
এটি মূলত অর্থের গল্প। একই সঙ্গে বিয়ের উৎসবের গল্প। তবে সব ছাপিয়ে এটি আসলে কোটি কোটি টাকার এক বিশাল লেনদেনের গল্প, যা ভারতের বিয়ে উৎসবগুলোর জমকালো আলোর পেছনে সযত্নে লুকিয়ে রাখা হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ভারতের বিয়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পের (ওয়েডিং ইন্ডাস্ট্রি) বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১০ লাখ কোটি রুপি। শুধু নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মাত্র ৪৫ দিনের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের মৌসুমেই এই খাতে ব্যবসা হয়েছে ৫ দশমিক ৯ লাখ কোটি রুপি, যা এর আগের বছর ছিল ৪ দশমিক ৭ লাখ কোটি রুপি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সাল নাগাদ এই ‘শিল্প’র আকার ১৪ লাখ কোটি রুপি ছাড়িয়ে যাবে।
ধনকুবেরদের জন্য এই আয়োজনের অর্থ হলো কনে সাজানো, হিরার গয়না, পাঁচ তারকা ভেন্যু, বিদেশি শেফের তৈরি মেন্যু আর রাজকীয় আতিথেয়তায় লাখ লাখ টাকা ওড়ানো। কিন্তু এই অর্থনৈতিক সিঁড়ির নিচের দিকে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য এই খরচগুলো শুধু আকাশচুম্বীই নয়, বরং তাদের আয়ের তুলনায় তা এক বড় ধরনের মরণফাঁদ।
বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভারতের একটি গড় মধ্যবিত্ত পরিবারকে প্রতিটি বিয়ের খরচ মেটাতে গড়ে প্রায় ১৫ দশমিক ৫ লাখ রুপি ঋণ নিতে হয়েছে। কিন্তু জাঁকজমকের এই আড়ালে আসল যে সত্যটি ঢাকা পড়ে থাকে, তা হলো—বরের জন্য পাঠানো সোনাদানা, নতুন সংসার পাতার দোহাই দিয়ে পাঠানো দামি সব গৃহস্থালি পণ্য, বিলাসবহুল গাড়ি এবং সুটকেস ভর্তি নগদ টাকা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রে এই আদান-প্রদান আরও প্রকাশ্য। যেমন—ইনফ্লুয়েন্সার অরুণ পানওয়ার তাঁর বিয়েতে নগদ ৭১ লাখ রুপি এবং প্রায় ২৯ লাখ রুপির সোনা উপহার পেয়েছেন। আরেক ইনফ্লুয়েন্সার মানসীর পরিবার বরপক্ষকে নগদ ৭ লাখ রুপি দিয়েছে। রাজস্থানের এক বিয়েতে বরকে দেওয়া উপহারের মূল্য দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ১৫ কোটি রুপি।
আইন এড়াতে এই বিপুল লেনদেনকে ‘বিয়ের উপহার’ বা ‘সম্মানসূচক নজরানা’ হিসেবে প্রচার করা হলেও, সমাজকর্মী ও আইনজীবীদের কাছে এর একটাই নাম—যৌতুক।
চলতি বছরের শুরুতে বিয়ে হওয়া এক তরুণীর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। উত্তর ভারতের একটি শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের এই সদস্য বলেন, ‘বিষয়টি খুব সহজ—আমাদের ধরে নিতে হয়েছিল যে পুরো খরচের ভার আমাদেরই। বরের পরিবার ৮০ জন অতিথি নিয়ে এসেছিল এবং প্রত্যেকের জন্য আলাদা খামে “মিলনি” (নগদ টাকা) চেয়েছিল। শুধু এই বাবদ খরচই ছিল প্রায় ১ লাখ রুপি।’
তিনি জানান, বরপক্ষের কাছ থেকে সরাসরি কোনো যৌতুকের দাবি ছিল না। তবে কনেপক্ষ নিজেদের মতো করেই ‘উপহার’ দিয়েছে। ‘এর মধ্যে ঘরের আসবাবপত্র, ফ্রিজ-টিভি এবং কাপড়চোপড় ছিল। যেহেতু দুটি মানুষ নতুন জীবন শুরু করছে, তাই আমরা এগুলো দিয়েছি। বরের এগুলো কেনার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে সানন্দেই তা গ্রহণ করেছে,’ বলেন তিনি।
তবে এই উপহার গ্রহণ মোটেও একতরফা ছিল না। বিয়ের আলোচনার সময় বরপক্ষের মধ্যস্থতাকারী কনেপক্ষকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনারা উপহার হিসেবে কী কী দিচ্ছেন বলুন, যাতে আমরা নিজেদের জন্য একই জিনিস আবার কিনে না ফেলি!’
বিয়ের এই জাঁকজমকের পেছনে লুকিয়ে থাকা হিংস্র রূপটি আবারও সামনে আসে গত মে মাসে। ভোপালের বাসিন্দা তিশা শর্মাকে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অভিযোগ ওঠে, বাপের বাড়ি থেকে পর্যাপ্ত ‘উপহার’ বা যৌতুক দিতে না পারার কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, ভারী কোনো বস্তু দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করা হয়েছিল।
তিশার মৃত্যু এবং এর পরবর্তী দিনগুলোতে অন্য তরুণীদের মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, ঐতিহ্য ও রীতির মোড়কে কনেকে এখনো এক ধরনের ‘পণ্য’ হিসেবে দেখা হয়। আর সেই কনেকে নিজের ঘরে তুলে নেওয়ার জন্য বরকে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করা হয়।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে হওয়া এক নারী তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন কীভাবে বিয়ের সময় দাবির ধরনগুলো বদলে যায়। তিনি বলেন, শুরুতে তারা (শ্বশুরবাড়ি) কোনো দাবি করেনি। কিন্তু পরে তারা বলতে শুরু করল—‘আমাদের বড় বউয়ের পরিবার তো এই জিনিসগুলো দিয়েছিল, তাই ছোট বউয়ের পরিবার থেকেও এমনটাই আশা করি।’ বিয়ের পর তারা আমাকে কখনো সরাসরি খোঁচা দেয়নি এবং যৌতুক হিসেবে দেওয়া নগদ টাকা দিয়ে আমার জন্যই গয়না বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের নিজেদের বিয়ের খরচের পুরোটাই তারা আমাদের থেকে নিয়ে মিটিয়েছে। আমার বাবার চিকিৎসার বড় খরচ ছিল, তার ওপর এই চাপ আমার খুব গায়ে লাগত। কিন্তু বিষয়টি সমাজে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমাদের মুখ বুজে মেনে নিতে হয়েছে।
এই নারীর এখন এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন বুঝি এটা কতটা ভুল ছিল। আমার ছেলের বিয়ের সময় আমরা কিছুই নেব না। কিন্তু আমার মেয়ের ক্ষেত্রে কী করব, আমি জানি না। যদি বরের পরিবার কিছু দাবি করে, হয়তো মেয়ের ভালো চেয়ে আমি তা দিয়ে দেব। তবে ভেতর থেকে আমি কখনোই এটা মেনে নিতে পারব না।’
সমাজবিজ্ঞানী অম্বিকা চোপড়া এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘দায়মুক্তির অর্থনীতি’ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘নারীদের এখনো সমাজে এমন এক সত্তা হিসেবে দেখা হয় যাদের ‘দেখাশোনা’ করার দায়িত্ব অন্যের। ফলে কনেপক্ষ বরকে সেই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এক ধরনের মূল্য পরিশোধ করে। উচ্চ-মধ্যবিত্তদের মধ্যে এখন সরাসরি যৌতুক চাওয়ার হার কমলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘উপহারের প্রদর্শনী’র মাধ্যমে এটি নতুন রূপ পেয়েছে। আর নিম্নবিত্তদের মধ্যে যৌতুক এখনো আদি রূপেই টিকে আছে।
তিনি আরও বলেন, যতদিন সমাজে কনেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে দেখা না হবে, ততদিন এই লেনদেন বন্ধ হবে না।
সমাজবিজ্ঞানী ও আন্দোলনকারী রঞ্জনা কুমারী মনে করেন, ক্ষমতার ভারসাম্য বরের পক্ষে থাকার কারণেই এই প্রথা টিকে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বরের হাতেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তাই সে যৌতুক বা দামি উপহারের দাবি সহজেই চাপিয়ে দিতে পারে।’
আইনি সহায়তা কেন্দ্র ‘মজলিশ’-এর পরিচালক অড্রে ডি’মেলো এই বিষয়টিকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজ যৌতুক প্রথার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। যখন আমার ছেলে হয়, আমি যৌতুক প্রত্যাশা করি। আর যখন মেয়ে হয়, তখন যৌতুক দিতে প্রস্তুত থাকি। পড়াশোনা বা শিক্ষার হার বাড়লেও এটি বন্ধ হচ্ছে না। বর যখন আইএএস বা কোনো বড় পেশাদার ডিগ্রি অর্জন করে, তখন তার একটি অলিখিত “রেট কার্ড” তৈরি হয়। অন্যদিকে, মেয়ের যদি কোনো “ত্রুটি” থাকে, তবে ভালো পাত্র পেতে কনেপক্ষকে আরও বেশি মূল্য দিতে হয়।’
ভারতে ১৯৬১ সালেই যৌতুক নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর এবং দুর্বল প্রয়োগের কারণে পরিস্থিতি বদলায়নি। ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (এনসিআরবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, যৌতুক মামলায় শাস্তির হার মাত্র ৩৩ শতাংশ।
আইনজীবীরা বলছেন, যৌতুক নিরোধক আইনে বরপক্ষকে প্রমাণ করতে হয় যে তারা যৌতুক নেয়নি। কিন্তু বাস্তবে যখন কোনো বিয়ে ভেঙে যায়, তখন দুই পক্ষের অভিভাবক অর্থের হিসাব নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়ায়। ফলে অনেকেই এখন যৌতুক আইনের চেয়ে ‘গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধ আইন’ ব্যবহার করাকে বেশি কার্যকর মনে করছেন, কারণ সেখানে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের প্রমাণ দাখিল করা সহজ হয়।
অড্রে ডি’মেলো বলেন, ‘আমি কনের মা-বাবাকে বলি—যা গেছে তা ভুলে যান। কারণ আপনারা জেনেশুনেই এই ব্যবস্থার অংশ হয়েছিলেন। কনের মা-বাবারও তো যৌতুকের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার অধিকার ছিল।’ তিনি বর্তমান যৌতুক আইন বাতিল করে গার্হস্থ্য সহিংসতা আইনকে আরও কঠোর করার পক্ষে মত দেন।
তিশা শর্মার মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কেবল ২০২৪ সালেই ভারতে যৌতুক সংক্রান্ত সহিংসতার কারণে ৫ হাজার ৭৩৭ জন নারীর মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ১৬ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ একজন নারীর জীবনের চেয়ে তাঁর বাপের বাড়ির দেওয়া গাড়ি বা সোনার দামকে বেশি মূল্য দেবে, ততক্ষণ এই নীরব হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করা অসম্ভব।
এনডিটিভির নিবন্ধ থেকে অনূদিত

এই হত্যাকাণ্ড এবং এর বিপরীতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে...
৪ ঘণ্টা আগে
গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কয়েক দশ আগেই। এই সত্যটাই ধীরে ধীরে সামনে আসছে এখন। এই বিষয়ে গাজায় দায়িত্ব পালন করা চারজন ইসরায়েলি সেনার সাক্ষ্য শোনা যাক।
১০ ঘণ্টা আগে
বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও যুদ্ধের সময় সাধারণত সোনার বাজার চাঙা হয়ে ওঠে। নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগকারীরা তখন ঝুঁকে পড়েন এই মূল্যবান ধাতুর দিকে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সোনাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
১৫ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র অস্থিরতার কারণে চলতি বছর ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে বাজার থেকে তারল্য বা বিনিয়োগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কারণে বাজার এখন এক প্রকার ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছে। ফলে তেলের
১ দিন আগে