
এবারের পয়লা বৈশাখে আনন্দ নয়, মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে, বলেছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার। মিডিয়ায় এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রচারিত ও প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখে চারুকলা অনুষদ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়েছে। এই মঙ্গল শোভাযাত্রার নেপথ্যে যে চেতনা বা বোধ জাগ্রত থেকেছে বা থাকে তা হলো, নতুন বাংলা বছরের জন্য শান্তি, সম্প্রীতি, কল্যাণ তথা মঙ্গল প্রার্থনায় এক অসাম্প্রদায়িক উৎসব উদ্যাপন। চারুকলার শিক্ষার্থী, দেশের বরেণ্য শিল্পী দ্বারা শান্তি, সম্প্রীতি ও মঙ্গলের প্রতীকী ছবি, দেশীয় প্রাণীর প্রতিকৃতি, মাথাল, ট্যাপা পুতুল ইত্যাদি তৈরি করে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা উদ্যাপিত হয়। বলা বাহুল্য, সব ধর্ম-বর্ণের নারী, পুরুষ, শিশুদের অংশগ্রহণে পয়লা বৈশাখ দেশীয় সংস্কৃতির, ঐতিহ্যের এক মহা স্বাক্ষর বহন করে। বাঙালিরা পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে প্রাণের যাত্রা—পোশাক-আশাকে, অভিব্যক্তিতে। চিরন্তন এই আয়োজনে ছেদ পড়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আমলে।
এই অন্তর্বর্তী সরকার এসে দেশের বিভিন্ন সেক্টরের সংস্কারের মতো পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় সংস্কার টেনে আনে। সংস্কার হলো—মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তারা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামকরণ করে। এই নামকরণের নেপথ্যে মৌলবাদী চেতনা, ধ্যান-ধারণার যে প্রভাব সক্রিয় ছিল, তা কারোর পক্ষে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এটা নিয়ে জনমনে ছিল অস্বস্তি, অশান্তি। সেই সঙ্গে বিস্ময়। বিস্ময়কর অনুভূতির নেপথ্যে ছিলেন সেই সময়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেরই একজন ব্যক্তিত্ব। যাঁকে অতীতে বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতি নিয়ে অনেক কাজ করতে দেখা গেছে। কাজের জন্য তিনি প্রশংসিতও হয়েছেন। এমন একজন ব্যক্তি ক্ষমতায় উপবিষ্ট হয়ে কী করে তাঁর চেতনার রূপ বদলে ফেলতে পারেন! নাকি তিনি প্রকৃতভাবেই ভিন্ন চেতনার একজন ছিলেন, যা তাঁর মুখোশের কারণে কেউ বুঝতে পারেনি, উপলব্ধি করেনি?
যাহোক, সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেছেন, এবার পয়লা বৈশাখে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হবে। বাংলা ও বাঙালি সংস্কৃতির জন্য এ এক সুসংবাদ এবং ঐতিহ্য বহন করা আয়োজনের মহাপ্রস্তুতির পূর্বাভাস তো বটেই। ইতিমধ্যে চারুকলা অনুষদে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিচ্ছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, যেখানে পরিবেশন হবে বাংলা সংস্কৃতির নানা ধরনের সংগীত, নাচ, নাটক ও আহারের আয়োজন।
কেন মঙ্গল শোভাযাত্রাকে আনন্দ শোভাযাত্রার নামকরণ দেওয়া হলো? এই প্রশ্নের জবাব হয়তো পরিবর্তনকারীরা ভালো বলতে পারবেন। তবে সাধারণ মানুষ যেটা বুঝে নিয়েছে সেটা হলো, মৌলবাদী চেতনার কারণে মঙ্গল শব্দের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। ‘মঙ্গল’ শব্দের ভেতর ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মের গন্ধ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক চেতনার চরম বহিঃপ্রকাশ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি অনেকটাই হুমকির মুখে ছিল। যেটা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়। সেই সময়ে শিল্পীদের, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে বিদ্রূপের মুখে পড়তে হয়েছে, হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। সরকার ব্যর্থ হয়েছে এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। উপরন্তু মৌলবাদী চেতনাকে সমর্থন দিয়েছে বিভিন্ন কার্যকলাপের মাধ্যমে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়। সাধারণ জনগণ শঙ্কিত ছিল তাদের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের সুরক্ষা নিয়ে।
শুধু বাংলা সংস্কৃতি নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন নিয়েও ছিল বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন, যা ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অনেকেই মনে করে। তাদের মনে সংশয়—বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়বেই যদি তাহলে ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেন হলো? কিংবা ছাত্র-জনতা যেখানে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, সেখানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি কেন সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে? তাহলে কি গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন বা অন্য কিছু? কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক রয়েছে? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করে দেয় জনমনে। ফলে সাধারণ জনগণ শঙ্কা নিয়ে প্রত্যক্ষ করে চলে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।
সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা বেশি ঘটেছে। নারীর আচার-আচরণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের অপতৎপরতা চালিয়েছে একটা ধর্মীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী। তারা হয়তো ভেবে নিয়েছিল যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা জয়ী হতে যাচ্ছে নির্বিঘ্নে। ফলে দীর্ঘদিনের লালিত ইচ্ছাটাকে ধর্মীয় অজুহাতে নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করেছে। নারীরা ঘরে অবস্থান করলে তাদের রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হবে কিংবা নারীর কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা হবে ইত্যাদি বক্তব্য দিয়ে নারীকে অবমূল্যায়ন ও অবমাননা করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। নারীর প্রতি এই যে বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার প্রতি তাদের যে বিরূপ মনোভাব, তার সঙ্গে বেশ মিলে যায়। জনগণ তা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারে। ফলে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের, তা অনেকটাই অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে পড়ে।
গণতান্ত্রিক সরকার গঠন মানেই হলো, রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জয়ী হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় আসীন হওয়া; ক্ষমতা ভোগ নয়, বরং জনগণের স্বার্থে সরকারকে সুশাসনের দিকে ধাবিত করা; যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব ভৌগোলিক সীমারেখা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও সংবিধান সুরক্ষিত করবার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সব রাজনৈতিক দলের আদর্শ যেন দেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে সুরক্ষিত রাখার প্রত্যয়ে উজ্জীবিত থাকে, সেই দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও সেটা যেন দেশের স্বার্থবহির্ভূত না হয়, অস্তিত্ব সংকটের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেই দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আবার বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা হলো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হেয় করার অপচেষ্টা এবং অপশক্তি প্রবেশের পথকে প্রশস্ত করা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিক ও প্রকৃতভাবে উপস্থাপন না হলে জাতীয় ঐক্য যেমন তৈরি হবে না, তেমন করে সবার ভেতর দেশপ্রেম নামক চেতনার স্থায়ী বসতি গড়ে উঠবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন, দ্বিমত, বিতর্ক রয়ে গেছে, যা উত্তরসূরিদের ইতিহাস সম্পর্কিত বিভ্রান্তি তৈরিতে যুগ যুগ ধরে সহায়ক হয়েছে। এতে সুযোগ নিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী, যারা এখনো বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে চিন্তা করে, চিন্তা করতে ভালোবাসে।
অস্ত্র নয়, একটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও তার আচার-আচরণ জনগণের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি, শৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। পৃথিবীজুড়ে এমন নজির অসংখ্য। যত বেশি নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ থাকবে, তত বেশি দেশপ্রেম জাগ্রত হবে। দেশকে জানার, বোঝার অন্যতম মাধ্যম হলো সেই দেশের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের জন্য নয়, সংস্কৃতি একটি দেশের পরিচিতির অন্যতম দিক। বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ—দেশে অপশক্তিকে রুখতে, দেশের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত করতে নিজস্ব সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ আরও বেশি করে তৈরি করুন। বাংলা ও বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি সমুন্নত না হলে জনগণের মধ্যে বিভাজন তৈরির প্রবণতা দেখা দেবে, যেটা করবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি অথবা বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তারকারী যেকোনো দেশ।
নববর্ষ সবার ভেতর বয়ে আনুক দেশ ও তার ঐতিহ্যকে ভালোবাসার অনুপ্রেরণা—সেই কামনা।

সরকার বলছে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। তাই বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও আমাদের দেশে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। এটা স্বস্তিদায়ক খবর বলে মনে হতে পারে। তাহলে কেন জ্বালানি তেল না পেয়ে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না জেলেরা? তেলের দাবিতে বরগুনা সদরের বদরখালী ইউনিয়নের বাওয়ালকর খেয়াঘাট এলাকায় নৌকা...
১৮ ঘণ্টা আগে
নির্বাচনের পর দেশ এখন গণতান্ত্রিক পথ ধরে চলার চেষ্টা করছে। সংসদ বসেছে, তাতে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে টালবাহানার আপাত অবসান হয়েছে, সংবিধান-বিষয়ক বিতর্ক চলমান—এ ধরনের কিছু ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে মবতন্ত্রের যে অবিশ্বাস্য ‘সাফল্য’ এসেছিল, তা থেকে দেশ চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
১৮ ঘণ্টা আগে
প্রতিবছর উৎসবের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় কিছু পরিবারের জন্য। এবারের ঈদুল ফিতরেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, এবার ঈদের আগে-পরে ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
২ দিন আগে
ইরান যুদ্ধের এক মাস পার হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বোঝা যাচ্ছে না। দিন যত যাচ্ছে, পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে বিশ্ববাজার অস্থির। খোদ মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোই জানিয়েছে, ইরানের সরকারের চেয়ে দেশটির তেলে নজর বেশি ট্রাম্পের। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আরেকটু এগিয়ে...
২ দিন আগে