
স্বাধিকার আন্দোলনটি ছিল গোটা জাতির। এ কথা না বোঝার কোনো কারণ নেই যে পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও ঘৃণার শিকার হয়েছিল সে সময়ের পূর্ব বাংলার মানুষ। পাকিস্তানি জেনারেলদের বইগুলো পড়লেই পরিষ্কার হবে, বাঙালি সম্পর্কে কত ধরনের উদ্ভট ধারণা ছিল তাদের। সবচেয়ে বড় যে সংকটটি ছিল, তা হলো, পশ্চিম পাকিস্তানিরা নিজেদের আশরাফ হিসেবে সম্মান করত আর বাঙালিদের ভাবত আতরাফ। বাঙালিদের ভাবত হিন্দু-ঘেঁষা। শিক্ষায়তনগুলোয় হিন্দু শিক্ষকদের আধিক্যের কারণে বাঙালি মস্তিষ্কগুলো হিন্দুত্বে ঠাসা—এ রকম ভাবনাও ছিল তাদের মনে। ফলে পাকিস্তানি শাসক চক্র ২৩ বছর ধরে বাঙালিদের অবজ্ঞা করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। ঘৃণা করেছে বললেও ভুল হবে না।
পাকিস্তানি দালালদের অনেকেই বলার চেষ্টা করে থাকে, আইয়ুব খানের আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উন্নয়নের ঘনঘটা ছিল। সে সময় উন্নয়ন হয়েছে, কথাটা মিথ্যে নয়। মিথ্যেটা রয়েছে পশ্চিম পাকিস্তান আর পূর্ব পাকিস্তানে তুলনামূলক উন্নয়নের চিত্রটি তুলে না ধরার মধ্যে। অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ অগ্রাহ্য করার মধ্যে।
অর্থনীতির সে হিসাবটা একটু তুলে ধরা প্রয়োজন। বলা হয়ে থাকে, পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার চেয়ে বাজারের আকার বড় হওয়ায় সেখানে অর্থনৈতিক বিকাশ দ্রুত হারে ঘটে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ১৯৪৯-৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি ছিল ১২৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ১২০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে সময় রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস ছিল পূর্ব বাংলা। ১৯৪৮-৪৯ ও ১৯৫৪-৫৫ সালের মধ্যে অর্জিত সব বৈদেশিক মুদ্রার ৫১.৫ শতাংশ আসে পূর্ব বাংলার রপ্তানি থেকে। পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থনৈতিক বিকাশে পূর্ব পাকিস্তানের অবদানের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পাকিস্তানের শুরুতে যখন অনিয়ন্ত্রিত আমদানি হতো, তখন দেখা গেছে আমদানিকৃত পণ্যের ৭০ ভাগই ব্যয় হচ্ছে দেশের পশ্চিম অংশে। দেশের দুই অংশের মধ্যে যে রাজনৈতিক সংঘাত চলছিল, তার একটি বড় কারণ হলো সরকারি উন্নয়ন ব্যয় বণ্টনে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি পক্ষপাত। পূর্ব বাংলা যে সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে, সে কথা জাতীয় সংসদের বিতর্কেও উঠতে থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন, কথাগুলোর সত্যতা পান কি না।
আসুন, অর্থনীতির জায়গাটা আরও একটু খোলাসা করি। ১৯৫০-১৯৫৫ সালে প্রাক্-পরিকল্পনা আমলে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান পায় ২০০ কোটি টাকা, পূর্ব বাংলা পায় মাত্র ৭০ কোটি টাকা। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পূর্ব বাংলা পায় সরকারি ব্যয়ের মাত্র ৩০ শতাংশ। এই যে পক্ষপাতমূলক নগ্ন আচরণ, তাতেই পরিষ্কার হয়ে যায়, পাকিস্তান নামক দেশটি টেকার জন্য আসেনি। ব্রিটিশ শোষণ ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের পরিচালিত শোষণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। সে সময় থেকেই বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা এই পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রতিবাদ করতে থাকেন, যার প্রকাশ দেখা যায় রাজনৈতিক আন্দোলনেও।
আর একটি উদাহরণ দিয়ে আমরা বুঝিয়ে দিতে পারব, আইয়ুব খান পূর্ব বাংলার মানুষকে কোনো দয়া করেননি। পশ্চিম পাকিস্তানের চাহিদা মিটিয়ে তারপর উচ্ছিষ্টটুকু দিয়েই পূর্ব বাংলার ‘উন্নয়ন’-এর দায় সেরেছেন। ১৯৫১-৫২ এবং ১৯৫৯-৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মাথাপিছু যে উন্নয়ন ব্যয় ছিল, তা পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে ৩.৫ থেকে ৫ গুণ কম। কেন? জনসংখ্যা কি কম ছিল পূর্ব পাকিস্তানের? রপ্তানি আয় কি কম ছিল? তাহলে?
আইয়ুব শাসনামলের আরেকটু পরের দিকে আসা যাক। বলা যাক, ১৯৬৪-৬৫ সালে মোট উন্নয়নমূলক সরকারি ব্যয়ের কথা। হ্যাঁ, আইয়ুবের এই উন্নয়নের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি উন্নয়নমূলক ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩১ ভাগ। সরল পাটিগণিতের নিয়মে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছে ৬৯ ভাগ। এরপরও যারা ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ বলে পাকিস্তানি জেনারেলদের মহিমাকীর্তন করেন, তারা স্বভাবে পাকিস্তানিদের দালাল, আর কিছু নয়। সে রকম দালাল এখন আবার বাড়ছে, তার মূল কারণ হলো, মুক্তিযুদ্ধের মহিমা বোঝানোর কোনো পথ কোথাও খোলা রাখা হয়নি। না রাজনীতিতে, না সংস্কৃতিতে, না অর্থনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা স্থান পেয়েছে। বরং যে যার মতো করে স্বাধিকারের গল্প ফেঁদে বসেছে। সেই প্রেরণাহীনতার শূন্যতার মধ্য দিয়ে রাজাকারির চাষবাস বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম বুঝতেও পারেনি, প্রতিশোধমূলক খেলা খেলতে গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মূল লক্ষ্য থেকেই সরে গেছে। একটার পর একটা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলেছে। আর তাই, স্বাধীনতার এত দিন পরেও স্বাধীনতাকে আপন করে নিতে পারেনি একদল মানুষ। মিথ্যার ফুলঝুরি ছুটিয়ে সেই দালালেরা তরুণদের বিভ্রান্ত করছে।
২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসে এসে দেখছি, বড় এক গাড্ডায় পড়ে গেছি আমরা। ইউনূস সরকারের অনৈতিক যত কর্মকাণ্ড প্রকাশিত হচ্ছে, ততই বোঝা যাচ্ছে, এই স্বাধীনতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে উল্টো রাজার দেশে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছিল বাংলাদেশে। ইউনূস সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশিত হলে তাদের কর্মকাণ্ড ও সেই কর্মকাণ্ডের জন্য জাতিকে কতটা মাশুল দিতে হবে, তা পরিষ্কার হবে। জাতির ভবিষ্যৎকে অযাচিত কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করার জন্য সেটা দরকার।
স্বাধীনতা দিবসে আমাদের গর্বের ইতিহাস নিয়ে কথা বলাই সংগত। বিগত ১৮ মাসে ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে অথবা ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে অনেকেই আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনকে হীরক রাজার কারবারে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। যাঁরা এই অভিসন্ধি চরিতার্থ করতে চেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত, সমাজে আদৃত মানুষও আছেন। কিন্তু যখন বোঝা গেছে, এই অভিসন্ধি মূলত বাংলার বীরত্বগাথার বিপরীতমুখী দুরভিসন্ধি, তখনই সতর্ক হতে হয়েছে। যতই স্পষ্ট হয়েছে মেটিকুলাস ডিজাইন, ততই বোঝা গেছে, জাতিকে স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়নি। বরং আন্দোলনে যুক্ত হওয়া লাখো মানুষ এই মেটিকুলাস ডিজাইনওয়ালাদের মাধ্যমে প্রতারিত হয়েছেন। অথচ গণ-আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখেছিল। ইউনূস সরকার তার পুরো শাসনকালে যে নজির স্থাপন করে গেল, তা বহুকাল ধরে আলোচিত হবে। আলোচিত হবে একটি স্বপ্নের মৃত্যু হিসেবে। কিছু গুটিবাজ মানুষের প্রতিক্রিয়াশীল কর্মকাণ্ডের স্মারক হিসেবে। জবরদস্তিমূলক মবতন্ত্রের জন্মদাতা হিসেবে।
বাংলার ইতিহাস যে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব নয়, এ কথাও অস্বীকার করার লাইনঘাট খুঁজেছে এই দুষ্টচক্র। একসময় চব্বিশকে একাত্তরের জায়গায় বসাতেও চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মানুষের সংখ্যা নিয়ে রঙ্গরসিকতা করেছে, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে, সংবিধান অনুসারে শপথ নিয়ে এদেরই কেউ কেউ সংবিধানের নির্দেশ ভঙ্গ করেছে। এইসব ষড়যন্ত্র থেকে উত্তীর্ণ হতে হবে জাতিকে। ইতিহাসকে চলতে দিতে হবে তার নিজস্ব পথে। তার চেয়েও যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, নতুন দিনের নতুন মানুষ নিজের আত্মপরিচয় যেন ভুলে না যায়, তার ইঙ্গিত থাকতে হবে পঠনে-পাঠনে, সংস্কৃতিতে-জীবনচর্চায়।
বিএনপি এখন ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। নানা রকম অস্থিরতা কাটিয়ে সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি গঠনমূলক রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে। সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে বাঙালি জাতি সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। বিএনপিকে চলতে হবে খুবই সতর্ক হয়ে। স্বাধীনতা দিবসে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বলি তাঁদের দলের স্থপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ লেখাটি পড়ার জন্য। ইন্টারনেটেই সে লেখা পাওয়া যাবে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের ব্যাপারে তিনি কী বলেছিলেন, সেটা সেখান থেকে জানা যাবে। তিনি বাংলার দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন সে লেখায়। এবং স্বাধীনতা প্রশ্নে যা লিখেছেন, সেটাই এখানে উদ্ধৃত করছি, ‘৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রিন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে তা জানালাম না। বাঙালি ও পাকিস্তানি সৈনিকদের মাঝেও উত্তেজনা ক্রমেই চরমে উঠছিল।’ জিয়াউর রহমান তাঁর লেখাটি শেষ করেছেন এই কথাগুলো বলে, ‘তখন রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ। ১৯৭১ সাল। রক্তআখরে বাঙালির হৃদয়ে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে এই দিনটিকে। স্মরণ রাখতে ভালোবাসবে। তারা কোনোদিন ভুলবে না কো-নো-দি-ন।’
আমি যতটুকু জানি, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে কখনো কোনো কথা বলেননি। সৈনিক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই তিনি গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছিলেন। এবং ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন। সেই ইতিহাসও পাওয়া যাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের লেখা থেকে। সে-ও এক জ্বলন্ত ইতিহাস। উৎসুক পাঠক তাঁকে খুঁজে পাবে ইতিহাসের মধ্যেই।
স্বাধীনতা দিবসে দেশে শান্তি ফিরে আসুক। অহেতুক জনগণকে বিভ্রান্ত করার রাজনীতি বন্ধ হোক। রাজনীতি প্রবাহিত হোক জনকল্যাণে। এই কামনা আমাদের সবার।

২০২৬ সালের ১১ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। তাতে মোট আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট। এই বিপুল অঙ্কের বাজেট নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা, সমালোচনা...
৩ মিনিট আগে
জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর করার ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করার পর চট্টগ্রামের খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ত্বরিত এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানানো যেতেই পারে।
৮ মিনিট আগে
কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১ দিন আগে
মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা মূলত কৌতূহল, জ্ঞান, শ্রম ও উদ্ভাবনের সমন্বিত ফল। আগুন আবিষ্কার থেকে শুরু করে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) পর্যন্ত—প্রতিটি স্তরে মানুষ নিজের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছে।
১ দিন আগে