Ajker Patrika

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে ‘পুনর্গঠন-বাণিজ্য’ করবে চীন, কিনবে সস্তায় তেল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৮: ১৯
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে ‘পুনর্গঠন-বাণিজ্য’ করবে চীন, কিনবে সস্তায় তেল

গত ডিসেম্বরে ইরানের অভ্যন্তরীণ গণবিক্ষোভের সময় চীন প্রায় দুই সপ্তাহ নীরব ছিল, সেখানে বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার খবর চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং দ্রুততার সাথে প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষককে অবাক করেছে।

‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের এই চরম সংকটেও চীন কোনো আবেগপ্রবণ মিত্রের মতো নয়, বরং এক অত্যন্ত হিসাবী এবং ঠান্ডা মাথায় অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে।

চীনের এই বরফশীতল সমীকরণের পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক দর্শন। বেইজিংয়ের জন্য একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন তখনই বেশি আতঙ্কজনক, যখন তা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের মাধ্যমে ঘটে— যেমনটি গত ডিসেম্বরে ইরানিরা করার চেষ্টা করেছিল। কারণ এ ধরনের ‘জনগণের বিপ্লব’ চীনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য একটি ভীতিকর উদাহরণ হতে পারে। বিপরীতে, বিদেশি বিমান হামলায় কোনো নেতার মৃত্যু বেইজিংয়ের কাছে অনেক বেশি ‘সমাধানযোগ্য’ ঘটনা। এটি চীনকে আমেরিকার ‘যুদ্ধবাজ’ নীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে সরব হওয়ার সুযোগ করে দেয়, আবার পর্দার আড়ালে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার নতুন পথও খুলে দেয়।

পশ্চিমা বিশ্বের অনেকে মনে করছেন খামেনির মৃত্যু চীনের জন্য একটি বড় ধাক্কা, কারণ চীনকে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চীন মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও অর্থনৈতিকভাবে এক দানবীয় শক্তি। ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র নিকোলাস মাদুরোকে যখন গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প বাহিনী ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তখনও চীন কেবল পার্শ্বচরিত্রে ছিল। ইরানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। যদিও চীন ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি ক্রেতা, তবুও বেইজিংয়ের জ্বালানি সরবরাহের চেইন এখন অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। এ ছাড়া চীনে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিপ্লব চলায় তেলের ওপর তাদের চিরস্থায়ী নির্ভরতাও আগের চেয়ে কমেছে।

চীনের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলে আমেরিকার এই সামরিক অভিযান একই সঙ্গে অস্বস্তি এবং স্বস্তির বিষয়। যদি আমেরিকা ইরানের এই যুদ্ধে দীর্ঘায়িত হয় (যেমনটি ইরাক যুদ্ধে হয়েছিল), তবে বেইজিংয়ের জন্য তা হবে পরম আনন্দের বিষয়। কারণ ওয়াশিংটন যত বেশি মধ্যপ্রাচ্যে মনোযোগ ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করবে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ওপর চাপ ততটাই হ্রাস পাবে। ট্রাম্পের এই ‘বোল্ড’ পদক্ষেপ আমেরিকার সামরিক ও আর্থিক শক্তিকে অপচয় করার একটি নতুন ফাঁদ হতে পারে, যা প্রকারান্তরে চীনের বিশ্বজয়ের পথকেই প্রশস্ত করবে।

তা ছাড়া, বেইজিং ইরানের অস্থিরতায় কিছুটা বিরক্তও ছিল। ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পারস্য উপসাগরের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার প্রবণতা চীনের সৌদি আরব ও আমিরাতের বিশাল বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। চীন মূলত মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ চায় যেখানে তাদের ব্যবসা ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলো নিরাপদ থাকবে। যদি বর্তমান যুদ্ধের ফলে এমন একটি ইরান গঠিত হয়, যারা পারমাণবিক অস্ত্রের আশা ত্যাগ করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তায় বেশি তেল বিক্রি করবে, তখন চীন হবে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী।

পরিশেষে বলা যায়, যুদ্ধ শেষ হলে যখন পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে, তখন চীন আর দর্শক থাকবে না। ইরাকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যুদ্ধের পর অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তিগত বাণিজ্যে চীনা কোম্পানিগুলোই সবার আগে পৌঁছে যায়। বেইজিংয়ের এই ‘কোল্ড ক্যালকুলাস’ বা শীতল সমীকরণ এটাই বলছে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী থাকুক বা না থাকুক, চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় থাকবেই। বেইজিংয়ের কাছে কোনো ব্যক্তি বা আদর্শ বড় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থই শেষ কথা।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত