
ইরানের সাম্প্রতিক ইসরায়েলবিরোধী হামলাগুলো ছিল এখন পর্যন্ত তেহরানের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপগুলোর একটি। এসব হামলার মাধ্যমে ইরান বহু দশক ধরে চলা সংঘাতের সীমারেখাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে। এত দিন এই সংঘাত মূলত ছায়াযুদ্ধ, গোপন অভিযান এবং সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রিত পাল্টা হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
লেবাননে হামলার জবাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়ে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা এখন আর নিজেদের সীমান্তে আটকে নেই এবং তাদের নেতৃত্ব এখন আরও বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এমনকি তারা এমন ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত, যা তাদের পূর্বসূরিরা নেয়নি।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির পর থেকে তেহরান বারবার অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ওই শান্তিচুক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পরোক্ষ প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল লেবাননে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি হামলা চালিয়েছে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, যার মধ্যে বৈরুতের মতো রাজধানী শহরও রয়েছে। অথচ, যুদ্ধবিরতিতে কিছু বিধিনিষেধ ছিল কিন্তু তা মানেনি ইসরায়েল।
ইরান এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলের লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক ‘ক্যালিব্রেটেড’ বা হিসাবি পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতে এবং তা পারস্য উপসাগরের বাইরেও বিস্তৃত করতে প্রস্তুত। এবারে যুদ্ধ শুরু হলে তা ভারত মহাসাগর থেকে লোহিত সাগর হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত নৌরুটগুলোকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা হয়। এটি এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা কতটা ভঙ্গুর তা আরও স্পষ্ট করে তোলে। এর আগে সপ্তাহের শুরুতে একটি মার্কিন সেনা হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাও এই উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।
তবে এই সপ্তাহের ইসরায়েল লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলোকে তেহরানের কৌশলে আরও একটি গভীর ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ইসরায়েলি সামরিক হামলা হলে সেটিও এখন থেকে ইরানের সরাসরি প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে। এর লক্ষ্য ছিল শান্তি আলোচনায় তৈরি হওয়া কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙা এবং হিজবুল্লাহকে সমর্থন দেওয়া।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সোমবার বলেন, ‘আমরা এমন যুদ্ধবিরতির সমীকরণ ভেঙে দিয়েছি, যা কাগজে ছিল কিন্তু বাস্তবে স্থলে বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রকৃত আস্থা তৈরির ইচ্ছা না থাকলে, ইরানের প্রতিক্রিয়া একই থাকবে।’ ইরান জোর দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একদিকে হামলা চালিয়ে আবার অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার দাবি করতে পারবে না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই’ তাঁরা এমন ব্যবস্থা মেনে নেবে না।
এই পদক্ষেপ তেহরানের ভেতরে এক বিস্তৃত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব দীর্ঘদিনের সতর্ক, প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল থেকে সরে এসে আরও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হচ্ছে। তারা এখন শুধু প্রতিরোধ বা কৌশলগত ধৈর্যের ওপর নির্ভর না করে, বরং ইরানের সামরিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহকে সরাসরি প্রভাবিত করতে চাইছে।
একই ইরানি নেতৃত্বকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আরও যুক্তিবাদী’ এবং ‘খুবই সহনশীল’ বলে বর্ণনা করেছেন। সিএনএনের জেসিকা ডিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ইরানিরা এখন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই একধরনের ফাঁদে ফেলেছে। তারা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তারা মনে করছে তারা জিতছে। তাদের কাছে এই যুদ্ধবিরতি তাদের স্বার্থে কাজ করছে না।’
২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে দীর্ঘদিনের একটি অলিখিত সীমা ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে। তখন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির নেতৃত্বে তেহরানের প্রতিক্রিয়া ছিল নিয়ন্ত্রিত পাল্টা হামলার নীতিতে—যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে আগেই জানানো হয়, ফলে মার্কিন বাহিনী ইরাকের একটি বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পায়।
২০২৫ সালের জুনে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের ওপর হামলায় অংশ নেয়, তখন তেহরান আবারও একটি সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়ার পথ বেছে নেয়। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তীব্র বাক্যবিনিময় সত্ত্বেও তারা তখনো উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করছিল।
কিন্তু এই সপ্তাহে ইসরায়েলে চালানো হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সেই হিসাব-নিকাশ বদলাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি থিঙ্কট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, ‘এটি কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার, যখন একটি আঞ্চলিক শক্তির এমন সক্ষমতা, সামর্থ্য এবং ইচ্ছা রয়েছে যে তারা তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি সামরিক কৌশল বা আগ্রাসনের বিপরীতে সরাসরি কঠিন শক্তি প্রয়োগ করতে পারে।’
হামলার পর ইরান সতর্ক করে জানায়, তারা ‘উত্তেজনার মাত্রা বাড়াতে’ প্রস্তুত, যাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা যায়—যেখানে তারা ইরানের প্রতিক্রিয়ার সীমা নির্ধারণ করে ধরে নিয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, ‘ইসরায়েলি ও আমেরিকানরা যদি মনে করে যে নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার মাধ্যমে তারা ইরান এবং (এর প্রক্সি নেটওয়ার্ক) রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্টকে তাদের অপরাধের মুখে পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলতে পারবে, বা ইরানের প্রতিক্রিয়ার ধরন সীমিত করতে পারবে, তবে তারা একটি বোকামির ভুল করছে।’
তেহরান এক ‘নতুন সমীকরণ’ তৈরি করতে চাইছে, যার লক্ষ্য শুধু ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং অঞ্চলে তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা। এমনটাই বলেছেন ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিত্রিনোভিচ। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলি আবারও দেখিয়েছে যে ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব ক্রমেই বিশ্বাস করছে—কূটনীতির মাধ্যমে যা অর্জন করা যায় না, তা শেষ পর্যন্ত শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।’
ইরান একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের ভেতরের বিভাজনও পরীক্ষা করছে এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তি এখনো সম্ভব এবং ইসরায়েলকে শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিতে হবে—‘ইসরায়েলের আর কোনো বিকল্প থাকবে না।’
এই কৌশল কিছুটা ফলও দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। গত সোমবার ইরান ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর ট্রাম্প দ্রুত পদক্ষেপ নেন যাতে আরও উত্তেজনা না বাড়ে। তিনি কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নেতানিয়াহুর সঙ্গে দুবার কথা বলেন এবং তাকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেন, ওয়াশিংটন ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের জন্য ‘দায়ী’ এবং তিনি সতর্ক করেন যে এসব পদক্ষেপ ‘অনিবার্যভাবে’ কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কোনো ভূমিকা রাখেনি, তবে আগত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে তারা সহায়তা করেছে।
ইরান হয়তো ওয়াশিংটনকে এমন এক অবস্থানে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে—ইসরায়েলের সামরিক স্বাধীনতাকে সমর্থন করবে, নাকি তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক পথ রক্ষা করবে। অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ট্রাম্পের নেতানিয়াহুর ওপর চাপ ইরানের হাতে ‘আরেকটি তাস যোগ করেছে’। এটি তেহরানের নতুন কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি এক নতুন মানদণ্ড (নর্ম) তৈরি করবে।’

এই হত্যাকাণ্ড এবং এর বিপরীতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে...
৪ ঘণ্টা আগে
গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কয়েক দশ আগেই। এই সত্যটাই ধীরে ধীরে সামনে আসছে এখন। এই বিষয়ে গাজায় দায়িত্ব পালন করা চারজন ইসরায়েলি সেনার সাক্ষ্য শোনা যাক।
১০ ঘণ্টা আগে
বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও যুদ্ধের সময় সাধারণত সোনার বাজার চাঙা হয়ে ওঠে। নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগকারীরা তখন ঝুঁকে পড়েন এই মূল্যবান ধাতুর দিকে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সোনাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
১৫ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তীব্র অস্থিরতার কারণে চলতি বছর ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে বাজার থেকে তারল্য বা বিনিয়োগ সংকুচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের কারণে বাজার এখন এক প্রকার ‘জিম্মি’ হয়ে পড়েছে। ফলে তেলের
১ দিন আগে