লেবাননে ইসরায়েলের হামলার এবারের ধরন দেখে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দেশটি সেখানে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাচ্ছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যাঞ্চলে থাকা রাজধানী বৈরুত এবং তার কিছুটা উত্তর-পূর্বে থাকা বেকা উপত্যকা অঞ্চলে ক্রমাগত বোমা হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব জায়গার পাশাপাশি সর্বশেষ বৈরুতের মধ্যাঞ্চল থেকেও লোকজনকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকেরা এর মধ্যে ইসরায়েলের নতুন অভিসন্ধি দেখতে পাচ্ছেন।
মনে করা হচ্ছে, লেবাননের সাধারণ মানুষ থেকে প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে তাদের দুর্বল করাই ইসরায়েলের লক্ষ্য। সেই সঙ্গে একে দেশটির ভূখণ্ড দখল করার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখছেন অনেকে। ইসরায়েলের গত কয়েক দিনের টানা হামলায় লেবাননে ইতিমধ্যেই নারকীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ লাখের বেশি মানুষ হয়েছে বাস্তুচ্যুত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায় ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহ। ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পর উভয় পক্ষই এত দিন নিশ্চুপ ছিল। কিন্তু ২ মার্চ হিজবুল্লাহর রকেট হামলা খেপিয়ে তোলে ইসরায়েলকে। এই হামলার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে উল্লেখ করে হিজবুল্লাহর ঘাঁটি লক্ষ্য করে লেবাননে একাধারে বিমান ও স্থল অভিযান চালাতে শুরু করে দেশটি। তারা হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন আছে এমন এলাকার বাসিন্দাদের লিতানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। লেবানন সীমান্তেও প্রচুর সেনা ও ট্যাংক মোতায়েন করেছে ইসরায়েল ।
লেবাননের বিশ্লেষক ও লেখক মাইকেল ইয়াংয়ের মতে, ইসরায়েল হয়তো লেবাননের ‘জনসংখ্যাগত মানচিত্র নতুনভাবে আঁকার’ চেষ্টা করছে। তাঁদের প্রত্যাশা, এতে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাবে এবং সংগঠনটির সঙ্গে সমর্থক জনগোষ্ঠীর সম্পর্কও দুর্বল করা যাবে।
নতুন দখলদারত্বের আশঙ্কা
লেবাননের জনগণের মধ্যে এ আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ইসরায়েল এবার হয়তো আর সেনা প্রত্যাহার করবে না। যদিও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘ মেয়াদে ওই অঞ্চল দখলে রাখা ইসরায়েলের জন্য কঠিন হবে।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাবিহ দানদাশলি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে এটি ইসরায়েলের স্বার্থের অনুকূল নয়। তারা যদি দখলদারত্ব বজায় রাখে, তাহলে হিজবুল্লাহর মতো আরেকটি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠবে।
এর আগে ১৯৮২ সালে ইসরায়েল লেবাননে আক্রমণ চালিয়ে এর দক্ষিণাঞ্চল দখল করে। ইসরায়েলি সেনারা প্রায় ১৮ বছর সেখানে অবস্থান করে। পরে হিজবুল্লাহর সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে তারা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল অঞ্চলটিকে নিজেদের প্রভাব বলয়ের অধীনে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করছে। এর প্রভাব লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপরও পড়তে পারে।
মাইকেল ইয়াং বলেন, এবারের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসরায়েল হয়তো লেবাননের ওপর বেশ কিছু রাজনৈতিক শর্ত চাপিয়ে দেবে, যাতে দেশটিতে তাদের আধিপত্য আর ক্ষমতা সুরক্ষিত থাকে।
এই শর্তগুলোর মধ্যে বিতর্কিত আব্রাহাম চুক্তির মতো কোনো ‘শান্তিচুক্তি’ চাপিয়ে দেওয়া বা একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির বিষয়ও থাকতে পারে।
হিজবুল্লাহর সমর্থকদের বিচ্ছিন্ন করা
দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহ লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র শক্তি। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ২০২৩-২৪ সালের যুদ্ধে সংগঠনটি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। ইসরায়েল শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ তাদের বেশির ভাগ সামরিক নেতৃত্বকে হত্যা করে।
লেবানন সরকার সংগঠনটিকে নিরস্ত্র করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্প্রতি তাদের সামরিক কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন হিজবুল্লাহর দুর্বল অবস্থার সুযোগে ইসরায়েল ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুতির কৌশল ব্যবহার করছে। দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকার কিছু অংশ এবং বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল—এই তিন এলাকা হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থন-ভিত্তি। ৫ মার্চ ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননের সব বাসিন্দাকে লিতানি নদীর উত্তরে চলে যেতে বলে। পরদিন বৈরুতের দক্ষিণের দাহিয়েহ এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মাইকেল ইয়াং বলেন, দাহিয়েহ পুরোপুরি খালি করে দেওয়ার চেষ্টা নতুন এক ঘটনা। এটি হিজবুল্লাহ ও তাদের সমর্থক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক দুর্বল করার কৌশল হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ
বৈরুতের লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমাদ সালামেই বলেন, দক্ষিণ লেবানন, বেকা উপত্যকা ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল থেকে মানুষ সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল কার্যত নতুন জনসংখ্যাগত বাস্তবতা তৈরি করছে। এর ফলে নতুন করে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটবে। এটি আশ্রয়দাতা দেশ বা জনপদ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগেই প্রায় ৬৪ হাজার লেবাননি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। অনেকেই তিন বছর ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। এমনকি যুদ্ধ শেষ হলেও দক্ষিণ লেবাননের অবকাঠামো ও অর্থনীতি এতটাই ধ্বংস হয়েছে যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বহু বছর সময় লাগতে পারে।
রাবিহ দানদাশলি বলেন, দক্ষিণ লেবাননের একজন ৬০ বছর বয়সী মানুষ হয়তো জীবনে ছয়-সাতটি যুদ্ধ দেখেছেন এবং তিনবার ঘরবাড়ি নতুন করে তৈরি করেছেন। এই বয়সে আবার শুরু করা তাঁর জন্য কতটা সম্ভব?
রাবিহ দানদাশলির মতে, অনেক মানুষ হয়তো আর গ্রামে ফিরে যাবে না। যারা নতুন জায়গায় কাজ, জীবন ও সন্তানদের স্কুলের ব্যবস্থা করে ফেলেছে, তারা হয়তো স্থায়ীভাবে সেখানেই থেকে যেতে পারে।
এভাবেই দীর্ঘ মেয়াদে লেবাননের জনসংখ্যা, রাজনীতি এবং প্রতিরোধ রাজনীতির চেহারাই হয়তো বদলে যাবে ইসরায়েলের কূটকৌশলে।

পেন্টাগন এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয়ের কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই বিপুল ব্যয় মার্কিন ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৬ ঘণ্টা আগে
ইরান অতীতে যুদ্ধের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি বা ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করত। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব সেই পথ থেকে সরে এসেছে। পিনফোল্ড ব্যাখ্যা করেন, ইরান এখন যতটা সম্ভব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে পুরো অঞ্চল এবং বৈশ্বিক বাজারকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।
৮ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সঙ্গে যে আচরণ করেছিল, তা যেন সেই কুখ্যাত জ্যাকেটের স্লোগানেরই প্রতিধ্বনি। যে জ্যাকেট একসময় ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প পরেছিলেন, ‘আমি আপনাকে পুছি না। আপনি কেন পুছেন?’ ট্রাম্প প্রশাসন শুধু যে জোটভিত্তিক কৌশলকে উপেক্ষা করেছে, তা-ই নয়। ১৯৯০–৯১ সালের
১২ ঘণ্টা আগে
বছরের পর বছর ধরে ইরানের রেজিমবিরোধী গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকেরা ধারণা করে আসছিলেন, সম্প্রতি হত্যাকাণ্ডে নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির খুব কম দেখা দেওয়া ছেলে মুজতবা হোসেইনি খামেনি হয়তো একদিন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদে বসতে পারেন।
১৮ ঘণ্টা আগে