
ভারত চলতি মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি স্থগিত করেছে। এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো ভারতের বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে সারা বিশ্বে পণ্য রপ্তানি করতে পারত। ভারতের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিশাল পোশাক খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ৮ এপ্রিল এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। এ মাসের শুরুতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এই ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধার কারণে আমাদের বিমানবন্দর ও বন্দরে উল্লেখযোগ্য যানজট তৈরি হচ্ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের (ভারত) নিজেদের রপ্তানির জন্য আরও জায়গা তৈরি করতে হবে।’
বাংলাদেশে ২০২০ সালে যখন ভারতপন্থী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন, তখন এই সুবিধা চালু করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থা তুলে নেওয়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য বড় ধাক্কা। কারণ, খাতটি এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলা করছে।
তবে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান এই পদক্ষেপকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন না। তিনি বলেছেন, এর ফলে বাণিজ্যে ‘কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না।’ তিনি নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, ‘দিল্লি বা কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করে পণ্য ট্রানজিট করার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই। এ জন্য আমরা আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানাইনি বা পাল্টা ব্যবস্থা নিইনি।’
তবে এই পদক্ষেপের পর কলকাতার একটি বিমানবন্দর হয়ে স্পেনে পাঠানোর জন্য তৈরি পোশাকবোঝাই ট্রাক সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারেনি বলে খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা প্রতি সপ্তাহে মোট ২০০০ থেকে ২৪০০ টন পণ্যের মধ্যে প্রায় ৬০০ টন পণ্য ভারতীয় বিমানবন্দর দিয়ে পাঠাতেন।
ভারতের এই বাণিজ্য ব্যবস্থা স্থগিত করার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ থিংকট্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ‘এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে ব্যাহত করতে পারে।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতে শিপিং খরচ বাড়বে এবং পণ্য সরবরাহের সময় দীর্ঘ হবে। অজয় শ্রীবাস্তব আরও বলেন, ভারতের বন্দরগুলো বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত এবং সস্তা পথে সুবিধা দিত। বিশেষ করে পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পোশাক চালানের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভারতের সাবেক বাণিজ্য কর্মকর্তা শ্রীবাস্তব বলেন, ট্রানজিট সুবিধা বাতিলের এই পদক্ষেপ ক্রমবর্ধমান কৌশলগত উত্তেজনার প্রতিফলন। তিনি সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ চীনকে লালমনিরহাটে একটি বিমানঘাঁটি সংস্কারে সাহায্যের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এই ঘাঁটি ভারতের শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি।
শ্রীবাস্তব বলেন, এটি ‘নয়াদিল্লিতে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।’ এই এলাকাকে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় ‘একটি প্রধান দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা হয়। শিলিগুড়ি করিডর একটি সরু ভূখণ্ড। এটি চিকেনস নেক নামেও পরিচিত। এটি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করে। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থিত এবং ২০১৭ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে ৭৩ দিনের সামরিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়া দোকলাম মালভূমিরও কাছাকাছি।
শ্রীবাস্তব নিক্কেইকে বলেন, ‘ভারতের বার্তা স্পষ্ট, প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য সহযোগিতা পারস্পরিক আস্থা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।’
গত মার্চের শেষের দিকে বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেইজিং সফরে যান। সেখানে তিনি বাংলাদেশে আরও বেশি চীনা বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘স্থলবেষ্টিত’ বলে উল্লেখ করেন। এই মন্তব্য নয়াদিল্লির সঙ্গে উত্তেজনা আরও গভীর করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইউনূস বলেছিলেন, ‘আমরাই এই অঞ্চলের (সেভেন সিস্টার্স) সমুদ্রে প্রবেশের একমাত্র অভিভাবক। সুতরাং এটি এক বিশাল সম্ভাবনা খুলে দেয় এবং চীনের অর্থনীতির একটি সম্প্রসারণ হতে পারে।’
কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ সরকার ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের পর কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে দ্রুত পরিকল্পনা করছে। তারা ঢাকার প্রধান বিমানবন্দর পরিদর্শন করে সেখানকার কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধা পরীক্ষা করেছে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে লজিস্টিক খরচ কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। ২৭ এপ্রিল সিলেট বিমানবন্দরের একটি ভয়েজার এয়ারলাইনস ফ্লাইটে করে স্পেনে ৬০ টন পোশাক পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কবির আহমেদ নিক্কেইকে বলেছেন, ঢাকার প্রধান বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা সীমিত। এ কারণে অনেক রপ্তানিকারক ভারতে পণ্য পাঠাতেন। ঢাকার বিমানবন্দর থেকে রপ্তানির জন্য কার্গো চার্জ ভারতের বিমানবন্দরের চেয়ে প্রতি কিলোগ্রামে ৭০ থেকে ৮০ ইউএস সেন্ট বেশি। সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহনের খরচ যোগ করেও অনেক সময় ভারতের মাধ্যমে পাঠানো সস্তা ছিল।
ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে এয়ার ফ্রেইট রেট প্রতি কিলোগ্রামে সাড়ে ৪ থেকে ৫ ডলার। ইউরোপের ক্ষেত্রে এটি ২ দশমিক ৭০ থেকে ৩ দশমিক ৩০ ডলার পর্যন্ত হয়। কবির আহমেদ বলেন, ‘ঢাকার বিমানবন্দর দীর্ঘকাল ধরে যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে, সেগুলো আমাদের সমাধান করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং রেট কমাতে হবে।’
আরও খবর পড়ুন:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত শনিবার ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। এর পরই দ্রুত পাল্টা জবাবের পথে হাঁটে তেহরান। ইরান জানায়, তাদের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল এবং অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-সংযুক্ত সামরিক স্থাপনাগুলো।
২৩ মিনিট আগে
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা হলেও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এমনটাই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মাইকেল ম্যালরয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, খামেনিকে হত্যা করা...
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের বর্তমান রেজিম বা শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছেন। তাঁর এই পরিকল্পনা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নীতি থেকে একটি তীক্ষ্ণ বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করছে। সোজা কথায়, তাঁর নীতি অতীতের যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের রেজিম....
১ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী মোড় নিয়ে শনিবার ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় ইরানের প্রায় চার দশকের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
১ দিন আগে