Ajker Patrika

হরমুজ বন্ধে চা–সমুচা–দোসার রসনাবঞ্চিত ভারতীয়রা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
হরমুজ বন্ধে চা–সমুচা–দোসার রসনাবঞ্চিত ভারতীয়রা

ইরানের হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অবরোধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। অনেকের ভয়, পেট্রোল পাম্প ‘শুকিয়ে’ যেতে পারে। তবে ভারতে এর আরেক প্রভাব পড়েছে খাবারের জগতে। কিছু রেস্তোরাঁ মালিক ও স্ট্রিট ফুড ক্রেতাদের মুখে তেতো স্বাদ ফেলেছে পরিস্থিতি। কোথাও মেনু থেকে সমুচা উধাও, কোথাও আবার চায়ে নেই সেই চেনা সুবাস।

বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি ভারত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) প্রায় ৮৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ১৪০ কোটি মানুষের রান্নার বড় অংশই এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সরকার শিল্পখাত থেকে এলপিজি সরিয়ে ঘরোয়া ব্যবহারে দিচ্ছে। ক্যানটিন, হোটেল ও রেস্তোরাঁর মতো বাণিজ্যিক রান্নাঘরগুলো তাই সংকটে পড়েছে, যাতে অন্তত বাড়ির চুলায় আগুন জ্বলে থাকে।

রান্নাঘর চালু রাখতে অনেক শেফ বা রাঁধুনি বিকল্প খুঁজছেন বা কিছু খাবার কমিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় রান্না আর ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক কয়েলের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়।

ভারতীয় রান্না মানেই তীব্র আঁচ, ভারী ঢালাই লোহার প্যান আর খোলা আগুনের জাদু। গ্যাসের শিখা না থাকলে কারির স্বাদে গভীরতা আসে না, তন্দুরি মেরিনেড ঠিকমতো দগ্ধ হয় না, আর প্রিয় সমুচা—যার জন্য ফুটন্ত তেল দীর্ঘক্ষণ ধরে বজায় রাখা দরকার—তা হয়ে যায় ফ্যাকাশে ও নরম।

উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জয়পুরের জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ ‘গুলাবজি চাই’-এর মালিক চেতন সিং জানান, এলপিজি সংকটে তাঁদের সবচেয়ে ‘আইকনিক আইটেম যেমন বান-বাটার ও সমুচা’ মেনু থেকে বাদ দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এগুলোই সাধারণত এখানে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে খায়। তাই মানুষ হতাশ, কারণ জয়পুরে এলে অনেকেই এখানে থামে।’

তাঁদের বিখ্যাত চা তৈরির পদ্ধতিতেও ছাড় দিতে হয়েছে। সুগন্ধি, দুধ-মেশানো মসলা চায়ের সেই স্বাদ আর থাকছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা ইন্ডাকশন চুলায় চা ফুটাচ্ছি, কিন্তু আগের মতো নয়, সেই স্বাদ আসছে না। মেনু সীমিত করেছি, কিন্তু কোনোটারই স্বাদ আগের মতো নয়। কারণ গ্যাসের চুলার আগুন থেকে যে তাপ আর স্বাদ আসে, সেটা অন্যভাবে পাওয়া যায় না।’

সংকট মোকাবিলায় দেশীয় রিফাইনারিগুলোতে এলপিজি উৎপাদন প্রায় ৩৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বলে মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ভারত সরকার। সারা দেশে মজুতদারি ও কালোবাজারি ঠেকাতেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অভিযানে ১৫ হাজারের বেশি সিলিন্ডার জব্দ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

তবু এই অনিশ্চয়তা ভারতের দ্রুতগতির স্ট্রিট ফুড সংস্কৃতি ও ফাস্ট-ফুড ব্যবসায় ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। দিল্লি ও মুম্বাইয়ে শাখা থাকা ‘বেন্নে দোসা’ রেস্তোরাঁ চেইনের প্রতিষ্ঠাতা অখিল আইয়ার জানান, রান্নাঘর চালাতে তাঁকে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ইডলি আর ভাজা আইটেমগুলো ইন্ডাকশনে নিয়ে গেছি। গ্যাস থেকে যা সরানো যায়, সরিয়ে দিয়েছি।’

তবে বাষ্পে রান্না বা ভাজা খাবার ইলেকট্রিক তাপে চললেও তাঁর মেনুর প্রধান আকর্ষণটি টিকে থাকতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘দোসা ইন্ডাকশনে বানিয়ে দেখেছি, মান ভালো হয়নি। এতে আগুন দরকার, গ্যাস দরকার। আমরা ঢালাই লোহার তাওয়ায় বানাই, খাস্তা করতে তীব্র তাপ লাগে, তবেই আমরা যে মান চাই তা পাওয়া যায়।’

মুম্বাইয়ের একটি শাখায় শেষ সিলিন্ডার চলায় তারা দোসা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। দিল্লির শাখায় এখনো গ্যাসে রান্না চলছে, তবে ‘কম সক্ষমতায়।’ গত সপ্তাহে কয়েকটি শহরে গ্যাস বিতরণ কেন্দ্রের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে মানুষকে। কেউ কেউ রাত ৩টায় এসে সিলিন্ডার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।

সপ্তাহান্তে ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি জাহাজ ৯২ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন এলপিজি নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরুর পর থেকে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ ছিল। তবে বড় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা ঘনিয়ে আসায় আতঙ্কে মজুত করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে অ্যামাজন ইন্ডিয়ায় ইন্ডাকশন চুলার বিক্রি ৩০ গুণেরও বেশি বেড়েছে।

বেন্নে দোসার আইয়ার বলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তাঁদের আরও সৃজনশীল হতে হবে। তিনি বলেন, ‘ঢালাই লোহার তাওয়া গরম করার অন্য উপায় খুঁজছি, যেমন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি—কাঠের আগুন।’ তবে এতে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি সতর্ক। তিনি বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত দূষণ তৈরি করতে চাই না।’

সব বাধা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে তিনি আপসহীন—তাঁর প্রিয় দোসা কখনোই স্থায়ীভাবে মেনু থেকে বাদ যাবে না। তিনি বলেন, ‘এই কারণেই আমরা বেন্নে শুরু করেছি। ভালো বেন্নে দোসা পরিবেশন করার জন্য।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত