Ajker Patrika

স্মৃতিসৌধের জায়গাও দখল

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১২: ৫১
স্মৃতিসৌধের জায়গাও দখল

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত প্রায় পাঁচ দশক পুরোনো স্মৃতিসৌধের জায়গা দখলে নিয়েছেন স্থানীয়রা। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গোপালপুরে স্থাপিত ওই স্মৃতিসৌধের সামনের অংশ দাবি করে আসছে গত কয়েক বছরে সেখানে বসবাস করা ব্যক্তিরা। এই অজুহাতে জায়গা দখলে নিয়েছেন তাঁরা।

সম্প্রতি নানা অজুহাতে স্মৃতিসৌধের মূল স্থাপনার দুপাশে থাকা সরকারি জায়গাও তাঁরা নিজেদের দখলে নিয়েছেন। সব মিলিয়ে স্মৃতিসৌধের তিন পাশে এখন ন্যূনতম জায়গা অবশিষ্ট না থাকায় জাতীয় দিবসগুলোতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষকে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হয়।

জায়গা সংকটের কারণে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া জনসাধারণকে চরম বিড়ম্বনা আর ভোগান্তি পোহাতে হয়। মূল স্থাপনার দুপাশের সরকারি জায়গাজুড়ে সীমানা প্রাচীর ও টিনের বেড়া দিয়ে দখল করে রাখায় স্মৃতি সৌধটি এখন বদ্ধ স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। জনসমাগম এড়াতে বিশেষ দিবসসমূহে স্বল্প পরিসরে প্রতিনিধির মাধ্যমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে হয়।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট রাতে গোপালপুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর গোলার আঘাতে সুবেদার ইলিয়াস খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল কাদেরসহ সাত বীর যোদ্ধা ঘটনাস্থলে শহীদ হন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মেহেরুল্লাহ গাইন স্থানীয়দের সহায়তায় শহীদ সহযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনাস্থলে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন। ১৯৭২ সালে তৎকালীন এমসিএ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফজলুল হক স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন। তবে কালের আবর্তে ঐতিহাসিক সেই স্মৃতিসৌধ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ২০১২ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দৌলতুজ্জামান খান জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে তা পুনর্নির্মাণ করেন।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, স্মৃতিসৌধের পশ্চিম পাশের সুরক্ষা দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত করে এক ব্যক্তি সীমানা প্রাচীর তুলেছেন। সেখানে থাকা সরকারি জমি ঘিরে নির্মিত তাঁর ওই প্রাচীরের মধ্যে নানান প্রজাতির গাছ লাগিয়ে তিনি তা দখল করে রেখেছে। স্মৃতিসৌধের সুরক্ষা দেয়ালের গাঘেঁষে গড়ে তোলা প্রাচীরের কারণে সেখানে কোনো দর্শনার্থীর দাঁড়ানোর সুযোগ নেই।

একই অবস্থা স্মৃতিসৌধের পূর্ব পাশে। সেখানে স্মৃতিসৌধের সুরক্ষা দেয়াল পর্যন্ত টিনের বেড়া তৈরি করা হয়েছে। নিজ জমিতে একতলা পাকা ভবন নির্মাণের পর স্মৃতিসৌধের জায়গাজুড়ে টিনের বেড়া তৈরির কারণে সেখানেও দাঁড়ানোর সুযোগ নেই।

জরিপকারক দিয়ে সীমানা নির্ধারণের পর স্মৃতিসৌধের জায়গা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁরা জানান মাঝেমধ্যে প্রশাসনের তরফে স্মৃতিসৌধের দুপাশের জায়গা দখলমুক্ত করা হলেও পরক্ষণেই তা আবার বেদখল হয়ে যায়।

শ্যামনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এর আগে মাপজোক করে স্মৃতিসৌধের জায়গা নির্ধারণ করা হয়। তবে কয়েক বছরের মধ্যে তা দখল হয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ইতিহাসের সাক্ষী এই গোপালপুর স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের সাবেক কমান্ডার দেবী রঞ্জন মন্ডল জানান, ‘গোপালপুর স্মৃতিসৌধের জায়গা নিয়ে দখলদারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বারবার বিবাদে জড়াতে হচ্ছে। সরকারি জায়গা উন্মুক্তের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কয়েক শতাংশ জায়গা অধিগ্রহণ করলে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া মানুষের দুর্ভোগ কমবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আ ন ম আবুজর গিফারী বলেন, ‘স্মৃতিসৌধ বা সরকারি জায়গা কারও দখল করে রাখার অধিকার নেই। বিষয়টি ইতঃপূর্বে আমাকে জানানো হয়নি। অতিসত্বর স্মৃতিসৌধের জায়গা উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

সাত শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতি স্মরণে ১৯৭২ সালে তৎকালীন এমসিএ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফজলুল হক স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করেন। সেই স্মৃতিসৌধ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে ২০১২ সালে তৎকালীন ইউএনও মো. দৌলতুজ্জামান খান জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে তা পুনর্নির্মাণ করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত