Ajker Patrika

পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে ভাবনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গঠিত সরকারের প্রথম বছরেই বড় পরিসরে দুটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নিয়ে পরীক্ষার্থী-অভিভাবক, এমনকি শিক্ষকদের মনেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। আমরা চাই ভালোয় ভালোয় পরীক্ষা সম্পন্ন হোক। কোনো মন্দ বা বেমানান দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে!

বিমল সরকার
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ২০
পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে ভাবনা
পরীক্ষার ফলাফলে কখনো বিপর্যয় ঘটেছে বোর্ডভিত্তিক, আবার কখনো বিভাগভিত্তিক। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাবলিক পরীক্ষা, তার ফলাফল নিয়ে এবং আরও স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাঝেমধ্যে যে কাণ্ডকারখানা দেখা যায়, তা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। এর মাশুল দিতে হয় লাখ লাখ শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ গোটা জাতিকে। ফলে বছরের পর বছর জাতির অপরিমেয় অর্থ, মেধা ও সময়ের অপচয় ঘটে থাকে। বিষয়টি নিয়ে সত্যিকার অর্থে সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৫৫ বছরে অনুষ্ঠিত এসএসসি-এইচএসসি ও সমমানের পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারে ব্যাপক ও অবিশ্বাস্য রকমের উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের শাসনামলে একেকটি পাবলিক পরীক্ষায় ৮০-৮২ শতাংশ, এমনকি কোনো কোনো বছর এরও বেশি পরীক্ষার্থী ফেল করেছে! অবশ্য ফল বিপর্যয়ের রকমফেরও রয়েছে। কখনো বিপর্যয় ঘটেছে বোর্ডভিত্তিক, কখনো আবার বিভাগভিত্তিক (মানবিক, বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষা)। এ ছাড়া কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে যেমন শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছে, তেমনি প্রতিবছর এমন অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন পরীক্ষার্থীও পাস না করার সংবাদ পাওয়া গেছে।

ফল বিপর্যয়ের নমুনা হিসেবে এখানে কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হলো—আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ‘ঐকমত্যের’ সরকারের (১৯৯৬-২০০১) আমলে সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। সাতটি বোর্ডের অধীনে পৌনে ৯ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করে গড়ে শতকরা ৩৫.২২ শতাংশ। গত বছর অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ফেল করে। ১০ বছর লেখাপড়া করার পর জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষার এমন ফলাফল খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ, স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দীর্ঘ সময় এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো কম হয়নি। কোমলমতি কিশোর-কিশোরীদের এ এক হতাশাজনক পরিণতি। ২০০১ সালে শতকরা হিসাবে বোর্ডভিত্তিক এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ঢাকা-৪৩.৫০, কুমিল্লা-৩০.৯৬, যশোর-৩৬.১৮, রাজশাহী-২৬.৭৪, চট্টগ্রাম-৪৪.৮৮, বরিশাল-৩৪.৮০ ও সিলেট বোর্ডে ৩৯.০৩ শতাংশ। পাসের হারে সর্বোচ্চ চট্টগ্রাম বোর্ডে ছিল ৪৪.৮৮ শতাংশ আর সর্বনিম্ন রাজশাহী বোর্ডে ছিল ২৬.৭৪ শতাংশ। একই চিত্র দেখা গেছে ২০০১ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও। সাতটি বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৯২৩ জন। পাস করেছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৮ জন। সাত বোর্ডে গড়ে পাসের হার ছিল ২৬.১১ শতাংশ। তার মানে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ফেল করেছে। কলেজ স্তরে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে দুই বছর পড়াশোনা করে এমন হতাশাজনক ফলাফল ভাবা যায়? এ কোন দুষ্টব্যাধির আঁচড় পড়েছিল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর? উল্লিখিত পরীক্ষায় বোর্ডভিত্তিক পাসের হার ছিল ঢাকা-৩৫.৩৯, রাজশাহী-২৪.৭৬, সিলেট-৩০.৬৩, কুমিল্লা-১৮.২৭, যশোর-৩৪.৬৪, চট্টগ্রাম-২৩.৮৮ ও বরিশাল বোর্ডে ১৮.৮৫ শতাংশ। ২০০১ সালের এসএসসির মতোই এইচএসসি পরীক্ষায়ও পাসের হারে ব্যাপক ব্যবধান লক্ষণীয়। সর্বোচ্চ ঢাকা বোর্ডের ৩৫.৩৯ শতাংশের বিপরীতে কুমিল্লা বোর্ডে সর্বনিম্ন ছিল ১৮.২৭ শতাংশ। ওই বছর পাসের হারের ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল। কোথায় ৩৫.৩৯ আর কোথায় ১৮.২৭ শতাংশ! এ যেন এক রাহুর দশা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো কার্যকর চেষ্টা কখনো করা হয়েছে কি?

অতীতে যেমনই হোক বিএনপির নেতৃত্বাধীন ‘জোট সরকার’ (২০০১-২০০৬) দায়িত্ব নিয়েই পাবলিক পরীক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেয়। প্রথম পরীক্ষাতেই ব্যাপক কড়াকড়ি দেখা গেছে। ফল প্রকাশ হলে দেখা যায়, ২০০২ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সাতটি বোর্ডে অংশগ্রহণকারী ১০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখই ফেল করে। পাসের হার গড়ে ছিল ৪০.৬৩ শতাংশ। বোর্ডভিত্তিক পাসের হার—যশোর-৫০.৭২, ঢাকা-৪৩.৮০, সিলেট-৪১.৯৭, রাজশাহী-৩৯.৯৪, চট্টগ্রাম-৩৭.৮০, বরিশাল-৩৬.৩৯ ও কুমিল্লা বোর্ডে ছিল ২৯.২৪ শতাংশ। কারণ যাই থাক না কেন এখানে যশোর বোর্ডে ৫০.৭২-এর বিপরীতে কুমিল্লা বোর্ডের ২৯.২৪ শতাংশ পাসের চিত্রটি আসলেই দুর্ভাগ্যজনক বলতে হবে।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় ছিল বিভাগভিত্তিক ফলাফলে যশোর বোর্ডে পাসের হার বিজ্ঞানে ৭৪.৬৩, মানবিকে ৪০.৯৬ ও ব্যবসায় শিক্ষায় ৫৭.১০ শতাংশ ছিল। অন্যদিকে কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার বিজ্ঞান ৩৬.৩৯, মানবিক ২৯.৬৫ ব্যবসায় শিক্ষায় ছিল ২৯.৭৩ শতাংশ। গ্রেডিং পদ্ধতিতে ফল প্রকাশের দ্বিতীয় বছরে কোন বোর্ডের কতজন জিপিএ-৫ পেল, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রশ্ন হলো, বোর্ডভিত্তিক বা বিভাগভিত্তিক এমন ফলাফলকে বিপর্যয় ছাড়া আর কী বলা যায়? আর বিপর্যয় বলা গেলে এর জবাবইবা কী।

২০০২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলকে বিপর্যয় নাকি মহাবিপর্যয় বলতে হবে? গড়ে পাস ২৭.১৯ শতাংশ ছিল। (২০০১ সালের তুলনায় সামান্য বেশি)। সাতটি বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৫৭০ জন। তাদের মধ্যে অংশগ্রহণ করে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ২৯৫ জন, পাস করে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮১৮ আর ফেল করে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ জন। বোর্ডভিত্তিক পাসের হার ছিল—ঢাকা-৩৬.৫৭, চট্টগ্রাম-২২.৩৫, রাজশাহী-১৮.১৮, যশোর-৩৮.৮৫, কুমিল্লা-১৭.১৩, বরিশাল-২২.৫৮ ও সিলেট বোর্ডে ২৮.৬৯ শতাংশ। সর্বোচ্চ যশোর বোর্ডে ৩৮.৮৫-এর তুলনায় কুমিল্লা বোর্ডে ১৭.১৩ শতাংশ পাসের হার অর্ধেকেরও কম; এমন পরিস্থিতি কি ভাবা যায়? নাকি এটা স্বাভাবিক কোনো বার্তা ছিল? ২০০২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সংবাদটিতে একটি জাতীয় দৈনিক উল্লেখ করে—নকল প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় এক লাখ বহিষ্কৃত হয় এবং পরীক্ষা চলাকালে আরও ৪০ হাজারের মতো পরীক্ষা বর্জন করে (সূত্র: যুগান্তর. ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০২)।

বিএনপির পর আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগের পর বিএনপি; মাঝের সময়টি তত্ত্বাবধায়ক কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বাদ দিলে বিগত ৩৫ বছর ধরে তা-ই তো আমরা দেখে আসছি। বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের প্রায় ১৭ বছর পর বিএনপি নতুন করে সরকার গঠন করেছে। ২১ এপ্রিল এসএসসি ও সমমান এবং আগামী জুন মাসে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন গঠিত সরকারের প্রথম বছরেই বড় পরিসরে দুটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নিয়ে পরীক্ষার্থী-অভিভাবক, এমনকি শিক্ষকদের মনেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। আমরা চাই ভালোয় ভালোয় পরীক্ষা সম্পন্ন হোক। কোনো মন্দ বা বেমানান দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বোমা তৈরির পিডিএফ ফাইল ছড়ানো ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার

ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের এক ক্রু জীবিত উদ্ধার

মার্কিন দ্বিতীয় পাইলটকে হন্যে হয়ে খুঁজছে ইরান, ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ঘোষণা

নিখোঁজ পাইলটদের খুঁজতে গিয়ে ভূপাতিত মার্কিন হেলিকপ্টার: মেহের নিউজ

দলীয় পদ ছাড়ছেন জোনায়েদ সাকি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত