Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই এর নিবন্ধ /ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করলে ইরানের পাশে দাঁড়াবে কি চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

গত বছরের শেষ দিকে ইরানের বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটি আবারও দেশব্যাপী অস্থিরতার কবলে পড়ে। অর্থনৈতিক চাপ, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর তৈরি হওয়া গভীর রাজনৈতিক অবসাদের এক সংমিশ্রণ থেকে এই অসন্তোষের সূত্রপাত। এই অস্থিরতা মোটেও স্বতঃস্ফূর্ত বা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল না।

ইরানি সমাজ আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং দেশের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার চাপে পিষ্ট হচ্ছিল। এই বিক্ষোভ শুধু শাসনব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই ছিল না, বরং চরম এক নাজুক মুহূর্তে ইরানের কৌশলগত অবস্থান নিয়েও উদ্বেগের প্রতিফলন ছিল।

বেইজিং থেকে এই ঘটনাগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, তবে কোনো আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়া ছাড়াই। চীনা বিশ্লেষকেরা এই বিক্ষোভকে কোনো বৈপ্লবিক মুহূর্ত হিসেবে না দেখে বরং ১২ দিনের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতার ধারাবাহিকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের বিশ্লেষণে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং বাইরের সামরিক চাপ মূলত একই ঘটনার দুটি রূপ: ইরান রাষ্ট্রের ওপর চালানো ক্রমাগত বলপ্রয়োগ।

চীনের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা তত্ত্ব এবং ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি, যা পশ্চিমা বর্ণনার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পশ্চিমারা এই বিক্ষোভকে সরকার পরিবর্তনের এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ হিসেবে তুলে ধরলেও চীন তা মনে করেনি। চীনের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই বিক্ষোভ ভৌগোলিক দিক থেকে ব্যাপক হলেও সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে ছিল সীমিত। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনেকগুলো নগরকেন্দ্রে বিক্ষোভ হলেও—কয়েকটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত বাদে—কোনো একটি স্থানেই বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ায়নি।

তাদের সিদ্ধান্ত ছিল সোজাসাপ্টা—বিক্ষোভকারীরা সোচ্চার, দৃশ্যমান এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ছিল ঠিকই, কিন্তু তারা জনতাত্ত্বিক বা সাংগঠনিকভাবে রাষ্ট্রকে বিপর্যস্ত করার মতো অবস্থায় ছিল না। বেইজিংয়ের হিসাবে প্রতীকের চেয়ে সংখ্যার গুরুত্ব বেশি, আর এই সংখ্যাটি বর্তমান ব্যবস্থার পতনের ইঙ্গিত দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না।

চীনা বিশ্লেষকেরা ইরানি কর্তৃপক্ষের একটি মূল যুক্তিকে প্রতিধ্বনিত করেছেন। তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং নৈরাজ্যবাদী সহিংসতার মধ্যে পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, গণতান্ত্রিক হোক বা একনায়কতান্ত্রিক—কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাই সশস্ত্র গোষ্ঠী, সরকারি স্থাপনায় হামলা বা পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত সহ্য করে না।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে—দাঙ্গা দমনকে আদর্শিক নিপীড়ন হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে দেখা হয়। এই ব্যাখ্যা চীনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ কারণেই বেইজিং ইরানি বিক্ষোভকে আন্তর্জাতিকীকরণের আহ্বানে বিন্দুমাত্র সহানুভূতি দেখায়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের সামরিক ও নীতি বিশেষজ্ঞরা এই বিক্ষোভকে স্রেফ বিচ্ছিন্ন কোনো অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবে দেখেননি; বরং একে গত গ্রীষ্মের ১২ দিনের যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক আফটারশক বা উত্তরাঘাত হিসেবে গণ্য করেছেন। অবকাঠামো ধ্বংস, ইসরায়েল ও আমেরিকার হামলার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং নতুন করে যুদ্ধের স্থায়ী আতঙ্ক—সবকিছুই সামাজিক অস্থিরতায় ভূমিকা রেখেছে।

তাদের মতে, ইরানের এই অস্থিরতা শুধু যে বর্তমান শাসনব্যবস্থার দুর্বলতার প্রমাণ তা নয়, বরং এটি সামরিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে একযোগে চাপে রাখার জন্য পরিকল্পিত বাইরের চাপের ফলাফল। এই মূল্যায়ন থেকেই চীন নতুন কোনো সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা বিচার করছে। চীনের নিরাপত্তা মহল ক্রমবর্ধমানভাবে মনে করছে, ইরানে ইসরায়েল বা আমেরিকার নতুন হামলা আসন্ন।

বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, ইরানের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, পরমাণু স্থাপনায় পরিদর্শকদের সীমিত প্রবেশাধিকার এবং ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো ইরানের প্রতিপক্ষদের জন্য আগাম হামলার জোরালো অজুহাত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ১২ দিনের যুদ্ধের পর সামরিক ভারসাম্যের খুব একটা পরিবর্তন ঘটেনি।

বেইজিংয়ের মতে, ইরান এবং ইসরায়েল উভয়ের কাছেই ২০২৫ সালের জুনের আগের মতোই প্রায় একই ধরনের আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক সক্ষমতা রয়েছে। ইরান বিমান প্রতিরক্ষা ও বিমান শক্তিতে দুর্বল থাকলেও তাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা টিকে আছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্ব এবং নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও তারা স্যাচুরেশন অ্যাটাকের কাছে এখনো নাজুক।

ফলে চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আরেকটি যুদ্ধ শুরু হলে তার ফলাফল খুব একটা আলাদা হবে না, কেবল ধ্বংসলীলা ও তীব্রতা বাড়বে। তাদের যুক্তি, পরবর্তী সংঘাত সম্ভবত আরও নৃশংস, আরও ধ্বংসাত্মক এবং নিয়ন্ত্রণে আনা আরও কঠিন হবে, যার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

এই সম্ভাবনা বেইজিংকে আতঙ্কিত করে। তবে তা তেহরানের সঙ্গে কোনো আদর্শিক মিলের কারণে নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রধান লক্ষ্য হলো একটি পূর্বাভাসযোগ্য পরিবেশ: জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক পথের সুরক্ষা এবং ক্রমপ্রসারমান সংঘাত এড়ানো। ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে একটি বড় আকারের যুদ্ধ শুরু হলে এবং তাতে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেন বা উপসাগরীয় দেশগুলো জড়িয়ে পড়লে চীনের এই তিনটি স্বার্থই হুমকিতে পড়বে।

তা সত্ত্বেও, সামরিক কোনো ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ইচ্ছা চীনের নেই। চীনের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট। বেইজিং ইরান ও পুরো অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা সমর্থন করে, সরকার পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এবং বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে। তারা সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখে এবং ইরানকে এ ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করে।

তবে তাদের এই সমর্থন কঠোরভাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরেই সীমাবদ্ধ। চীনের ইচ্ছা নেই ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর, কিংবা যুদ্ধ শুরু হলে কোনো সামরিক সহায়তা দেওয়ার। এই অবস্থান নীতি এবং বাস্তববাদ—উভয়কেই প্রতিফলিত করে। ইরানের পক্ষে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করা মানে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া, যা চীনের বৃহত্তর বৈশ্বিক কৌশলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে রাজনৈতিকভাবে বেইজিং বর্তমান সরকারগুলোর পাশে থাকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, কারণ তারা একে বাইরের ইন্ধনে তৈরি অস্থিতিশীলতা হিসেবে দেখে। চীনের দৃষ্টিতে, ইরান বা অন্য কোথাও সরকার পরিবর্তন মানেই হলো বিশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র নয়।

অর্থনৈতিক চাপ এই অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের মার্কিন সিদ্ধান্তকে বেইজিং দেখছে চীনের সঙ্গে আমেরিকার বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে। চীনা নীতিনির্ধারকেরা এই পদক্ষেপকে কেবল ইরান-কেন্দ্রিক নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখছেন না, বরং একে চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব খর্ব করার ওয়াশিংটনের আরেকটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

এর ফলে বেইজিং মনে করে না যে, এই শুল্ক চীন-ইরান সম্পর্কে বড় ধরনের কোনো ফাটল ধরাবে। বাণিজ্যের ধরন বদলাতে পারে বা পথ পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু কৌশলগত সমীকরণ অটুট থাকবে। ইরানের বর্তমান সংকটের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গি রোমান্টিকও নয়, আবার নিছক নিন্দুকসুলভও নয়। এটি অত্যন্ত শীতল ও নিয়মতান্ত্রিক। বেইজিং দেখছে এমন এক বিক্ষোভ যার পেছনে পর্যাপ্ত জনবল নেই, দেখছে চাপের মুখে থাকা এমন এক শাসনব্যবস্থা যার পতন আসন্ন নয় এবং দেখছে ধেয়ে আসা এমন এক যুদ্ধ যা সংশ্লিষ্ট সবার ক্ষতি করবে। চীন সংযমের আহ্বান জানাবে, হস্তক্ষেপের নিন্দা করবে এবং ব্যবসা চালিয়ে যাবে—পাশাপাশি সেই অস্থিরতার জন্যও প্রস্তুতি নেবে যা অন্যদের কারণে অনিবার্য হয়ে উঠছে বলে তারা বিশ্বাস করে।

বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে ইরান কোনো আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান নয়। এটি একটি উদাহরণের বিষয়। আর চীন বিশ্বাস করে, বিক্ষোভের চেয়েও বিপজ্জনক হলো এ ধরনের নজির তৈরি হওয়া।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এবার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ট্রেড বাজুকা’ নিক্ষেপের কথা ভাবছে ইউরোপ

ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করলে ইরানের পাশে দাঁড়াবে কি চীন

আজকের রাশিফল: খুনসুটি গভীর প্রেমে রূপ নেবে, মুখ থুবড়ে পড়ার হালকা যোগ আছে

শিগগির চালু হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, সক্ষমতা ৮.২ গিগাওয়াট

এলপিজির কারসাজিতে অসহায় জনগণ

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত