা এসব দেশে বেশ জনপ্রিয়। এদের একের জনপ্রিয়তা আবার অন্যের জন্য টনিকের মতো কাজ করে।
উন্নত মজুরি, কর্মসংস্থান, উন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবহনব্যবস্থা, সম্পদের সুষম বণ্টন ইত্যাদি চাহিদার চেয়েও দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় বিষয়-আশয় মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা গেছে। দারিদ্র্য দূর করার বাস্তব কর্মসূচির চেয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতি মেশানো বয়ান এখানে অনেক বেশি ফলদায়ক।
ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি প্রায় নির্বাসিত হয়েছে। শাসকেরা জেনে গেছে এখানে কীভাবে জনতাকে বশে রাখতে হবে। নির্বাচনে প্রার্থীরা যেভাবে টুপি পরেছেন আর মসজিদে যাওয়ার ছবি ফেসবুকে দিয়েছেন, এখন আর সেসব আছে?
রাজনীতিতে প্রধান ধর্মের এ রকম ব্যবহারের অন্তত একটা পার্শ্বফল হলো সংখ্যালঘু ধর্ম ও সংখ্যালঘু জাতিগুলোর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়া। তারা নাগরিক অধিকারে কাগজে-কলমে না হলেও বাস্তবে সম-অধিকার পায় না আর। বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে এই অবস্থা চলছে। এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু এমপি তো বেশ কম। তাঁরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ও পাননি। তবে ধর্মকে রাজনীতির পণ্য করার এই ঝড় কেবল সংখ্যালঘুদের ওপর দিয়ে যাবে না। বড় ধর্মের বিভিন্ন তরিকার মানুষেরাও এতে আক্রান্ত হবে বা হচ্ছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি যে শত শত মাজার ভাঙা হলো, সেটা তো রাজনীতিতে ধর্মের অতিরিক্ত ব্যবহারেরই একটা ফল।
দলীয়করণমুক্ত সিভিল সার্ভিস এবং পুলিশ প্রশাসন গঠনে সরকার কতটুকু সফল হবে বলে আপনার ধারণা?
সিভিল সার্ভিস ও পুলিশ নিজস্ব গোষ্ঠীস্বার্থে সরকারপন্থী হয়ে পড়ে। আবার সরকারে থাকা দল নিজ স্বার্থে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও পুলিশকে নিরপেক্ষ থাকতে দেয় না। অর্থাৎ দুই দিকের মিলিত আগ্রহে একটা নষ্ট সংস্কৃতি তৈরি হয়। এটা ঔপনিবেশক কালের চর্চা। এখনো চলছে সমানে। গত ৫৪ বছরে এই সম্পর্ককে আমরা আলাদা করতে পারিনি। এবারও প্রশাসন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়িত হয়নি। এই দুটি নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে তেমন আলোচনাও হয়নি।
আসলে প্রশাসন, পুলিশ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এসব সংস্কার চায় না। কারণ, এটা দারুণ আরামদায়ক আর মজার জায়গা। আপনি এমপি-মন্ত্রী হবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রাজা-বাদশাহর মতো বিশাল এক প্রশাসনযন্ত্র আপনার কথায় ওঠবস করতে থাকল, আপনি কেবল তাদের দুর্নীতির সুযোগ দিলেন—উভয়ের জন্য লাভজনক এক অবস্থা। সে জন্য কেউ তারা এই অবস্থার অবসান চায় না। এই অবস্থার নির্মম শিকার হলো সাধারণ নাগরিক সমাজ। আর রাজনৈতিক শিকার হলো বিরোধী দল। তবে আমাদের দুর্ভাগ্য, বিরোধী দলগুলো সরকারি দল হয়ে পুরোনো অভিজ্ঞতার ব্যবস্থাপনাগত বদল চায় না। তারা তখন আগের নির্মমতার প্রতিশোধ নিতে পুরোনো ব্যবস্থাই হাতে চায়। অর্থাৎ এ দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল প্রবল কোনো জনচাপ ছাড়া নিরপেক্ষ ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী বা প্রশাসন গড়বে বলে মনে হয় না। আবার একই প্রশাসন ও পুলিশ তাদের ওপর জনগণের প্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব সহজে মানবে না—যদি না সব দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে সে রকম অবস্থান নেয়। বাংলাদেশে কি সব দল সে রকম অবস্থান নেবে একসঙ্গে?
বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি গণতন্ত্রচর্চায় প্রধান অন্তরায়গুলো কী?
