Ajker Patrika

বাজেটে প্রস্তাব: বিনিয়োগের আবেদনে দপ্তরের সময়ক্ষেপণে লাগাম আসছে

  • সময়মতো আবেদন নিষ্পত্তি না হলে সম্মতি ধরা হবে।
  • আবেদনের পর পুরো প্রক্রিয়া শেষ ৭ দিনে।
  • দুই দিনেই কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থা।
শাহ আলম খান, ঢাকা 
বাজেটে প্রস্তাব: বিনিয়োগের আবেদনে দপ্তরের সময়ক্ষেপণে লাগাম আসছে

নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বড় অভিযোগ অনুমোদন পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার। অভিযোগ রয়েছে, আবেদনের ফাইল কখনো কয়েক সপ্তাহ, আবার কখনো কয়েক মাস আটকে থাকে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা দপ্তরের মতামত দিতে এই সময়ক্ষেপণে উদ্যোক্তা হতাশ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের এই অবস্থা বদলে দিতে বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, কোনো অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা মতামত, অনাপত্তি, ছাড়পত্র বা নাদাবি সনদ না দিলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করে আবেদন নিষ্পত্তি করা হবে। অর্থাৎ সরকারি দপ্তরের নীরবতায় আর বিনিয়োগ আটকে থাকবে না।

বাজেটে ঘোষিত পদক্ষেপ অনুযায়ী, ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে অনলাইনভিত্তিক সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে। আবেদন দাখিল থেকে লাইসেন্স দেওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৈদেশিক বাণিজ্যে সময় ও ব্যয় কমাতে নির্ভরযোগ্য আমদানিকারক ও কম ঝুঁকির পণ্যের ক্ষেত্রে ঋণপত্রের (এলসি) বাধ্যতামূলক ব্যবহারও ধাপে ধাপে শিথিল করা হবে।

অনানুষ্ঠানিক খাতের ছোট উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনার জন্য তাঁদের প্রযোজ্য লাইসেন্স গ্রহণ, নবায়ন ও নিয়মিত প্রতিপালনের শর্তও সহজ করতে যাচ্ছে সরকার।

দেশে ব্যবসা শুরু করতে যে জটিলতা রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সূচকেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ডুয়িং ‍বিজনেস ইনডেক্সে ১০০ স্কোরের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছিল ৪৫। তখন ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। ব্যবসা শুরু করার সূচকে দেশের অবস্থান ছিল ১৩১তম।

বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২২-২০২৩ জরিপের তথ্য বলছে, ব্যবসায়ীদের ব্যাংকঋণ পাওয়া জটিল আকার ধারণ করেছে। কর ও ভ্যাট পরিশোধে হয়রানি আগের চেয়ে বেড়েছে। আবার কারখানা বা ব্যবসার জন্য জমি পাওয়াটাও আগের চেয়ে কঠিন হয়েছে।

সরকারের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এসব অসুবিধা, সময় ও প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো প্রশাসনিক বিলম্ব। তিনি বলেন, করছাড় বা প্রণোদনার চেয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন উদ্যোক্তা জানতে চান, তাঁর আবেদন কত দিনে নিষ্পত্তি হবে। সরকার যদি ঘোষিত সময়সীমা বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।

ব্যবসায়ীদের এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সরকারের নতুন অবস্থানের মিল রয়েছে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, অনুমোদনপ্রক্রিয়া কোনো কর্মকর্তা বা দপ্তরের কারণে অযৌক্তিকভাবে আটকে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এমনকি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে শাস্তি কিংবা চাকরি হারানোর ঝুঁকিও থাকতে পারে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।

এদিকে শুধু দেশীয় নয়, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্যও প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের ওয়ার্ক পারমিট মাত্র সাত দিনের মধ্যে এবং বিনিয়োগকারী ও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা ১০ দিনের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা ছাড়পত্রের আবেদন ও যাচাইও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনলাইনে সম্পন্ন হবে।

এ প্রসঙ্গে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতা সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত করহার দেখার আগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়ন করেন। একটি অনুমোদন পেতে কত দিন লাগবে, সেটি নিশ্চিতভাবে জানা গেলে বিনিয়োগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনি সুরক্ষা। আস্থা বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেন সহজীকরণ, ব্যাংকিং সেবাও দ্রুততর করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সম্প্রসারণ এবং দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি হালনাগাদ ও বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এতে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। সেখানে এক কোটি টাকা পর্যন্ত কোনো মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেখাতে হবে না। একই সঙ্গে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তির মূল্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই পাঠানো যাবে। বৈধভাবে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে পাওয়া মুনাফা এবং অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির টাকা ফেরত পাঠানো বা পুনরায় বিনিয়োগের প্রক্রিয়া এখন এক কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি নির্বাচিত শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ সুবিধা চালু করা হবে, যাতে প্রস্তুত অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদন শুরু করা যায়।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার এই পরিবর্তন শুধু বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি কমাবে না, বরং নতুন শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও বাড়াবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জট কাটিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগের আলোচনায় আমরা সাধারণত অবকাঠামো, জ্বালানি বা করব্যবস্থার কথা বলি। কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা ও সময়মতো সেবা প্রদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেওয়ার সংস্কৃতি চালু হলে তা বিনিয়োগ ব্যয় কমাবে এবং ব্যবসা সহজীকরণে বাস্তব পরিবর্তন আনবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত