ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নিবন্ধ

তারেক রহমানের নেতৃত্বে মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় পেয়েছে। তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বী জোটকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
আন্দোলনে সহিংস–প্রাণঘাতী দমনপীড়নের অভিযোগে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তাই এই নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর এক বড় উত্থানের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯১ সালে দলটির সর্বোচ্চ আসন ছিল ১৮ টি। এবার তারা এককভাবে ৬৭টি আসন পেয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারেক রহমানকে ‘নির্ণায়ক বিজয়ের’ জন্য অভিনন্দন জানান। পরে টেলিফোনেও মোদি তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অস্থির হয়ে ওঠে। তাই এই নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের সঙ্গে বিএনপির ইতিহাস
বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকেই ভারত বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব নেন। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি দলের আদর্শ ও কার্যক্রম গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গত বছরের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তারেক রহমান দলের নিয়ন্ত্রণ নেন। তিনি ১৭ বছর স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরেন। বর্তমানে তার বয়স ৬০ বছর।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। সেই সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা তিক্ততা তৈরি হয়। ভারতের অভিযোগ ছিল, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনকে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি জামায়াতের কিছু নেতা এসব গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। ভারতের কাছে এটি বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর, ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। এর মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা জোরদার হয়। এতে নয়াদিল্লি স্বস্তি পায়। তবে শেখ হাসিনা দেশে এই অভিযানকে ব্যবহার করেন জামায়াতের নেতা ও বিরোধী বিএনপির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে। সন্ত্রাস দমনের নামে তিনি রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপরও অভিযান চালিয়ে যান। ভারত এ বিষয়ে নীরব ছিল।
পরে, ২০২৪ সালে বিশাল গণ-আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর বিরোধী দলগুলো দ্রুত রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ করে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন পূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ পাচ্ছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।
হাসিনার পতনের পর নতুন সমীকরণ
গতকাল শুক্রবার নরেন্দ্র মোদি দ্রুত তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং ফোনে কথা বলেন। আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগেই তিনি অভিনন্দন বার্তা দেন। তিনি লেখেন, ‘এই বিজয় আপনার নেতৃত্বের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন। ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’
আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগেই ভারতের এই প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহ স্পষ্ট। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরও ভারত বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করে উচ্চপর্যায়ে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় গিয়ে সমবেদনা জানান এবং তাঁর জানাজায় অংশ নেন। এই পদক্ষেপ দুই পক্ষের সম্পর্ক উন্নত করতে সহায়তা করে। নির্বাচনী প্রচারণায় তারেক রহমান বা বিএনপির শীর্ষ নেতারা ভারতের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দেননি। দেশে ফেরার পর গত বছর যখন তারেক রহমানকে বীরের মতো স্বাগত জানানো হয়, তখনো তিনি সমন্বয়ের সুরে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘এই দেশে পাহাড় ও সমতলের মানুষ আছে। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সবাই আছে। আমরা একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেখানে প্রত্যেক নারী, পুরুষ ও শিশু নিরাপদে ঘর থেকে বের হতে পারবে।’
নির্বাচনী ইশতেহারে নানা রকম সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এমন কিছু বক্তব্যও দিয়েছে, যেগুলো দিল্লি ও ঢাকায় অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, তাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে। সেখানে ভারতের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তবে বলা হয়েছে, ‘বন্ধুত্বে হ্যাঁ, প্রভুত্বে নয়—সমতা ও আত্মমর্যাদার ভিত্তিতে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন।’ এটিকে অনেকেই ভারতের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। কারণ, বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবকে অনেকেই আধিপত্যশীল হিসেবে মনে করেন।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিজেদের বিষয়েও কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না।’ একে অনেকেই এভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী কোনো কার্যক্রমের ব্যাপারে শূন্য সহনশীলতা দেখানো হবে।
জামায়াতে ইসলামীও ভারতের প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। তাদের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে।’
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলেও, বিএনপি ও জামায়াত—কোনো দলই তাদের ইশতেহারে পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করেনি। তবে তারা ‘মুসলিম বিশ্ব’ নিয়ে কথা বলেছে। বিএনপি বলেছে, ‘মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা’ তাদের অন্যতম অঙ্গীকার। জামায়াত বলেছে, ‘মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা হবে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার।’
ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ
প্রথমত, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান একটি বড় বিষয়। বিএনপি প্রধান যদি তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়ে জোর না দেন, তাহলে জামায়াতের সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে তিনি চাইবেন না, হাসিনা ভারত থেকে রাজনৈতিকভাবে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন।
দ্বিতীয়ত, দুই দেশের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। বস্ত্র, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে বাণিজ্য রয়েছে। স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার স্বার্থে ভারত চাইবে এই বাণিজ্য সম্পর্ক এগিয়ে যাক। বাংলাদেশের পক্ষেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যেন আগের বিএনপি আমলের মতো অবনতি না ঘটে, তা ভারত চাইবে না। এটি দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা। এ উদ্দেশ্যে জামায়াতের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খোলা হয়েছে।
চতুর্থত, দিল্লি তার উন্নয়ন ও যোগাযোগ প্রকল্পগুলো চালিয়ে যেতে আগ্রহী। আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরাকে সিলেট ও ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য কিছু নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, যাতে যোগাযোগ সহজ হয়। তবে বাংলাদেশে বিদ্যমান ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণে এ বিষয়টি ভারতকে সংবেদনশীলভাবে সামলাতে হবে।
পঞ্চমত, দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও উন্নত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি নাগরিকেরা চিকিৎসা, পর্যটনসহ নানা কারণে ভারতে যান। এ ক্ষেত্রে ভারত যদি একটি উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলে, তাহলে তা সদিচ্ছা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ও একাধিকবার প্রবেশের ভিসা ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ষষ্ঠত, বাংলাদেশ থেকে ভারতে বড় পরিসরে অর্থনৈতিক অভিবাসনের বিষয়টিও জড়িত। কয়েকটি ভারতীয় রাজ্যে বাংলাদেশি অভিবাসন ইতিমধ্যে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রায়ই এটি বিজেপির রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে উঠে আসে। বিষয়টি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সংবেদনশীলভাবে সামাল দিতে হবে।
সপ্তমত, বাংলাদেশ সমাজ যেন উগ্রপন্থা ও সংখ্যালঘুবিরোধী পথে না যায়, তা ভারত চাইবে না। বিএনপিরও স্বার্থ রয়েছে এ ধরনের উপাদান নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে। সম্প্রতি হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় দিল্লি থেকে যে বক্তব্য এসেছে, তা সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে। মূলত বাংলাদেশের নেতাদেরই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অষ্টমত, এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ যেন পাকিস্তান বা চীনের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
অতীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনার আমলের সম্পর্ককে ‘সোনালি অধ্যায়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বর্তমানে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা থাকলেও, সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে সেই সময় আবার ফিরে আসতে পারে এবং দুই দেশের জন্যই কল্যাণকর হতে পারে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা হলেও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এমনটাই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মাইকেল ম্যালরয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, খামেনিকে হত্যা করা...
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের বর্তমান রেজিম বা শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছেন। তাঁর এই পরিকল্পনা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নীতি থেকে একটি তীক্ষ্ণ বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করছে। সোজা কথায়, তাঁর নীতি অতীতের যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের রেজিম....
১ দিন আগে
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী মোড় নিয়ে শনিবার ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলায় ইরানের প্রায় চার দশকের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
১ দিন আগে
জর্জ অরওয়েল তাঁর বিখ্যাত ‘১৯৮৪’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, ‘গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসনের মূল নির্যাস হলো একটি নির্দিষ্ট বিশ্বদর্শন এবং জীবনযাত্রাকে টিকিয়ে রাখা, যা মৃতরা জীবিতদের ওপর চাপিয়ে দেয়।’ চার দশক ধরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানে ঠিক সেই কাজটিই করে গেছেন।
১ দিন আগে