ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ আসলে কী? এবং তারা কি আদৌ সমন্বিতভাবে এই স্বার্থ হাসিলে কাজ করছে, নাকি এই দুই পক্ষের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আছে? খোলা চোখে দেখে বলা যায়, ইসরায়েল যেভাবে ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামো, বেসামরিক কাঠামো লক্ষ্যবস্তু করছে এবং ট্রাম্প যেভাবে ইসরায়েলকে ‘সংযত’ করার চেষ্টা করছেন তাতে মনে হচ্ছে, এই দুই পক্ষের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আছে।
কাতারের হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সুলতান বারাকাত বলেন, ওয়াশিংটন ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যেসব বার্তা দিচ্ছে, সেখানে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে গভীরতর দ্বন্দ্ব আড়াল করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের বক্তব্যের আলোকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মার্কিন থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিল বলছে, ইরান আগ্রাসনে ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নৌবাহিনী, ড্রোন সক্ষমতা এবং তাদের সশস্ত্র প্রক্সিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেওয়া। এসব লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়েছে বলে দাবি করেছে।
অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতার ওপর হামলা চালাতে সম্ভবত আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে অনুমান মার্কিন কৌশলবিদদের। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো একতরফাভাবে ‘বিজয়’ ঘোষণা করতে পারবেন।
ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি লক্ষ্য হলো—এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা, যা ‘আন্তর্জাতিকভাবে আরও সহযোগিতামূলক হবে’ এবং নিজ দেশের মানুষের মানবাধিকারকে সমুন্নত করবে, সেটিও কাম্য। তবে সেই পরিণতি মূলত ইরানের জনগণের হাতেই নির্ভর করছে। পরবর্তী সময়ে যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ইরান বহু বছর ধরে দুর্বল অবস্থায় থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা অনেক কমে যাবে।
আটলান্টিক কাউন্সিল আরও বলেছে, ইসরায়েল প্রায় নিশ্চিতভাবেই ইরানের শাসনব্যবস্থার পতনকে একটি কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের জুনে বারো দিনের যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোর সম্প্রসারণ এটি। সেই সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে যায়। তবে ইরানের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ভেদ করতেও সক্ষম হয়।
প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সীমিত মজুত এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজারে নেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়ে ইসরায়েল বুঝতে পারে যে ভবিষ্যতে এসব ক্ষেপণাস্ত্র তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অভিভূত করতে পারে এবং কৌশলগত হুমকি তৈরি করতে পারে। সে কারণে ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়ে এই হুমকির বিরুদ্ধে হামলা চালানোর প্রস্তুতি ছিল ইসরায়েলের।
ইসরায়েলিদের জন্য ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন কামনা করা অস্বাভাবিক নয়। দশকের পর দশক ধরে তারা এমন এক শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে বসবাস করছে, যে প্রকাশ্যে ও মতাদর্শগতভাবে ইসরায়েলের ধ্বংসে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেই লক্ষ্য অর্জনে কৌশলগত অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও অর্থ জোগাচ্ছে। গত বিশ বছরে ইরান ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হাজার হাজার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত, ইরানের প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সত্ত্বেও অধিকাংশ ইসরায়েলির কাছে এই অভিযান প্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছে।
তবে ইসরায়েলের শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, বা আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা ততটা স্পষ্ট নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন যুদ্ধের কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে। তবে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি এবং এমন পরিস্থিতি তৈরির কথা বলা, যাতে ইরানের জনগণ নিজেরাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, এগুলো অন্তত আংশিকভাবে ইসরায়েলের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে মিলে যায়।
কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, পুঁজিবাজারের পতন, জাহাজ চলাচল ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং ইরানের আরব প্রতিবেশীদের আকাশ প্রতিরক্ষার ফাঁক খুঁজে বের করে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি করতে থাকা পরিস্থিতিতে, ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আগেভাগেই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার সম্ভাবনাও কল্পনা করা যায়, যেখানে তিনি দাবি করতে পারেন যে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করা হয়েছে।
এ ছাড়া শাসনব্যবস্থার পতনের পর সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা, গৃহযুদ্ধ, অস্থিতিশীলতা প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এবং শরণার্থী সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্র ও তার আরব মিত্রদের কাছে ইসরায়েলের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগের বিষয় হতে পারে। যদি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে এমন ফাঁক তৈরি হয়, তবে যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা নির্ধারণে ট্রাম্পই চূড়ান্ত ভূমিকা নেবেন এবং প্রয়োজনে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য পূরণ না হলেও সেই সমাপ্তির দায় ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন।
বারাকাত বলেন, ‘আমরা যে বার্তা পাচ্ছিলাম, সেই সংবাদ সম্মেলনে যে সুরে কথা বলা হচ্ছিল, তাতে মনে হচ্ছিল সবাই একই অবস্থানে আছে। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। সব খুব ভালোভাবে কাজ করছে।’ তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ঐক্যের ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
তিনি বলেন, ‘তিনি (হেগসেথ) স্বীকার করেছেন যে দুটি আলাদা লক্ষ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য...এবং আমাদের মিত্রদের লক্ষ্য...। কিন্তু যখন তাঁকে সাংবাদিকেরা চেপে ধরেন, তখন দেখা যায় হেগসেথ বলেন— আমরা আসলে শুধু একজন মিত্রের কথাই বলছি, আর সেটি হলো ইসরায়েল।’ বারাকাত আরও বলেন, ‘স্পষ্ট যে, (আক্রমণের) সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরায়েলই, তারাই যুক্তরাষ্ট্রকে এতে টেনে এনেছে এবং কখন যুদ্ধ থামবে সেটিও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলই ঠিক করবে।’
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ট্রাম্প নিজের নির্বাচনী প্রচার এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে ‘অনন্ত যুদ্ধের’ বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। কিন্তু সেই তিনিই রাতারাতি মিত্রদের না জানিয়ে ইরানে ইসরায়েলকে নিয়ে আক্রমণ করে বসেন। মার্কিন আক্রমণ ইরানের সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও ইসরায়েল ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরানের পানি শোধনাগার বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট, গ্যাসক্ষেত্র, তেলের ডিপো এমনকি সাধারণ নাগরিকদের বাড়িঘরেও হামলা চালাতে দ্বিধা করেনি।
ইসরায়েলের এই নির্বিচার হামলা অনেকটা গাজায় তাদের ‘গণহত্যা’র সঙ্গে তুলনীয়। যেখানে তারা ফিলিস্তিনিদের বাইবেলে বর্ণিত ইহুদি জাতির চিরশত্রু ‘আমালেক’ বলে মনে করে এবং তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া ধর্মীয় এবং নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একইভাবে ইরানিদের ‘আমালেক’ বলে মনে করেন এবং ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর স্বপ্ন লালন করেন। আর এখানে এসেই ইসরায়েলের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আলাদা হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই আগ্রাসনে স্রেফ ইসরায়েলের ‘জুনিয়র পার্টনার’ বলে প্রতীয়মান হয়।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় এবং অর্জনের পাল্লা অসম। এতটাই অসম যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ভাবছে, ইরানি তেলের ওপর থেকে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে নিজ দেশের এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করতে। এরই মধ্যে যুদ্ধে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়ে গেছে। পেন্টাগন কংগ্রেসের কাছে আরও ২০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল চেয়ে আবেদন করেছে।
এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য এতে কতটা অর্জিত হবে সেটা অস্পষ্ট। কিন্তু, ইসরায়েল যে ইরানকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দিতে চায়, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার উপসাগরীয় মিত্ররা একটি সামাজিকভাবে ভগ্ন ও অর্থনৈতিকভাবে রুগ্ণ ইরান চায় কিনা সেটি নিয়ে দ্বিধার অবকাশ আছে।
আর এ কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সুলতান বারাকাত। তিনি বলেন, ‘খুব সহজেই তিনি (ট্রাম্প) বিজয় ঘোষণা করতে পারতেন...তিনি বলতে পারতেন—আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করেছি, আপনাদের আর কষ্ট ও খরচের মধ্যে ফেলব না।’
বারাকাত আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধের খরচ ২০০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে তিনি (ট্রাম্প) যেভাবে কথা বললেন, তা আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ লেগেছে। যেন এটি খুবই সামান্য অর্থ...কিন্তু সাধারণ করদাতার জন্য এটি বড় পার্থক্য তৈরি করে।’
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই

যুদ্ধ শুরুর পর কিছুদিন আগে ইরানের জ্বালানি টার্মিনাল বলে খ্যাত খারগ দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইসরায়েল গতকাল বুধবার ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলাস চালায়। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হেনে চাপ আরও বাড়িয়েছে।
৮ ঘণ্টা আগে
ইরানে যুদ্ধ সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি। এর সূচনা হয়েছিল আরও কয়েক দশক আগে। ১৯৫৩ সালের দমবন্ধ করা আগস্টে, সিআইএ কর্মকর্তা কারমিট রুজভেল্ট জুনিয়রের দপ্তরে। তিনি ছিলেন এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাতি এবং একটি অভ্যুত্থানের নকশাকার।
১ দিন আগে
আলী লারিজানি ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং মেধাবী ব্যক্তিত্ব। তিনি গত চার দশক ধরে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিবর্তনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। একজন কট্টরপন্থী পারিবারিক উত্তরাধিকারী হয়েও পশ্চিমা দর্শনে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে বিশ্বমঞ্চে একজন....
১ দিন আগে
শ্রীলঙ্কা ১৯৭০ সালে আরব রাষ্ট্রগুলোর চাপে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু দেশটির নির্মম গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রায় এক বছর পর, ১৯৮৪ সালে কলম্বোয় মার্কিন দূতাবাসে একটি ইসরায়েলি ‘ইন্টারেস্টস সেকশন’ (স্বার্থরক্ষা দপ্তর) খোলা হয়।
২ দিন আগে