Ajker Patrika

ক্যাঙারু আইল্যান্ড: যে দ্বীপ কোয়ালাদের টিকে থাকার শেষ ভরসা

ফিচার ডেস্ক
ক্যাঙারু আইল্যান্ড: যে দ্বীপ কোয়ালাদের টিকে থাকার শেষ ভরসা
অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলের ‘ক্যাঙারু আইল্যান্ড’ এখন কোয়ালাদের টিকে থাকার শেষ আশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: পেক্সেলস

অস্ট্রেলিয়ার প্রতীক বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইউক্যালিপটাসগাছের ডালে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা আদুরে প্রাণী কোয়ালা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রাণীরা এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। একদিকে বন উজাড় আর জলবায়ু পরিবর্তন, অন্যদিকে ‘ক্ল্যামাইডিয়া’ (Chlamydia) নামক এক মরণব্যাধি। যে রোগ তাদের বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে। এই মহাসংকটের মাঝে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকূলের ‘ক্যাঙারু আইল্যান্ড’ এখন কোয়ালাদের টিকে থাকার শেষ আশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মরণব্যাধি ও কোয়ালাদের বিপন্নতা

অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের কোয়ালাদের মধ্যে ক্ল্যামাইডিয়া মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাকটেরিয়াজনিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে কোয়ালারা অন্ধত্ব, বন্ধ্যাত্ব এবং নিউমোনিয়ার শিকার হচ্ছে। মানুষের ক্ষেত্রে এই রোগ প্রাণঘাতী না হলেও কোয়ালাদের জন্য এটি নিশ্চিত মৃত্যু। মূল ভূখণ্ডের কোনো কোনো এলাকায় প্রায় ৮৮ শতাংশ কোয়ালাই এই রোগে আক্রান্ত। কিন্তু ক্যাঙারু আইল্যান্ডের কোয়ালারা এখনো এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ১৯২০-এর দশকে পশম-বাণিজ্যের হাত থেকে বাঁচাতে মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২০টি কোয়ালা এই দ্বীপে আনা হয়েছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা এখন প্রায় ১০ হাজার। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ায় বাইরের সংক্রমণ এখানে পৌঁছাতে পারেনি।

জেনেটিক দুর্বলতা

রোগমুক্ত হলেও এই দ্বীপের কোয়ালারা অন্য এক সংকটের মুখোমুখি। বর্তমানের হাজার হাজার কোয়ালা মাত্র ২০টি পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে। তাই এদের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য অত্যন্ত কম। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, দীর্ঘকাল নিজেদের মধ্যে প্রজননের ফলে এদের শারীরিক বিকৃতি দেখা দিচ্ছে। যেমন কারও মেরুদণ্ড বাঁকা, আবার কারও প্রজনন অঙ্গে ত্রুটি। বিজ্ঞানীরা একে ‘এক্সটিংক্টন ভের্টেক্স’ বা বিলুপ্তির ঘূর্ণিপাক বলছেন। যেখানে জিনগত দুর্বলতার কারণে একটি পুরো প্রজাতি হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

ক্যাঙারু আইল্যান্ডের কোয়ালারা এখনো ক্ল্যামাইডিয়া নামক এক মরণব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ছবি: পেক্সেলস
ক্যাঙারু আইল্যান্ডের কোয়ালারা এখনো ক্ল্যামাইডিয়া নামক এক মরণব্যাধি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ছবি: পেক্সেলস

বিজ্ঞানীদের উদ্ধার পরিকল্পনা

অ্যাডিলেডের ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী কারেন বার্ক ডা সিলভা এবং জুলিয়ান বিম্যান কোয়ালাদের এই দুই সংকট থেকে বাঁচাতে ভিন্ন এক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। ২০২৪ সালে দাতা সংস্থা ও ব্যক্তিগত অর্থায়নে তারা দ্বীপে ১ হাজার ৩০০ একর জমি কিনে একটি অভয়ারণ্য তৈরি করেছেন। এখানে দ্বীপের প্রায় ১০ শতাংশ কোয়ালা নিরাপদে বসবাস করছে। এ বছরের শেষ নাগাদ বিজ্ঞানীরা মূল ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে এমন কিছু পুরুষ কোয়ালা দ্বীপে আনবেন, যারা স্বাস্থ্যবান এবং ক্ল্যামাইডিয়া মুক্ত। উদ্দেশ্য হলো, তাদের সঙ্গে দ্বীপের নারী কোয়ালাদের প্রজনন ঘটিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে জিনগত বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা। যখন দ্বীপের কোয়ালারা জিনগতভাবে শক্তিশালী এবং রোগমুক্ত হয়ে উঠবে, তখন তাদের আবার অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় ছেড়ে দেওয়া হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান

এই প্রকল্প শুধু বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল নয়, ২০২৬ সালের বসন্তে এই অভয়ারণ্য পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। আর সেখান থেকে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান আসবে। গবেষকেরা এই কাজে স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর সাহায্য নিচ্ছেন। এই জনগোষ্ঠীদের কাছে দ্বীপটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বিজ্ঞানীদের মতে, কোয়ালারা বর্তমানে অনেক সমস্যায় জর্জরিত। যদি এখনই ক্যাঙারু আইল্যান্ডের এই রোগমুক্ত এবং শক্তিশালী জিন সমৃদ্ধ কোয়ালাদের রক্ষা করা না যায়, তাহলে হয়তো দেরি হয়ে যাবে অনেক। এই প্রকল্প সফল হলে তা বিশ্বের অন্যান্য বিপন্ন প্রাণীকে রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি আদর্শ মডেল হয়ে থাকবে।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, শুধু প্রকৃতিকে সারিয়ে তোলাই মানুষের কাজ নয়। মানুষের নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্যও প্রকৃতিকে সুস্থ রাখা প্রয়োজন। ক্যাঙারু আইল্যান্ডের এই লড়াই আসলে সেই হারানো ভারসাম্য ফিরে পাওয়ারই লড়াই।

সূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বোমা তৈরির পিডিএফ ফাইল ছড়ানো ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার

ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের এক ক্রু জীবিত উদ্ধার

মার্কিন দ্বিতীয় পাইলটকে হন্যে হয়ে খুঁজছে ইরান, ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ঘোষণা

নিখোঁজ পাইলটদের খুঁজতে গিয়ে ভূপাতিত মার্কিন হেলিকপ্টার: মেহের নিউজ

দলীয় পদ ছাড়ছেন জোনায়েদ সাকি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত