Ajker Patrika

হরমুজ প্রণালি বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোড় নিচ্ছে জ্বালানি যুদ্ধে, বৈশ্বিক মন্দার পদধ্বনি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১১: ৪৩
হরমুজ প্রণালি বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোড় নিচ্ছে জ্বালানি যুদ্ধে, বৈশ্বিক মন্দার পদধ্বনি
হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র সংঘাত এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর ‘হরমুজ প্রণালিতে’ আছড়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে জলপথটি বন্ধ ঘোষণা করার পর বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে হাহাকার শুরু হয়েছে। গত শনিবার ইরান ভূখণ্ডে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাবারি একটি কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি এখন থেকে বন্ধ। আমাদের বীর যোদ্ধারা এই পথে অনুপ্রবেশকারী যেকোনো জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেবে।’ তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, আমেরিকা এই অঞ্চলের এক ফোঁটা তেলও পাবে না এবং প্রয়োজনে আঞ্চলিক তেলের পাইপলাইনগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

মহাসংকটের গত ৪৮ ঘণ্টায় এই অঞ্চলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে, এর মধ্যে অন্তত পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ওমান উপকূলে একটি ট্যাংকারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।

হামলায় অন্তত দুজন নাবিক নিহত হয়েছেন।

প্রায় ১৭০টি বিশালাকার বাণিজ্য জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালির প্রবেশমুখে আটকা পড়েছে। বিমা জটিলতা ও নিরাপত্তার অভাবে জাহাজগুলো এগোতে পারছে না।

বিশ্বের বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি মেয়ারস্ক (Maersk) এবং হ্যাপাগ-লয়েড এই রুট দিয়ে তাদের সমস্ত চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ‘ব্রেন্ট ক্রুড’-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৭০ ডলার বা ২.২ শতাংশ বেড়ে ৭৯.৪৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগে গতকাল লেনদেনের একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮২.৩৭ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। যদিও দিনের শেষ ভাগে এই দাম কিছুটা কমে ৭ শতাংশ বৃদ্ধিতে স্থির হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।

এদিকে জাহাজ বিমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ মার্চ থেকে এই অঞ্চলের জন্য তাদের ‘ওয়ার রিস্ক কভার’ বাতিল করার নোটিশ দিয়েছে; যার ফলে জাহাজ চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ইউরোপের বিপদ আসন্ন

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে অথবা তেল ও গ্যাস অবকাঠামো অব্যাহতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এশিয়া ও ইউরোপ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।

কাতার এর আগে বলেছিল, ইরান থেকে তাদের একটি স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর পাওয়ার পর তারা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।

এমএসটি ফাইন্যান্সিয়ালের সিনিয়র এনার্জি অ্যানালিসিসের তেল বিশ্লেষক সল কাভোনিকের মতে, ‘কাতারি এলএনজিকে আর কোনো বিকল্প প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। যদি উৎপাদিত বন্ধ দীর্ঘায়িত হয়, অথবা এলএনজি অবকাঠামোর অবস্থা আরও খারাপ হয়, তাহলে ২০২২ সালে রাশিয়া ইউরোপে পাইপলাইনে গ্যাস বন্ধ করে দেওয়ার পর যে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার চেয়েও বড় সংকটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।’

বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। কাতার এই এলএনজি রপ্তানির ৯০ শতাংশ ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন, ভারত, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোতে উদ্বেগের ছায়া

হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত তেলের ৭০ শতাংশই যায় এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জ্বালানি চাহিদার বেশির ভাগের জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে তেলের দাম বাড়লে তা সরাসরি মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই যায়। ফলে ইউরোপ ও এশিয়ায় বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিকল্প রুটের সীমাবদ্ধতা

যদিও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন রয়েছে, তবে তা মোট চাহিদার তুলনায় নগণ্য। বিশ্বের ২০ শতাংশ তেলের বিকল্প ব্যবস্থা করা রাতারাতি সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক কোম্পানি এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে জাহাজ পাঠানোর চিন্তা করছে। এতে পণ্য পৌঁছানোর সময় দুই সপ্তাহ এবং পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বাড়বে।

বর্তমান এই সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান কোনো পক্ষই ছাড় না দেওয়ায় এক ভয়াবহ বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত