Ajker Patrika

সরকারের দুই চেহারা—কোনটি আসল, কোনটি নকল

আসলে সমাজে যাঁরা বড় মানুষ, যাঁরা মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁদের ছোটখাটো কাজও সাধারণ মানুষের কাছে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সরকারি গাড়ি নেওয়া না-নেওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির যে বিশাল একটা পরিবর্তন হয়ে যায়, তা নয়। বরং এর মাধ্যমে বড় দায়িত্বে থাকা মানুষদের মানসিকতাটা প্রকাশিত হয়।

মাসুদ কামাল
সরকারের দুই চেহারা—কোনটি আসল, কোনটি নকল

দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের মধ্যে দুটি ধারা দেখা যাচ্ছে। প্রথমটি—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কিছু কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বিএনপি ও তার নেতাদের গতানুগতিক কাজকর্ম। এই দুই ধারার মধ্যে মিলের চেয়ে যেন অমিলই বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারছেন না, আগামী দিনগুলোতে ঠিক কোন ধরনের সরকার তাঁরা দেখতে পাবেন। সরকারের কর্মকাণ্ডে কোন ধারাটি প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে—তারেক রহমানের ব্যতিক্রমী রাজনীতি, নাকি বিএনপির গতানুগতিক রাজনীতি?

শপথ নেওয়ার পরপরই বিএনপির সংসদ সদস্যরা ঘোষণা করলেন, তাঁরা শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট নেবেন না। এটি অবশ্যই একটা বড় ঘোষণা। এই দুটি খাত থেকে এমপি সাহেবদের নিশ্চিত কিছু অর্থনৈতিক লাভ হয়। এমনও অনেকে আছেন, এই দুই ক্ষেত্রের মুনাফা দিয়ে তাঁর নির্বাচনের ব্যয়টা তুলে ফেলেন! সে সুযোগটা তাঁদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এ সিদ্ধান্তটা তাঁরা যে আগে থেকেই চিন্তাভাবনা করে নিয়েছেন, তা আমি মনে করি না।

সে রকম হলে তো বিষয়টিকে তাঁরা তাঁদের নির্বাচনী ইশতেহারেই রাখতে পারতেন; তা তো করেননি। এই এমপি সাহেবরা আগে থেকে এ ক্ষেত্রে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। শপথের পর সংসদ সদস্যদের প্রথম সভায় তারেক রহমান হুট করে বলে ফেলেছেন, তাই কারও পক্ষে আর এর প্রতিবাদ বা দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ হয়নি। এমন সিদ্ধান্তে কার মনে কতটা দুঃখের জন্ম হয়েছিল, সে হিসাব করা না গেলেও এতটুকু বলা যায়, রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল বিএনপি। সাধারণ মানুষের মনে দলটি সম্পর্কে একটা চিন্তা তৈরি হয়েছিল। মানুষ ভেবেছেন, তারা কেবল নিতেই আসেনি! এ ভাবনাটা গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের এমন ভাবনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেই হয়তো তারেক রহমান পরের সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছেন, যেমনটি আগে কখনোই ঘটেনি। জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করবেন না, নিজের যে টয়োটা গাড়িটি আছে, সেটিই ব্যবহার করবেন। সেই সঙ্গে গাড়ির জন্য তিনি সরকারের কাছ থেকে জ্বালানি তেলও নেবেন না। সরকারি ড্রাইভার নেবেন না, ড্রাইভারের বেতন নিজেই দেবেন। এর আগে কোনো সরকারপ্রধান এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে আমার জানা নেই। সে বিচারে এটাকে অভিনবই বলা চলে।

কিন্তু অভিনব মানেই কি কার্যকর? কেউ কেউ অবশ্য এরই মধ্যে এমন প্রশ্নও করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ি নিলেন কি নিলেন না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিনি দেশটা ঠিকঠাকমতো চালাতে পারছেন কি না। মানুষ তাঁর কাছে প্রত্যাশা করবে, তিনি যেন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে পারেন। সে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বার্থে তাঁকে যদি সরকারি গাড়ি একটার জায়গায় দুটোও ব্যবহার করতে হয়, তা-ও সই। আমরা কাজ ও তার ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকব।

এসব যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলতেই থাকবে। আপনি যে-ই হোন না কেন, যে কাজই করেন না কেন, দুদিকেই মত-দ্বিমত থাকবে। সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে। বিবেচনায় নিয়েই নিজের সিদ্ধান্তটি নিতে হবে। আমি ঠিক বুঝি না, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রে সরকারি গাড়ি নেওয়া না-নেওয়াটা সাংঘর্ষিক কি না। গাড়ি না নিলে কি সরকারি কাজ ঠিকঠাকমতো করা যাবে না? অথবা যাঁরা গাড়ি, জ্বালানি, চালক-সম্পর্কিত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পরিপূর্ণভাবে নেন, তাঁরা কি তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব দারুণভাবে পালন করেন? অতীতে আমরা অনেক ব্যর্থ শাসককে দেখেছি, তাঁরা নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, আত্মীয়স্বজনের জন্য পর্যন্ত সরকারি গাড়ি-বাড়ির সুবিধা নিয়েছেন। সেসব আমাদের জন্য ভালো কোনো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি।

আসলে সমাজে যাঁরা বড় মানুষ, যাঁরা মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁদের ছোটখাটো কাজও সাধারণ মানুষের কাছে উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সরকারি গাড়ি নেওয়া না-নেওয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির যে বিশাল একটা পরিবর্তন হয়ে যায়, তা নয়। বরং এর মাধ্যমে বড় দায়িত্বে থাকা মানুষদের মানসিকতাটা প্রকাশিত হয়। তাঁরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে যত দূর পারা যায় নেওয়ার জন্য, নাকি যতটুকু সম্ভব দেওয়ার জন্য দায়িত্বে বসেছেন—তার প্রকাশ ঘটে। যে প্রকাশ বিএনপির সংসদ সদস্যরা একেবারে শুরুর দিনই প্লট ও শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে ঘটিয়েছিলেন। আমি বড় আশা করেছিলাম প্লট ও গাড়ির মতো এবারও বুঝি অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী অনুসরণ করবেন প্রধানমন্ত্রীকে। কিন্তু বাস্তবে সেটা তেমন একটা দেখলাম না।

একমাত্র কৃষিমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ বললেন না, তাঁরা সরকারি এসব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করবেন না। অথচ এসব মন্ত্রীর সিংহভাগই কিন্তু বেশ সচ্ছল। অন্তত নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী তাঁদের সম্পদ যে তারেক রহমানের চেয়ে বেশি, সেটা তো বলাই যায়। তাঁদের কি নিজস্ব গাড়ি নেই? মন্ত্রী হওয়ার আগে তাঁরা কি নিজস্ব মালিকানার গাড়ি চালাতেন না? আমার তো মনে হয়, তাঁদের প্রায় সবারই একাধিক দামি গাড়ি আছে। মন্ত্রী হওয়ার পর সরকারি গাড়ি পাওয়ার পর তাঁদের আগের সেই মূল্যবান গাড়িগুলো কি তাঁরা ফেলে দিয়েছেন? তাহলে সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার ঘোষণা দিতে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা আসলে সামর্থ্যে নয়, সমস্যাটা মানসিকতায়। তাঁরা এমপি বা মন্ত্রী হয়েছেন নেওয়ার জন্য, দেওয়ার জন্য নয়।

এর প্রতিফলনও এরই মধ্যে আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। উদাহরণ হিসেবে বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা বলা যায়। তবে এখানে মাত্র দুটো বিষয় নিয়ে বলি। এই যে ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে দলীয় লোককে নিয়োগ করা, এটা কিন্তু সেই উদার রাজনীতির প্রকাশ ঘটায় না। বরং সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসানোকেই প্রতিষ্ঠা দেয়। কেবল দলীয় লোক হলেও না হয় চলত, দলের এমন লোককে দেওয়া হলো যাঁরা সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। এর মাধ্যমে আসলে কী প্রমাণ হলো? জনগণ যাঁকে প্রত্যাখ্যান করল, তাঁকে আপনি সেই জনগণেরই মাথার ওপর আরও বড়, আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিলেন! এটা কি ঠিক হলো? একে কি গণতন্ত্র বলে?

অথবা ধরা যাক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে রদবদলের বিষয়টি। নতুন সরকার তাদের নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন কাউকে, অধিকতর যোগ্য কাউকে এমন সংবেদনশীল পদে বসাতেই পারে। কিন্তু একজন ঋণগ্রস্ত, যিনি মাসকয়েক আগেও ঋণখেলাপি ছিলেন, যাঁর ব্যাংকিংয়ের কোনো ক্যারিয়ারই নেই, যিনি একজন খুবই মাঝারি মানের সোয়েটার ব্যবসায়ী, তাঁকেই এনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বানিয়ে দিলেন! এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কী হতে পারে? এমনকি আমার কাছে তো খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানানোর চেয়েও বড় বিস্ময়কর ঠেকেছে এই মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগকে। এই যে বিস্ময়, এর কোনো ব্যাখ্যা কি এখনো মিলেছে সরকারের কাছ থেকে? আমার কেন যেন মনে হয়, এ বিস্ময়কর নিয়োগগুলো এসেছে বিএনপির রাজনীতির ওই দ্বিতীয় ধারা থেকে। আমরা যে রাজনীতি দেখে দেখে চরম বিরক্ত, তারই ধারাবাহিকতা এসব।

আমাদের দেশের রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো মোটামুটি স্বাভাবিক বিষয়। প্রতিটি আমল যেন আগের আমলের চেয়েও বীভৎস চেহারা নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু তারেক রহমানকে ঘিরে দেশের অনেক মানুষের মনেই তো নতুন একটা রাজনীতির প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এত বছর পশ্চিমা বিশ্বে থেকে এসেছেন, তাঁর জীবনযাপন, চিন্তাভাবনায় নিশ্চয়ই সেই দেশের একটা প্রভাব থাকবে। যার কিছুটা প্রকাশ আমরা একেবারে শুরুর দিন থেকে দেখেছি। এসব নতুন চিন্তা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর দলের প্রচলিত সেই দ্বিতীয় ধারাকে অতিক্রম করে যেতে পারবে কি না, সেটিই যেন এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত