Ajker Patrika

মন বসছে না পড়ার টেবিলে? জেনে নাও কারণ

পল্লব শাহরিয়ার
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২: ১১
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

পড়ার টেবিলে বসে আছে রাফি। ১০ মিনিট পর দেখা যায় সে বই রেখে মোবাইলে স্ক্রল করছে। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে। আসলে তার পড়ায় মন বসছে না। ‘পড়তে মন চাইছে না’—এ কথাটি আজকাল শিক্ষার্থীদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘মন চাইছে না’ কি আসলে মস্তিষ্কের কাজ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?

চলুন জেনে নেওয়া যাক, পড়ার সময়ে অলস লাগলে বা পড়ায় মন না বসার কারণ নিয়ে—

গবেষকেরা বলছেন, অলসতা অনেকটাই মস্তিষ্কের নিউরোকেমিক্যাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়, কাজ শুরু করে এবং শেষ করে—এই তিনটি প্রক্রিয়া মোটিভেশন বা অনুপ্রেরণা সিস্টেম মেনে। এর মূল তিনটি অংশ হলো—

  • প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: পরিকল্পনা ও লক্ষ্য স্থির করে।
  • বেসাল গ্যাংলিয়া: কাজ শুরু করার ‘স্টার্ট বাটন’।
  • ডোপামিন নেটওয়ার্ক: চালিকাশক্তির মতো কাজ করে।

যখন এ সিস্টেমের সমন্বয় হারায়, তখন শিক্ষার্থী নিজেকে অলস মনে করতে শুরু করে। বই পড়তে বসলেও মন বসে না, কাজ জমা দেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত দেরি হয়, সহজ কাজও ভারী মনে হয়। এটি কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়; বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

কেন মস্তিষ্ক কাজ শুরু করতে চায় না?

নিউরোসায়েন্স অনুযায়ী, মস্তিষ্ক প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনা করে—১. কাজটি করতে কতটা মানসিক শক্তি লাগবে এবং ২. কাজটি করলে কী ধরনের ফল বা আনন্দ পাওয়া যাবে। যখন ফলাফলের মান কম মনে হয়, মস্তিষ্ক কাজ এড়িয়ে যেতে ‘সেফ মোডে’ চলে যায়। শিক্ষার্থীরা তাই বলে, ‘আজ কেমন যেন লাগছে, পরে করি।’

প্রতিটি অংশের ভূমিকা

  • বেসাল গ্যাংলিয়া: মস্তিষ্কের স্টার্ট বাটন। এটি ধীর হলে কাজ শুরু করতে অনীহা হয়।
  • ডোপামিন: রাসায়নিক যা মস্তিষ্ককে আগ্রহী করে। কম ডোপামিন থাকলে কাজ শুরুতে অনীহা, সবকিছু নীরস মনে হয়। সামাজিক মিডিয়া, গেম বা শর্ট ভিডিও দ্রুত ডোপামিন বাড়ায়, পড়াশোনা তুলনামূলকভাবে কম আকর্ষণীয় লাগে।
  • প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স: মস্তিষ্কের ম্যানেজার। এটি পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখে। পরীক্ষার চাপ, কম ঘুম, স্ট্রেস—সবই এটি দুর্বল করে। ফলে কঠিন কাজ আরও কঠিন মনে হয়, মনোযোগ ভেঙে যায়।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে অলসতা বাড়ার কারণ

শুধু মস্তিষ্ক নয়, পরিবেশ ও আধুনিক জীবনের চাপও গুরুত্বপূর্ণ। আজকের শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় বেশি তথ্য, প্রতিযোগিতা এবং বিভ্রান্তির মধ্যে বড় হচ্ছে। অতিরিক্ত ক্লাস, কোচিং ও পরীক্ষার চাপ, ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের মোটিভেশন সিস্টেমকে ক্লান্ত করে। মনস্তাত্ত্বিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যর্থতার ভয়—কাজ ভুল হতে পারে এ ধারণা— শুরু করার আগে থামিয়ে দেয়। নিখুঁত হওয়ার প্রবণতাও বাধা। লক্ষ্য যদি অস্পষ্ট বা খুব বড় হয়, যেমন ‘পুরো সিলেবাস শেষ করতে হবে,’ মস্তিষ্ক কাজটিকে চাপ হিসেবে দেখে। কম আত্মবিশ্বাস, ‘আমি পারব না’—ধারণাও অলসতা বাড়ায়।

কীভাবে এই সেফ মোড নিয়ন্ত্রণে আনা যায়

শিক্ষার্থীরা কিছু কৌশল মেনে মোটিভেশন সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—

  • কাজকে ছোট অংশে ভাগ করা: একসঙ্গে বড় অধ্যায় বা প্রকল্প দেখা মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত চাপ দেয়। প্রতিদিন ১৫-২০ মিনিট করে ছোট অংশ পড়া বা নোট তৈরি করা কার্যকর। ছোট কাজ মস্তিষ্ককে ডোপামিন দেয়, আগ্রহ বাড়ায়।
  • টু ডু লিস্ট ও সংকেত ব্যবহার: অ্যালার্ম, স্টিক নোট বা ওয়াল ক্যালেন্ডার স্মরণ করিয়ে দেয়, কাজ কখন শুরু করতে হবে।
  • পোমোডোরো পদ্ধতি: ২৫ মিনিট পড়া এবং ৫ মিনিট বিরতি মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ২ মিনিট রুলও কার্যকর—কোনো কাজ ২ মিনিট করে শুরু করলে মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে বাকিটা করে।
  • ঘুম, ব্যায়াম ও সুষম খাবার: পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ককে শক্তি দেয়, ব্যায়াম ডোপামিন ও এন্ডোরফিন বাড়ায়।
  • স্ক্রিন ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ভিডিও বা গেম দ্রুত ডোপামিন দেয়, পড়াশোনাকে তুলনায় কম আকর্ষণীয় বানায়। নির্দিষ্ট সময় ফোন বন্ধ বা স্ক্রিন ব্রেক মস্তিষ্ককে স্বাভাবিক মোটিভেশন মোডে আনে।
  • নিজকে দোষারোপ করা বন্ধ করা: ‘আমি অলস’ বলার বদলে বলুন, ‘আমার মোটিভেশন সিস্টেম শক্ত করতে হবে।’ নেতিবাচক চিন্তা কমে যায়, উদ্যম বাড়ে।

অলসতা কোনো চরিত্রগত দুর্বলতা নয়; এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, ক্লান্তি, চাপ, ডোপামিনের ওঠানামা এবং পরিবেশগত প্রভাবের ফল। পরিবর্তনের পথ হলো মস্তিষ্ককে বোঝা এবং তার কাজের ধরন অনুযায়ী কৌশল তৈরি করা। ছোট পদক্ষেপে এগোলে ধীরে ধীরে ‘আমি পারব না’ বা ‘এখন নয়’ ধরনের প্রতিক্রিয়া কমে আসে, আর উদ্যম ফিরে আসে। সত্যিকারের শক্তি আমাদের ভেতরেই আছে—শুধু মস্তিষ্ককে তার নিজস্ব ছন্দে একটু পথ দেখাতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

চট্টগ্রাম রেলওয়ে: ল্যান্ডক্রুজারে অফিসে যান দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী

বাসে ডাকাতি, ধর্ষণ: ঢাকা-টাঙ্গাইল যেন আতঙ্কের মহাসড়ক

আজকের রাশিফল: সততা বিপদ থেকে বাঁচাবে, প্রেমে পড়ার আগে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করুন

ত্বকে দ্রুত বয়সের ছাপ ফেলে যে ৫ অভ্যাস

পটুয়াখালী-২ আসন: মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত উত্তেজনা বাড়ছে বাউফলে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত