Ajker Patrika

মনোযোগ হারাচ্ছেন? জেনে নিন বাড়ানোর উপায়

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১১: ১৯
মনোযোগ হারাচ্ছেন? জেনে নিন বাড়ানোর উপায়
মনোযোগ দিতে না পারা সব সময় কোনো বড় বিপদ নয়; তবে এটি শরীরের কোনো গুপ্ত সমস্যার সংকেত হতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

‘কোনো কিছুতে তোমার মনোযোগ নেই’—এমন কথা শোনে না, তেমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। প্রতিটি ভাষায় এর আলাদা সংস্করণ আছে। কিন্তু আসলে এই ‘মনোযোগ’ বিষয়টি কী?

মনোযোগ বা অ্যাটেনশন হলো একটি মানসিক প্রক্রিয়া। সহজ করে বলা যায়, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্য সবকিছু থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়, বস্তু বা চিন্তার ওপর মানুষ তার পুরো চেতনাকে কেন্দ্রীভূত করে, সেই প্রক্রিয়াই মনোযোগ। এটি আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কাজের দক্ষতা এবং প্রতিদিনের জীবনযাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর অভাব মানেই আপনি ব্যর্থ নন। মনোযোগের অভাব একটি সংকেত। এই সংকেত দেখা দিলেই বুঝতে হবে, আপনার শরীর ও মন কিছুটা বিশ্রাম বা বাড়তি যত্নের কথা বলছে। ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করে এবং প্রয়োজনে পেশাদার মনোবিদের সাহায্য নিয়ে পুনরায় মনোযোগ ফিরে পাওয়া যেতে পারে।

মনোযোগ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ

মনোযোগ দিতে না পারা সব সময় কোনো বড় বিপদ নয়। তবে এটি শরীরের কোনো গুপ্ত সমস্যার সংকেত। এর কারণ হতে পারে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ওসিডি। আবার শারীরিক সমস্যার কারণেও মনোযোগ কমে যেতে পারে। যেমন ঘুমের অভাব বা স্লিপ অ্যাপনিয়া, দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, নারীদের ক্ষেত্রে মেনোপজ এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি। এ ছাড়া এডিএইচডি, ডিসলেক্সিয়া বা মাথায় আঘাতের কারণেও মনোযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও মনোযোগে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যেমন বিষণ্নতার ওষুধ, কেমোথেরাপি বা ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া।

মনোযোগ বাড়ানোর বৈজ্ঞানিক টিপস

দিনে অন্তত ১৫ মিনিট সুডোকু, ক্রসওয়ার্ড পাজল, দাবা বা মেমোরি গেম খেললে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়তে পারে। ছবি: পেক্সেলস
দিনে অন্তত ১৫ মিনিট সুডোকু, ক্রসওয়ার্ড পাজল, দাবা বা মেমোরি গেম খেললে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়তে পারে। ছবি: পেক্সেলস

বিভিন্ন গবেষণায় গবেষকেরা দেখেছেন, কিছু ছোট অভ্যাসের কারণে আমাদের মস্তিষ্ক আরও বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে পারে। এগুলোর মধ্যে আছে—

মস্তিষ্কের ট্রেনিং: দিনে অন্তত ১৫ মিনিট সুডোকু, ক্রসওয়ার্ড পাজল, দাবা বা মেমোরি গেম খেললে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ে।

ঘুমের মান উন্নয়ন: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন। ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন বন্ধ রাখা উচিত।

প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানো: প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় পার্কে বা সবুজের মাঝে হাঁটাহাঁটি করলে মানসিক প্রশান্তি আসে এবং মনোযোগ বাড়ে। ইনডোর প্ল্যান্ট বা ঘরের ভেতর গাছ রাখাও এ ক্ষেত্রে সহায়ক।

টাইম ব্লকিং ও পোমোডোরো টেকনিক: একটানা কাজ না করে ২৫ মিনিট কাজ এবং ৫ মিনিট বিরতি, এই পদ্ধতি অনুসরণ করুন। কাজ করার সময় মোবাইল ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।

সুষম খাদ্য: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (মাছ), ডিম, বেরি ও পালংশাকের মতো খাবার তালিকায় রাখুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

সুরেলা রাখুন কাজের পরিবেশ

গান বা শব্দ আমাদের মনোযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবে তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কাজ বা পড়ার সময় হালকা শব্দ বা প্রকৃতির শব্দ মানসিক চাপ কমিয়ে মন শান্ত রাখে। তবে হ্যাঁ, কঠিন কোনো বিষয় পড়ার সময় গান না শোনাই ভালো। যদি শুনতেই হয়, তবে গানের বদলে বাদ্যযন্ত্রের সুর বা ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিক বেছে নিন। গানের ভলিউম খুব কম রাখুন, যেন তা ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকে। খুব পছন্দের বা অপছন্দের গান এড়িয়ে চলুন, না হলে মন গানেই আটকে যাবে।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

আমরা যা খাই, তার সরাসরি প্রভাব আমাদের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের ওপর পড়ে। মনোযোগ বাড়াতে প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি এবং চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। সামুদ্রিক মাছ, ডিম, বেরি জাতীয় ফল ও পালংশাক মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। শরীর সামান্য পানিশূন্য হলেও মনোযোগ ধরে রাখা বা তথ্য মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিজেকে সব সময় হাইড্রেটেড রাখা জরুরি। ক্যাফেইন মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার গতি বাড়াতে সাহায্য করে। কফি বা চা ছাড়া ৭০ শতাংশ কোকো সমৃদ্ধ ডার্ক চকলেট প্রায় একই ধরনের উপকার করে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাপানি গ্রিন টি বা মাচা-তে থাকা ফাইটোকেমিক্যাল মস্তিষ্কের ক্ষয় রোধ করে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। অনেকে মনোযোগ বাড়াতে ব্রাহ্মী শাক, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা জিনসেংয়ের মতো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। তবে সাপ্লিমেন্টে পুষ্টির পরিমাণ খুব বেশি থাকে, যা সবার শরীরের জন্য নিরাপদ না-ও হতে পারে। তাই যেকোনো সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাকৃতিক খাবার বা ভেষজ চা থেকে এই পুষ্টি গ্রহণ করা অনেক বেশি নিরাপদ।

কখন চিকিৎসক দেখাবেন

সাধারণ মনোযোগের অভাব এবং গুরুতর সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—

  • স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি স্মৃতিশক্তি লোপ পেলে
  • কাজ বা পড়াশোনায় পারফরম্যান্স অনেক কমে গেলে
  • ঘুমের তীব্র সমস্যা বা সারাক্ষণ ক্লান্তি বোধ করলে

জরুরি অবস্থা

মনোযোগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু লক্ষণ দেখা দিলে তা জরুরি অবস্থার পর্যায়ে চলে যায়। সেগুলো হলো—

  • শরীরের এক পাশে অবশ ভাব বা ঝিনঝিন করা
  • তীব্র মাথাব্যথা বা বুকে ব্যথা
  • কথা বলতে সমস্যা হওয়া বা অসংলগ্ন কথা বলা
  • হঠাৎ জ্ঞান হারানো

রোগনির্ণয় ও চিকিৎসা

চিকিৎসকেরা সাধারণত আপনার স্বাস্থ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনে কিছু পরীক্ষা করে চিকিৎসা দেবেন।

পরীক্ষা

রক্ত পরীক্ষা: হরমোনের মাত্রা বা পুষ্টির অভাব বুঝতে।

সিটি স্ক্যান: মস্তিষ্কের গঠনগত পরিবর্তন দেখতে।

ইইজি: মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ মাপতে।

বিহেভিয়ার থেরাপি: এডিএইচডি বা ওসিডিপির ক্ষেত্রে ওষুধ এবং থেরাপির সমন্বয় কার্যকর করার জন্য।

সূত্র: হেলথ লাইন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত