Ajker Patrika

শ্রমবাজারে প্রাধান্য কম মজুরির রোহিঙ্গাদের

  • দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল স্থানীয়রা বেকার হয়ে পড়ছেন।
  • মিয়ানমার ও কক্সবাজার ক্যাম্প থেকে ঢুকে পড়ছে রোহিঙ্গারা।
  • কম মজুরিতে রোহিঙ্গা শ্রমিক নিতে আগ্রহী স্থানীয় মালিকেরা
বান্দরবান প্রতিনিধি
শ্রমবাজারে প্রাধান্য কম মজুরির রোহিঙ্গাদের
গত ৫ মে কাজের সন্ধানে বান্দরবান শহরে অনুুপ্রবেশের সময় রেইছা চেকপোস্টে আটক করা হয় ২১ রোহিঙ্গাকে। ফাইল ছবি

পুলিশ ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গারা বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করে কম মজুরিতে শ্রমিকের কাজ করছে। এর ফলে স্থানীয় বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শ্রমিকেরা বেকার হয়ে পড়ছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, স্থানীয়দের সঙ্গে চেহারা ও ভাষাগত তেমন পার্থক্য না থাকায় কাজের সন্ধানে সহজে সীমান্ত পেরিয়ে বান্দরবানে চলে আসছে রোহিঙ্গারা। অনেকে কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে বান্দরবানে চলে আসছে। আর স্থানীয় মালিক ও ঠিকাদাররা কমদামে রোহিঙ্গা শ্রমিকদের নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কাজের জন্য। রোহিঙ্গাদের কারণে দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয়ের উৎস সংকুচিত হচ্ছে। অনেক রোহিঙ্গা আবার ক্যাম্প ছেড়ে এসে এখন জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকার বাগানে বসবাস করছে। এতে শুধু শ্রমবাজার দখল নয়, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও তারা জড়িয়ে পড়ছে।

বেশির ভাগ রোহিঙ্গা নির্মাণকাজ, কৃষিখেত, ইটভাটা, পাথর উত্তোলন, মাটি কাটা, অটোরিকশা, খাবারের হোটেল, আবাসিক হোটেল, গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ, কাঠ কাটা ও বহন, আমবাগান, রাবারবাগান, তামাকখেত, মৎস্য প্রজেক্টে শ্রমিকের কাজ করছে। তা ছাড়া, বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজও দখল করে নিচ্ছে রোহিঙ্গারা।

বান্দরবানের সুয়ালক এলাকায় কর্মরত ভাসমান শ্রমিক রোহিঙ্গা হোসেন আলী বলেন, ‘আমরা যেকোনো ভারি কাজ করে থাকি, যা এখানকার বাঙালিরা পারে না। আমরা বেতনও কম নিয়ে থাকি।’

সরেজমিনে সদরের রেইছা এলাকায় দেখা যায়, রেইছা বাজার, ভান্ডারিপাড়া ও গোয়ালিয়া খোলা এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে রোহিঙ্গারা পাহাড়ের গাছ কাটছে। রোহিঙ্গা শ্রমিক দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের গাছ কাটার জন্য মাঝি নিয়ে এসেছে। আমরা কাজ করে চলে যাই। অনেকে এখানের বিভিন্ন পাহাড়ে বাস করেন।’

গোয়ালিয়া খোলা এলাকার স্থানীয় শ্রমিক মো. কামাল জানান, রোহিঙ্গারা কাজ করার ফলে স্থানীয়রা সপ্তাহে তিন দিন কাজ পেলে অন্য চার দিনই কাজ পান না।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের বাসিন্দা রুপলা ধর জানান, ঘুমধুমে স্থানীয় কোনো শ্রমিক পাওয়া যায় না। মূলত রোহিঙ্গা শ্রমিকরাই কম বেতনে কাজ করে। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার রাবার বাগানে কর্মরত স্থানীয় শ্রমিক সাইদ হোসেন বলেন, স্থানীয়দের দৈনিক কাজের মজুরি কমপক্ষে ৭০০-৮০০ টাকা, অন্যদিকে রোহিঙ্গারা সেই কাজ ৪০০-৫০০ টাকায় করে। তাই স্থানীয়রা কাজ হারাচ্ছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির ১১ বিজিবির ব্যাটালিয়ন সীমান্ত ৭১ কিলোমিটার ও জোনের অধীনে ৯৪ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই জোনের অধীনে নিকুছড়ি থেকে তীরের ডিব্বা পর্যন্ত বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) রয়েছে ১৪টি। আর বান্দরবানের ঘুমধুম থেকে মনজয়পাড়া পর্যন্ত বিওপি রয়েছে ৮টি। এরপর সীমান্ত পিলার ৫৫ থেকে আলীকদম ৬৮ নম্বর পোয়ামুহুরী পর্যন্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন (অরক্ষিত) রয়েছে, ফলে নাইক্ষ্যংছড়ির আশারতলী, ফুলতলী, লেমুছড়ি, চাকঢালা, ঘুমধুম সীমান্ত; অন্যদিকে আলীকদমের করুকপাতা ও পোয়ামুহুরির বিভিন্ন ঝিরি দিয়ে মিয়ানমাব থেকে এই দেশে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করে। এ ছাড়া কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবির ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা পালিয়ে বান্দরবানে কাজের সন্ধানে আসছে। আগে কাজের সন্ধানে জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা ও আলীকদমে রোহিঙ্গারা বেশি অবস্থান করলেও এখন তারা কাজের সন্ধানে বান্দরবান শহর হয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচিতে প্রবেশ করছে।

এ বিষয়ে বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওয়াহাবুল ইসলাম খন্দকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গাদের আটক করছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। আপনাদের (সাংবাদিক) কাছে তথ্য থাকলেও আমাদের জানাবেন।’

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিশেষ প্রতিনিধি নীলিমা আক্তার নীলা বলেন, দেশে এমনিতেই কর্মসংস্থান কম। যেভাবে রোহিঙ্গারা কর্মসংস্থান দখল করছে, তাতে বান্দরবানের মানুষ কর্ম হারাচ্ছে। এই বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত