Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রতিপাদ্যে ন্যায়বিচার, বাস্তবে কাটছে না আতঙ্কের মেঘ

কাশফিয়া আলম ঝিলিক, ঢাকা 
আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রতিপাদ্যে ন্যায়বিচার, বাস্তবে কাটছে না আতঙ্কের মেঘ

‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার’—এ বছরের নারী দিবসের লক্ষ্যটি ঠিক এমন। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক নোটিশে অন্তত সেটি উল্লেখ করা হয়েছে। ইউএন উইমেনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিপাদ্যটি হলো ‘রাইটস, জাস্টিস, অ্যাকশন ফর অল উইমেন অ্যান্ড গার্লস’।

এর আলোকেই বাংলা প্রতিপাদ্যটি নির্ধারণ করা হয়েছে। আজকের পদক্ষেপ আগামীর ন্যায়বিচারের পথ দেখাবে—এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে উল্লিখিত প্রতিপাদ্যে। তাহলে হিসাব করতে হবে পদক্ষেপের। কিন্তু আমরা শুধুই ঘটনা আর ভুক্তভোগীর ছড়াছড়ি দেখতে পাচ্ছি সারা দেশে।

১ মার্চ সকালে সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ভেতরে থাকা সহস্রধারা ঝরনার আরও অন্তত ৫০০ মিটার উত্তরে পাহাড়ি পথের কাছ থেকে একটি শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তার গলা কেটে দেওয়া হয়েছিল। রক্তে ভিজে গিয়েছিল পুরো জামা। পরদিন সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নরসিংদীর মাধবদীতে ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ১৫ দিন আগে চাচার বাসায় যাওয়ার পথে স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত কয়েকজন তাকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে। পরিবারের দাবি, মামলা প্রত্যাহার না করায় কিশোরীর বাবাকে মারধর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মেয়েকেও অপহরণ করা হয়। রাতভর নির্যাতনের পর সকালে এক নির্জন স্থানে কিশোরীর লাশ পাওয়া যায়। এর বিরুদ্ধে করা মামলায় এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এর ভবিষ্যৎ কী, তা জানা নেই কারও।

এভাবেই যখন ন্যায়বিচার ঝুলে থাকে, তখন অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যায়। সীতাকুণ্ডের সেই কন্যাশিশু কিংবা নরসিংদীর সেই কিশোরী—কারও জীবনের পরিণতি এমন হওয়ার কথা ছিল না। তাদের দুজনেরই নিরাপদে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। আর এটিই তাদের অধিকার।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ন্যায়বিচার সব সময়ের জন্য হতে হবে। এই ন্যায়বিচার শুধু নির্যাতনের বিরুদ্ধে নয়। এই ন্যায়বিচার অধিকারের পক্ষে। নারীর শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক সব অধিকার নিশ্চিত হতে হবে। অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নারীকে সব সময় সোচ্চার থাকতে হবে।’ তিনি জানান, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির পক্ষ থেকে এবার নারী দিবসের মূল বক্তব্য, নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় বৈষম্য নিরসন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা দেশে অন্তত ৩২ জন নারী ও কন্যাশিশু হত্যার শিকার হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৯টি কন্যাশিশু, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১৮৩ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঘটনার বাইরেও অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। সেগুলো কখনো আইনের কাছে পৌঁছায় না। আবার কখনো সমাজের ভয়ে চাপা পড়ে থাকে।

এদিকে মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) ‘মানবাধিকার পরিস্থিতি মনিটরিং’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী। সে মাসে ৮ কিশোরী এবং ২৭ নারী আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৫ জন নারী ও শিশু, যাদের মধ্যে ২৬ জন শিশু-কিশোরী। সংগঠনটি দাবি করেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের উচ্চহার একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সংকট নির্দেশ করে।

নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার মূল কারণ বিচারহীনতা। দেশে কিশোরী ও নারীরা শিক্ষাঙ্গনে, বাসে, ট্রেনে, অটোরিকশায় এমনকি নিজ ঘরে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ২৫৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৩৩টি, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ১২টি, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ৫টি। এগুলোর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ছয়জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ধর্ষণের শিকার ৩৩ জনের মধ্যে ৭ শিশু ও ৮ জন কিশোরী রয়েছে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯ জন নারী ছাড়াও ২ শিশু ও ১ কিশোরী। একই মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে ২ শিশু ও ৩ কিশোরী। একই মাসে ধর্ষণের চেষ্টা ১২টি, যৌন হয়রানি ১১টি, শারীরিক নির্যাতনের ৬৩টি ঘটনা ঘটেছে। অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হন একজন নারী।

এখনো এ ধরনের ঘটনায় কোথাও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে না। নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যও হয়তো শুধু ছাপা অক্ষরের লেখা হয়ে থেকে যাবে।ন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত