Ajker Patrika

শিশুকে সফল হিসেবে দেখতে চান? শুরু হোক ঘরের কাজ দিয়ে

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৩: ০৩
শিশুকে সফল হিসেবে দেখতে চান? শুরু হোক ঘরের কাজ দিয়ে
গবেষণা ফলাফল জানাচ্ছে, ঘরের কাজ করতে জানা শিশুদের জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

নিজের সন্তানকে সফল হিসেবে দেখতে কে না চায়? বিষয়টি কঠিন কিছু নয় বলে জানাচ্ছেন গবেষকেরা।

গবেষণা থেকে জানা যায়, ঘরের কাজ করতে জানা শিশুদের জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শৈশব মানে শুধু খেলাধুলা বা পড়াশোনা নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি গড়ার উপযুক্ত সময়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭৫ বছরের একটি গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে একটি ভিন্ন সম্ভাবনার কথা। গবেষণার ফলাফলে দাবি করা হয়েছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে ঘরের কাজে অংশ নেয়, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। ঘরের ছোট ছোট কাজ শিশুদের মধ্যে এমন কিছু গুণ তৈরি করে, যা কোনো পাঠ্যবই শেখাতে পারে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শৈশবের ছোট ছোট দায়িত্ব একটি শিশুকে মানসিকভাবে পরিপক্ব ও স্বাবলম্বী করে তোলে।

গবেষণা যা বলছে

হার্ভার্ড স্টাডি: ১৯৩৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, সফল ব্যক্তিদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁরা ছোটবেলায় নিয়মিত ঘরের কাজ করতেন। এটি তাঁদের মধ্যে শক্তিশালী ওয়ার্ক এথিকস বা কাজের প্রতি নিষ্ঠা তৈরি করেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য: ২০১৯ সালের একটি গবেষণা জানাচ্ছে, যেসব শিশু কিন্ডারগার্টেন থেকে ঘরের কাজে যুক্ত থাকে, পরবর্তী জীবনে তাদের গণিতের নম্বর এবং আত্মবিশ্বাস অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি হয়।

সঠিক সময়: মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণামতে, ৩ থেকে ৪ বছর বয়সে শিশুকে ছোট কাজে যুক্ত করা ভালো। ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সে শুরু করলে তার প্রভাব ততটা কার্যকর হয় না।

আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ

গবেষণা বলছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে নিজের খেলনা গোছানো বা ঘর পরিষ্কারের মতো কাজে অংশ নেয়, তাদের মধ্যে একধরনের আত্মকার্যকারিতা তৈরি হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭৫ বছরের এক বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে ঘরের কাজ করা শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পেশাগত জীবনে অনেক বেশি সফল হয়। এর কারণ হলো, তারা খুব অল্প বয়স থেকে একটি কাজ শুরু করে তা শেষ করার আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করতে শেখে। এই অভ্যাসের ফলে তারা বড় হয়ে যেকোনো কঠিন কাজকে ভয় না পেয়ে বরং চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

সময় ব্যবস্থাপনা ও কর্মনিষ্ঠা

সাফল্যের একটি বড় শর্ত হলো সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা। ঘরের কাজে নিয়োজিত থাকলে শিশুরা বুঝতে পারে, পৃথিবী শুধু তাদের ইচ্ছেমতো চলে না। তারা বুঝতে শেখে, পৃথিবীতে কিছু কাজ রুটিনমাফিক করতে হয়। পড়াশোনার ফাঁকে বা খেলার আগে নিজের কাপড় ভাঁজ করা বা থালাবাসন ধোয়ার মাধ্যমে তারা কাজের গুরুত্ব নির্ধারণ করতে শেখে। এই অভ্যাস বড় হয়ে কর্মক্ষেত্রে তাদের সময়ানুবর্তী এবং অত্যন্ত নিষ্ঠাবান করে গড়ে তোলে।

সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা

একটি শিশু যখন ঘরের কাজে হাত লাগায়, তখন সে পরোক্ষভাবে তার বাবা-মায়ের পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে পারে। এটি তাদের মধ্যে গভীর সহমর্মিতা তৈরি করে। তারা বুঝতে শেখে যে একটি সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে পরিবারের সবার অবদান প্রয়োজন। এই টিমওয়ার্ক বা দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোকে মজবুত করে এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের কাজ করা শিশুরা অন্যদের চেয়ে বেশি বন্ধুবৎসল এবং পরোপকারী হয়।

স্বনির্ভরতা বনাম পরনির্ভরশীলতা

অনেক সময় অভিভাবকেরা ভালোবেসে শিশুদের সব কাজ নিজে করে দেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এটি শিশুদের জন্য আসলে ক্ষতিকর। এতে তারা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং নতুন কিছু করার সাহস হারায়। অন্যদিকে, ৩ থেকে ৪ বছর বয়স থেকে শিশুকে ছোট ছোট কাজে উৎসাহিত করলে তারা স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে, নিজের যত্ন এবং নিজের চারপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্বটি একান্তই তাদের। এই স্বনির্ভরতা তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে এবং ভবিষ্যতে একাকী যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহায্য করে।

বয়স অনুযায়ী কিছু সহজ কাজের তালিকা

৩ থেকে ৫ বছরের শিশুদের খেলনা গুছিয়ে রাখা, ময়লা জামাকাপড় ঝুড়িতে রাখা, পোষা প্রাণীকে খাবার দেওয়ার মতো কাজের সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারেন। ৬ থেকে ৯ বছরের শিশুদের খাবার টেবিল গোছানো, নিজের বিছানা ঠিক করা, বাগান করা বা গাছে পানি দেওয়ার মতো কাজ করাতে পারেন। আর ১০ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের দিয়ে কাপড় ভাঁজ করা, ঘর মোছা বা ঝাড়ু দেওয়া, হালকা রান্না বা খাবার পরিবেশন করাতে পারেন।

নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই

একটি শিশু যখন প্রথমবার ঘর কিংবা থালাবাসন পরিষ্কার করবে, তা হয়তো নিখুঁত হবে না। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আপনার কাজ হলো তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করা। শিশুদের কাজ করে দিলে তারা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ হারাবে। মনে রাখতে হবে, আজকের ছোট ছোট কাজই ভবিষ্যতে তাদের দায়িত্বশীল ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। শিশুদের ঘরের কাজ করানো মানে তাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া নয়, বরং তাদের জীবনের বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা। এটি তাদের সৃজনশীলতা বাড়ায়, যুক্তি দিয়ে সমস্যা সমাধান করতে শেখায় এবং সর্বোপরি একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাই শিশুদের কাজ করতে দেওয়া শুধু ঘরের পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়, বরং তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত