Ajker Patrika

ইরান চুক্তির পরপরই ভোটারদের রোষানলে পড়তে চলেছেন নেতানিয়াহু

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ০১: ০২
ইরান চুক্তির পরপরই ভোটারদের রোষানলে পড়তে চলেছেন নেতানিয়াহু
গত ১৫ জুন জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার যে আশা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এত দিন করে আসছিলেন, তা ইতিমধ্যে নড়বড়ে ছিল। তবে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি তাঁর সেই রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও বেশি জটিল ও সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।

ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জিত হওয়ার অনেক আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান ও লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর ফলে গত মার্চ মাসে নেতানিয়াহুর দেওয়া সেই বক্তব্য (আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি) এখন অনেকটাই ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে।

এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের আকস্মিক হামলার আগাম নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যর্থতা নিয়ে ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু এরই মধ্যে কোণঠাসা। এর ওপর এখন যোগ হয়েছে যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর অদূরদর্শিতা এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি। আসন্ন নির্বাচনে ভোটাররা মূলত এই বিষয়গুলো দিয়েই তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।

যদিও সমস্ত জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট এবার শোচনীয়ভাবে হারতে চলেছে, তবু ১৯৯০-এর দশক থেকে ইসরায়েলি সংসদীয় রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা এই ঝানু নেতাকে একদম উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।

নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি তাঁকে একজন কট্টরপন্থী ‘নিরাপত্তা রক্ষক’ হিসেবে চিত্রিত করে। তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন এবং ইরানের ওপর হামলার পক্ষে অনড় ছিলেন। ২০২৫ সালেও তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হতে দেবেন না।

কিন্তু হামাসের হামলার আগে গোয়েন্দা-ব্যর্থতা এবং পরে গাজা ও লেবাননে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক ইসরায়েলি সেনার মৃত্যুর পরও কোনো স্থায়ী বা চূড়ান্ত বিজয় না আসায় তাঁর সেই কট্টর ইমেজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। অধিকাংশ ইসরায়েলি যুদ্ধের পক্ষে থাকলেও, তাঁরা বর্তমানে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলের বিরুদ্ধে চলে গেছেন। হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড ইসরায়েলে উদ্‌যাপন করা হলেও বাস্তবতা হলো হামাস এখনো গাজার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং হিজবুল্লাহ লেবাননে টিকে রয়েছে।

ট্রাম্পের চুক্তির পর ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘নেতানিয়াহু এই যুদ্ধে হেরে গেছেন। তিনি যা দেওয়ার কথা ছিল, তা দিতে পারেননি; সত্যের মুখোমুখি হওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে তিনি ভেঙে পড়েছেন।’

এদিকে গাজায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

পাশ্চাত্যের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করলেও খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গেই তিনি বৈরী সম্পর্ক তৈরি করেছেন। এক জীবনীকারের তথ্যমতে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নেতানিয়াহুকে ‘সন অব আ বিচ’ বলে গালি দিয়েছিলেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ডোনাল্ড ট্রাম্পও গত জুন মাসে এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের ভোটারদের মধ্যেই এখন ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে।

১৯৭৬ সালে উগান্ডার এন্টেবেতে অপহৃত বিমানযাত্রীদের উদ্ধার অভিযানে গিয়ে নিহত বড় ভাই ইয়োনির মৃত্যুর পর রাজনীতিতে আসেন নেতানিয়াহু। ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কট্টরপন্থী ও উগ্র-অর্থোডক্সদের নিয়ে জোট সরকার গঠন করেন তিনি। দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়ে ২০২২ সালে ষষ্ঠবারের মতো ক্ষমতায় এসে তিনি দেশটির সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্যোগ নেন, যা ২০২৩ সালে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ-বিক্ষোভের জন্ম দেয়।

নেতানিয়াহু মূলত ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা না দিয়েই আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিজের এক ঐতিহাসিক লিগ্যাসি বা গৌরবময় অধ্যায় তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের হামাসের হামলা এবং রক্তক্ষয়ী গাজা যুদ্ধ তাঁর সেই পরিকল্পনাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থান এখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, যার ফলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান অত্যন্ত তিক্ত ও বিতর্কিত হতে চলেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত