
হাম রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি সরকারকে টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করার কথা জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে এনডিএফের আয়োজনে হাম রোগবিষয়ক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম। কি-নোট স্পিকার ছিলেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও পেডিয়েট্রিকস কার্ডিয়াক ক্রিটিক্যাল কেয়ারের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু তালহা।
হাম রোগের ধারণা, লক্ষণ, জটিলতা, চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রতিরোধ ও উত্তরণের উপায় তুলে ধরে আবু তালহা বলেন, দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। এটি শুধু সাধারণ ফুসকুড়ির রোগ নয়; বরং একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা এতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয় বলে জানান মুহাম্মদ আবু তালহা। তিনি বলেন, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে, আক্রান্তদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও এনকেফেলাইটিসের (মস্তিষ্কের প্রদাহ) মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
হাম ছড়ানোর কারণ উল্লেখ করে মুহাম্মদ আবু তালহা বলেন, হাম ভাইরাস মূলত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির সময় নির্গত ড্রপলেট ও বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এটি দ্রুত সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি র্যাশ (চামড়ায় দানা) ওঠার তিন দিন আগে থেকে শুরু করে চার থেকে ছয় দিন পর পর্যন্ত সংক্রামক থাকে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো কক্ষ ত্যাগ করার পরও ভাইরাস প্রায় দুই ঘণ্টা বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে।
লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি, কাশি ও চোখ লাল হওয়া দেখা যায়। পরে শরীরে লালচে র্যাশ ওঠে, যা প্রথমে মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে গালের ভেতরে কোপলিক স্পট নামের ছোট সাদা বা নীল দাগও দেখা যায়।
জটিলতা ও ঝুঁকি নিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, হামের সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা হলো নিউমোনিয়া, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ ছাড়া শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, কানের সংক্রমণ, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রতি হাজারে এক থেকে তিনজন রোগীর ক্ষেত্রে এনকেফেলাইটিস হতে পারে, যা খিঁচুনি, অচেতনতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এ ছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে বলে জানান তিনি।
চিকিৎসা ও করণীয় সম্পর্কে এই চিকিৎসক আরও বলেন, হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, জ্বর নিয়ন্ত্রণে ওষুধ ও প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকাদান বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। মুহাম্মদ আবু তালহা বলেন, দেশে হাম-রুবেলা ও এমএমআর টিকার মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে টিকা নেওয়া জরুরি। তবে শিশুর ৯ মাস আগেও টিকা নিতে পারবে বলে জানানো হয়।
২০২৫-২৬ সালে দেশে হামের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে জানায় এনডিএফ। সংস্থাটি জানায়, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ছয় হাজারের বেশি শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। শিশুমৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, কোভিড-১৯-পরবর্তী পরিস্থিতি ও টিকা নিয়ে ভুল ধারণা—এসবই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান সংস্থার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসকেরা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সময়মতো টিকা গ্রহণ, আক্রান্তদের আলাদা রাখা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়াই হতে পারে এই মারাত্মক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য দেন অধ্যাপক আহমেদ মুর্তজা চৌধুরী, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক মো. খয়বর আলী, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক রাকিবুল হক খান ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমান।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত সারা দেশে ১১৮টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে হামে মারা গেছে ২০টি শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৮২টি শিশুর। একই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ জনের।
২ ঘণ্টা আগে
হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় গতকাল রোববার থেকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। প্রাথমিকভাবে যে ৩০টি উপজেলায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেখানে শিশুদের টিকা দিতে আসা অভিভাবকদের বেশ ভিড় দেখা গেছে।
২০ ঘণ্টা আগে
সারা দেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে আগামী ৩ মে থেকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আজ (রোববার) ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা জানান।
১ দিন আগে
দেশজুড়ে অতি সংক্রামক হামে আক্রান্ত সন্দেহে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে হাম প্রতিরোধে আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে জরুরি হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি।
২ দিন আগে