আমাদের রাজনীতি এবং জনগণ কেউ গণতন্ত্রের অর্থবহ চর্চার জন্য প্রস্তুত হয়নি। বরং গণতন্ত্রের পথে বাধাবিপত্তি আরও বাড়বে। সমাজের সর্বত্র দক্ষিণপন্থী চিন্তা, নিজ বিশ্বাস, মত ও সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ ও সহি ভাবার অভ্যাস বেশ প্রকট। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যে নাগরিক হিসেবে একই অধিকার পাওয়ার যোগ্য এবং তার পাশাপাশি প্রাণ-প্রকৃতিও যে আমাদের জীবনধারার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এই বোধ, বিশ্বাস ও শিক্ষা আমরা পাইনি পুরোপুরি। বেশ শক্তিশালী অনেক মহল চায়ও না এই শিক্ষা ছড়াক। ফলে রাজনৈতিক গণতন্ত্র সামান্য এলেও, সামাজিক ও পরিবেশগত গণতন্ত্র বেশ অধরাই থাকবে আমাদের দেশে।
গণতন্ত্রের বিভিন্ন মানদণ্ডে বাংলাদেশ বেশ আদিম অবস্থায় আছে। নির্বাচনী ব্যবস্থাটাই চালু রাখা যাচ্ছে না ধারাবাহিকভাবে। সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা বলেও কিছু নেই। কারও মত পছন্দ না হলে মব করে তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে আসা যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। আবার কয়েকজন বিখ্যাত বুদ্ধিজীবীও প্রস্তুত আছেন সেসবকে ন্যায্যতা দিতে। তাঁরা আবার বেশ জনপ্রিয়ও! সমাজ আবার তাঁদের বুদ্ধিজীবীও মনে করে। করুণ এক অবস্থা!
নতুন সরকার ভারত, পাকিস্তান, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে অগ্রসর হতে পারে এবং এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী?
বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে বাংলাদেশের নতুন সরকার বেশ চ্যালেঞ্জে থাকবে। এটার কারণ হলো বিশ্বব্যাপী চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে ঠান্ডাযুদ্ধ। বাংলাদেশ এই ঠান্ডাযুদ্ধের চৌহদ্দিতে পড়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ে কাছে রাখতে চাইছে। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধও বাংলাদেশকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। সেই গুরুত্বের জায়গা থেকে মিয়ানমারমুখী মানবিক করিডর করার চেষ্টা দেখেছি আমরা।
বিদেশ সম্পর্কের বেলায় শেখ হাসিনার আমলের অভিজ্ঞতা হলো—একদিকে হেলে পড়ে থেকেছিল আমাদের পররাষ্ট্রনীতি। সে সময়কার সরকার তার ক্ষমতায় থাকার পেছনে অন্ধ সমর্থনের বিনিময়ে ভারতের স্বার্থ দেখছিল। এটা শেষ বিচারে ভারতের জন্যও সুখকর ও লাভজনক হয়নি। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ভারতের শাসকদের নিয়ে যে বিতৃষ্ণা, তার কারণ গত দুই দশকের বাংলাদেশ নীতি। আবার এ থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বও নিজের সর্বনাশ করেছেন।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি অবশ্যই অনেক কিছু শিখেছে। তবে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিগত সরকারের বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তির পুরো বিবরণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এখনো যা মনে হচ্ছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই চুক্তি করতে গিয়ে দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অনেক শর্তে রাজি হয়ে এসেছে। অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে হয়তো এ রকম চুক্তি করতে পেছনে তাকাতে হয়নি, কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে চুক্তির শর্তাবলি প্রতিপালন করতে হলে দেশের স্বার্থের কথা ভাবতেই হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অতি আগ্রহ এবং চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে তাদের পছন্দ-অপছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বিএনপি সরকার কীভাবে সামাল দেবে, সেটা দুর্ভাবনার বিষয়। কারণ, চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রধান এক অংশীদার রাষ্ট্র। আবার, বিগত অনির্বাচিত সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কও বেশ খারাপ হয়ে গেছে। তাকে স্বাভাবিক করা এবং ভারসাম্যপূর্ণ করাও একটা চ্যালেঞ্জ। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের স্বার্থে এবং পরস্পরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এই সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে তারেক রহমান সরকার ও মোদি সরকারকে। কিন্তু উভয় দেশের উগ্রবাদীরা সেটাকে তাদের পরাজয় হিসেবে দেখবে। তারা তখন স্যাবোটাজ করতে পারে।

নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে তার বাবার সামনে থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিশোরীটি ১৫ দিন আগে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে বিচার চাইতে গেলে সেই ইউপি সদস্য মীমাংসা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা বলেন।
২০ ঘণ্টা আগে
নবনিযুক্ত আইজিপি মব মোকাবিলার বিষয়ে কথা বলেছেন। এ জন্য তিনি সবার সহযোগিতা চেয়েছেন। আইজিপির বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার হলো, বিগত সময়টিতে মব সংস্কৃতি যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা এখন সত্যিই সবার মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ সৃষ্টি করেছে। অন্তত আইজিপি সেটা স্বীকার করেছেন।
২ দিন আগে
একটি গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর তারা দেড় বছরের এলেবেলে শাসন চালিয়েছে। অনেক অনিশ্চয়তার পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন।
২ দিন আগে
মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং থানার নথিতে ‘আত্মহত্যা’ একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৩,৪৯১ জন। মানে গড়ে দিনে ৪১ জন। একই সঙ্গে জাতীয় জরিপভিত্তিক আরেক তথ্যমতে, ২০২৩ সালে দেশে আত্মহত্যা করেছে ২০,৫০৫ জন।
২ দিন আগে