Ajker Patrika

দেশে জ্বালানি তেল আছে কতটুকু, চলবে কয়দিন

বিবিসি বাংলা
আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ১৫
দেশে জ্বালানি তেল আছে কতটুকু, চলবে কয়দিন
ছবি: সংগৃহীত

‘প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়াইছি এক পাম্পের সামনে, পরে বলে তেল নাই। পরে আরেকটা পাম্পে আইসা অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া ২০০ টাকার তেল দিছে।’ দেশে সৃষ্ট জ্বালানি পরিস্থিতির কথা এভাবেই তুলে ধরলেন ভুক্তভোগী ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা মোটরসাইকেলচালক আনিসুর রহমান।

এই মুহূর্তে দেশে কতটুকু জ্বালানি তেল আছে এবং তা দিয়ে কত দিন চলবে এমন প্রশ্ন সবার মনে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর থেকে দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা জন্ম নিয়েছে। এ থেকে জ্বালানি নিয়ে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা।

যদি সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবুও ‘তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে’ এমন শঙ্কা থেকে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের লাইন। এ অবস্থায় গ্রাহক-বিক্রেতা বাগ্‌বিতণ্ডা কিংবা সংঘাতের অভিযোগ যেমন আসছে, তেমনি অবৈধ মজুত ঠেকাতে চালানো হচ্ছে অভিযানও।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বলছে, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণই বেশি। এ ছাড়া অল্প পরিমাণ অকটেন আমদানি করা হলেও চাহিদার বড় অংশ দেশেই উৎপাদন হয়।

তবে বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ আমদানির ওপরই নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বড় ভরসা। এ ছাড়া ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও বাংলাদেশে ডিজেল আমদানি করা হয়।

বাংলাদেশের রিজার্ভ সক্ষমতা অনুযায়ী, বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদার পুরোটা একসঙ্গে মজুত করার সুযোগ নেই। মূলত চাহিদার নিরিখে নিয়মিতভাবে চালান আসে, ব্যবহার হয়—এভাবে চক্রাকারে চলতে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক সংকট শুরুর শঙ্কায় মার্চ মাস থেকে জ্বালানি তেল ব্যবহারে রেশনিং (সাশ্রয়ী ব্যবহার) শুরু করে বাংলাদেশ। মূলত আগের বছরের মাসভিত্তিক চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে এই মুহূর্তে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই হিসেবে মার্চের মতো এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেলের সংকট হবে না বলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

দেশে কতটুকু জ্বালানি তেল আছে

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন। এ ছাড়া ৭ হাজার ৯৪০ টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ টন পেট্রল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ টন জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজেলের গড় নিয়মিত চাহিদা ১২ হাজার টনের মতো। অর্থাৎ মজুত থাকা ডিজেলে প্রায় ১১ দিনের মতো চলবে।

তার মানে এই নয় যে জ্বালানি তেলের মজুত ফুরিয়ে শূন্য হয়ে যাবে। এই সময়ে নতুন করে আমদানি করা জ্বালানি তেলের চালান দেশে পৌঁছালে আবারও এই মজুত বাড়বে।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার টন এবং মার্চ মাসে ভারত থেকে ২২ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে।

এ ছাড়া অকটেন পেট্রলের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া। প্রতিদিনের ব্যবহারের পাশাপাশি স্টকে নতুন করে তেল যুক্তও হচ্ছে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এই মুহূর্তে মাসভিত্তিক চাহিদা পূরণেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গত বছরের এপ্রিলে দেশে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়েছিল এই বছরের এপ্রিলেও একই পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করে মুখপাত্র বলেন, ডিজেলে কোনো সংকট নেই, বরং পাচারের শঙ্কা থাকতে পারে, যা সরকার বিবেচনায় রেখেছে। সীমান্তে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রসঙ্গে মনির হোসেন চৌধুরী বলছেন, মজুতের চেষ্টা থাকায় এই মুহূর্তে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করা কঠিন হচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা উচিত।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা না থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম। তিনি বলেন, ‘স্টোরেজ বা সংরক্ষণ সক্ষমতা কম হওয়ায় আমরা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ দিনের বেশি তেল মজুত করে রাখতে পারি না।’

কৌশলগত মজুতের সক্ষমতা না থাকা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ বলেও মনে করেন তিনি।

অধ্যাপক ম. তামিম আরও বলেন, ‘সব সময়ই মজুত ওঠানামা করে। সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার সঙ্গেও জুন মাস পর্যন্ত আমাদের জ্বালানি চুক্তি আছে, কিন্তু তাদেরও অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেই। ফলে তারা যে পরিশোধিত তেল দেয় সেটাও ধারাবাহিক থাকবে না।’

জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা যে কারণে

সংকটের আশঙ্কা জাগতেই গ্রাহক-বিক্রেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও বেড়ে গিয়েছে। গ্রাহকেরা অভিযোগ করছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না তেল।

অন্যদিকে পেট্রলপাম্প মালিকেরা নিরাপত্তা চেয়েছেন সরকারের কাছে। তাঁদের দাবি, কোনো অনিয়ম না করেই অনেক সময় গ্রাহকদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন তাঁরা।

গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আদেশ, নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। এ ছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে রাতের বেলা পেট্রল এবং অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে তারা।

এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগে কয়েকটি পেট্রলপাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে প্রশাসন। সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্বস্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পেট্রলপাম্পগুলোর সামনে প্রতিদিনই যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে।

তবে সরকার দাবি করছে, জ্বালানি তেলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, মার্চের মতো এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেল সংকটের কোনো শঙ্কা নেই।

সংকট না থাকলে পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইন হওয়া এবং অপেক্ষার পরও পেট্রল না পাওয়া প্রসঙ্গে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘এই দীর্ঘ লাইন মনস্তাত্ত্বিক। আমরা কোনো সংকট দেখছি না।’

সরকার যা বলছে

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের কথা বলছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মজুত এবং এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় দেশের পেট্রলপাম্পগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১১৬ জন, ঢাকার ১৩ জেলায় ৪৭৯, চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ৩৩০, রাজশাহীর আট জেলায় ৩৪০ ও খুলনার ১০ জেলায় ৩০১ জন কর্মকর্তা ট্যাগ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বাকি বিভাগগুলোতেও একইভাবে সরকারিভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এই কর্মকর্তারা কাজ করবে এবং এ-সংক্রান্ত নিয়মিত তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন।

এ ছাড়া জ্বালানি তেল মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র। তিনি বলেন, ৩০ মার্চ এক দিনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সারা দেশে ৩৯১টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা করা হয়েছে, প্রায় ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ৬৮ হাজার লিটার ডিজেল, সাড়ে ছয় হাজার লিটার অকটেন এবং প্রায় ১৪ হাজার লিটার পেট্রল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সাধারণত দুভাবে কেনা হয়। উৎস দেশের সঙ্গে সরকারিভাবে চুক্তির মাধ্যমে অথবা ওপেন টেন্ডারে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে।

জ্বালানিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তির মেয়াদ এখনো রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করছি জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রাথমিকেও চালু হচ্ছে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস

বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি: ইরানি রাষ্ট্রদূত

২০২৬ সালের ঈদুল আজহা কবে, যা জানা গেল

কিশোরগঞ্জে যুবদল নেতার হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

‘ওকে লাথি মেরে বের করে দিন’—নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে বললেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত