Ajker Patrika

হামের প্রাদুর্ভাব: ছোটমণি নিবাসেও হামের থাবা

  • ঢাকার শাখায় হামে প্রাণ গেছে ৩ শিশুর।
  • বাঁচার জন্য লড়ছে আরও ৩ শিশু।
  • আলাদা রাখার ব্যবস্থা ও জনবলের অভাব।
অর্চি হক, ঢাকা 
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৮: ১২
হামের প্রাদুর্ভাব: ছোটমণি নিবাসেও হামের থাবা
ফাইল ছবি

রাজধানীর আজিমপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ছোটমণি নিবাসে হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে এ পর্যন্ত তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩১ মে রাতে মারা যায় ৯ মাস বয়সী খুশবু। বর্তমানে আরও তিনটি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে দুই শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছে।

ঢাকাসহ দেশের ছয়টি বিভাগে যে ছয়টি ছোটমণি নিবাস রয়েছে, রাজধানীর আজিমপুরেরটি তার অন্যতম। এখানে আছে মোট ৩৬টি শিশু। এখানকার কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা গেছে, ৩৬ শিশু বাসিন্দার মধ্যে অন্তত ১৭ জন হামে আক্রান্ত হয়। গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে পুলিশের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া দুটি শিশুকে নিবাসে আনা হয়। এরপরই সেখানে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ছোটমণি নিবাসে মা-বাবার আদরবঞ্চিত নবজাতক থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত পরিত্যক্ত ও পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুদের লালন-পালন করা হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠান শাখা এসব নিবাস পরিচালনা করে। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালে ছোটমণি নিবাস রয়েছে। তবে শুধু ঢাকার নিবাসেই হাম ছড়িয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

সর্বশেষ মৃত্যু হওয়া খুশবুকে মাত্র দেড় মাস বয়সে আদালতের আদেশে নিবাসে আনা হয়েছিল। তার মা তাজ নাহারকে হত্যার অভিযোগে বাবা কারাগারে রয়েছেন। মা-হারা শিশুটির দেখভালের জন্য কোনো স্বজন না থাকায় তাকে ছোটমণি নিবাসে পাঠানো হয়। সেখানেই তার নাম রাখা হয়। গত ১০ মে জ্বর, কাশি ও হামের উপসর্গ দেখা দিলে খুশবুকে প্রথমে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে এবং পরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। ২১ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩১ মে রাতে তার মৃত্যু হয়।

খুশবুর আগে হাম ও হাম-পরবর্তী জটিলতায় আরও দুটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন এক বছর বয়সী আরিশা এবং অন্যজন পাঁচ মাস বয়সী মেহেদি।

ছোটমণি নিবাস ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় শিশু ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় টিকাদান বাধ্যতামূলক।

ঢাকা নিবাসের শিক্ষক লাভলী পারভীন আজকের পত্রিকাকে জানান, তাঁদের নিবাসে শিশুদের থাকার জন্য একটি এবং খেলার জন্য একটি ঘর রয়েছে শুধু। তাই নতুন কোনো শিশু এলে বা কেউ রোগাক্রান্ত হলে তাদের কোয়ারেন্টিনে (পৃথক ঘরে) রাখা সম্ভব হয় না। লাভলী পারভীন আরও বলেন, ‘গত এপ্রিলে নতুন শিশু আসার পর আমরা আলাদা কটে (ছোট আকারের খাট) রেখেছিলাম। কিন্তু অন্য শিশুরাও সেখানে এসে জড়ো হতো। তাই পুরোপুরি আলাদা রাখা সম্ভব হয়নি।’

শিশুদের এই বিশেষ নিবাসে হামে মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিশু অধিকার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার বিষয় নয়, বরং সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, সুরক্ষা ও সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ন্যাশনাল অ্যাকশন অ্যান্ড কোঅর্ডিনেশন গ্রুপের (এনএসিজি) চেয়ারপারসন এ কে এম মাসুদ আলী বলেন, ‘বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের শিশু নিবাসের ক্ষেত্রেই হামের মতো সংক্রামক রোগ বা জনস্বাস্থ্য সংকটে প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিশু নিবাসের সাম্প্রতিক হাম পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু সুরক্ষাকে বিচ্ছিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রভিত্তিক বিষয় হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করা হয়। আমাদেরও সেই ধরনের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমীর মল্লিক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘শিশু মৃত্যুর ঘটনা কখনোই কাম্য নয়। আমাদের ছয়টি নিবাসের মধ্যে কেবল ঢাকার নিবাসটিতেই হাম ছড়িয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশালের নিবাসগুলোর শিশুরা সুস্থ আছে।’

সমীর মল্লিক বলেন, জনবলসংকটের কারণে নতুন আসা শিশুদের আলাদা ঘরে রাখা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, ‘একেবারে নবজাতক শিশুরাও নিবাসে আসে। একটি বাচ্চাকে যদি কোনো কক্ষে আলাদা করে রাখা হয়, তার জন্য তিনজন কর্মী লাগে। একজন মায়ের পক্ষেও ২৪ ঘণ্টা সন্তানের দেখভাল করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। জনবলসংকটের কারণে আমরা চাইলেও নতুন আসা বা আক্রান্ত বাচ্চাদের আলাদা রাখতে পারি না। তবে যতটা সম্ভব আমরা তাদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছি।’

পরিবারের শেষ স্পর্শটুকুও পেল না খুশবু

ছোটমণি নিবাসের শিশু খুশবুকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। জন্মের মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে মাকে হারানো শিশুটি মৃত্যুর পরও পরিবারের কারও শেষ স্পর্শটুকু পায়নি। তার বাবা স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে কারাগারে এবং একমাত্র বোনও তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবারে। পরিবারের আর কাউকে না পাওয়ায় খুশবুর মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছিল। দাতব্য প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ আজকের পত্রিকাকে জানান, খুশবুকে কবরে শুইয়ে দেওয়ার সময় ছোটমণি নিবাসের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তবে পরিবারের কেউই ছিলেন না।

বাবা-মায়ের আদর বোঝার আগেই পৃথিবীকে বিদায় জানানো খুশবুর কবর হয়েছে একটি নিমগাছের নিচে। স্বজনদের কেউ কখনো কবরস্থানটিতে গেলে সেখানেই খুঁজে পাবে তার শেষ চিহ্ন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত