Ajker Patrika

বিআরটিএর সিদ্ধান্ত: রাইডশেয়ারিংয়ে ভাড়া ঠিক করার সুযোগ হারাল যাত্রী

  • সিএনজি এবং নন-এসি কার সার্ভিস বন্ধ
  • সার্ভিস প্রোভাইডারের কমিশন সর্বোচ্চ ১৫%
  • অ্যাপ মনিটরিং করবে বিআরটিএ
  • তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ১৮টি
  • সক্রিয় মাত্র ৩-৪টি
  • সেবা দিচ্ছে ৩৫ হাজার যান
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা 
আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ১১: ২১
বিআরটিএর সিদ্ধান্ত: রাইডশেয়ারিংয়ে ভাড়া ঠিক করার সুযোগ হারাল যাত্রী

অ্যাপে বিডিং সিস্টেম থাকা (ভাড়া নিয়ে দরাদরি) বন্ধ, সর্বোচ্চ কমিশন ১৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও নন-এসি সার্ভিস বাতিলসহ রাইডশেয়ারিং খাতে বড় ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ১০ মে থেকেই এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে উবার, পাঠাও, ইনড্রাইভসহ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে গত সাত দিনেও এর অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি বলে অ্যাপ যাচাই করে দেখা গেছে।

রাইডশেয়ারিং অ্যাপের ‘বিডিং সিস্টেম’ হচ্ছে যাত্রী ও চালকের মধ্যে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির পদ্ধতি। এতে যাত্রী গন্তব্য জানিয়ে নিজের পছন্দমতো ভাড়া প্রস্তাব করেন। কোনো চালক প্রস্তাবিত ভাড়ায় যেতে রাজি হলে রাইডটি নিশ্চিত হবে। বিআরটিএ বলছে, চালকেরা গাড়ি চালানোর সময় এভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ভাড়া ঠিক করলে তা সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এ ছাড়া প্রক্রিয়াটি বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন ও রাইডশেয়ারিং নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৩ মে রাইডশেয়ারিং সার্ভিসসংক্রান্ত অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিআরটিএ সিদ্ধান্তগুলো নেয় বলে সংস্থাটির সূত্র জানিয়েছে।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, দেশে এখন পর্যন্ত ১৮টি রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হলেও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে মাত্র তিন-চারটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন রাইডশেয়ারিং সেবা দিচ্ছে। অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে মোবাইল ফোন দিয়ে যাত্রীদের এদের সেবা নিতে হয়।

অংশীজনদের সঙ্গে হওয়া বিআরটিএর সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, রাইডশেয়ারিং চালক প্রতিনিধিরা বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্বচ্ছভাবে ভাড়া নির্ধারণ এবং অতিরিক্ত কমিশন কেটে নেওয়ার অভিযোগ করেন। সভায় বিশেষ করে পাঠাও ও ইনড্রাইভের বিডিং পদ্ধতিকে দুর্ঘটনাপ্রবণ ও নীতিমালাবহির্ভূত বলে উল্লেখ করা হয়। বিদ্যমান আইনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ উল্লেখ করে বলা হয়, চালকের অংশগ্রহণে বিডিং ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রাইড শেয়ারিং অ্যাপে বিডিং সিস্টেম রাখাই যাবে না এবং ১০ মে থেকে তা বন্ধ করতে হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী থ্রি-হুইলার অটোরিকশা অন্তর্ভুক্তির সুযোগ না থাকায় পাঠাও, উবারসহ সব রাইড শেয়ারিং অ্যাপ থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা/মোটরচালিত রিকশা বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই কারণে নন-এসি কার সার্ভিসও বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

কমিশন প্রসঙ্গে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য সর্বোচ্চ কমিশন হবে ১৫ শতাংশ। এই কমিশন যাত্রী পরিশোধ করবেন, চালকের ভাড়া থেকে তা কাটা যাবে না। সেবা গ্রহণকারী যাত্রী ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কমিশন রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করবেন। উবার কমিশনের পর ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিলেও বিআরটিএ তা নাকচ করে দেয়।

কমিশন নিয়ে বিআরটিএর এক কর্মকর্তা বলেন, রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা-২০১৭-এ কমিশন কাটার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। উবার, পাঠাওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালকদের কাছ থেকে বিভিন্ন হারে কমিশন নিচ্ছে। উবার মোটরকারে ২২-২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেয়। পাঠাও নেয় ৫-২০ শতাংশ। মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্যাকেজ ও ধাপে ১ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন কাটা হয়। ফলে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কমিশন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

ভাড়ার কাঠামো নিয়েও সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিস গাইডলাইন অনুযায়ী প্রথম ২ কিলোমিটারের জন্য সর্বোচ্চ বেইজ ফেয়ার ৮৫ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ৩৪ টাকা এবং প্রতি ২ মিনিটের ওয়েটিং চার্জ সাড়ে ৮ টাকা—এ হার অনুসরণ করতে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয় সভায়।

চালকদের আইডি বা অ্যাকাউন্ট সাময়িক বন্ধ বা স্থগিত করা নিয়েও আলোচনা হয়। ঠিক হয়েছে অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চালকের আইডি বন্ধ করা যাবে না। সাধারণ অভিযোগ দুই পক্ষের শুনানি নিয়ে সমাধান করতে হবে। অভিযোগ গুরুতর হলে নিষ্পত্তি করতে হবে বিআরটিএর আপিল অথরিটির মাধ্যমে।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করা বিআরটিএর পরিচালক (অপারেশন) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কোম্পানিগুলোর অ্যাপস কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করতে বিআরটিএ কর্তৃক অ্যাপস তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম শামস এ খান সভায় বলেন, ‘রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর ব্যবহৃত অ্যাপের ব্যাকএন্ডে (অভ্যন্তরীণ বিষয় যা সাধারণ সেবাগ্রহীতা দেখে না) বিআরটিএর প্রবেশাধিকার থাকা উচিত। এতে ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণহীনতার কারণে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য বাড়ছে। জনস্বার্থ ও সেবাগ্রহীতাদের অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।’

রাইড শেয়ারিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে বিআরটিএর এক কর্মকর্তা জানান, তাঁরা নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ জন্য নিজস্ব কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যেখানে সব রাইড শেয়ারিং কোম্পানি যুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতে যাত্রী কোনো রাইডের অনুরোধ করলে তা সরাসরি বিআরটিএর প্ল্যাটফর্মে যাবে। এরপর বিভিন্ন কোম্পানির চালক প্রতিযোগিতামূলকভাবে ভাড়ার প্রস্তাব দেবেন। যিনি কম ভাড়ায় সেবা দিতে রাজি হবেন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাইডটি তাঁদের কাছে চলে যাবে।

এদিকে বিআরটিএর নির্দেশনা কার্যকর হওয়ার যে নির্ধারিত সময়, তার এক সপ্তাহ পর গতকাল সোমবার রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো ব্যবহার করে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেওয়া সিদ্ধান্তের কয়েকটাই বাস্তবায়িত হয়নি। বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উবার ও পাঠাও অ্যাপে গতকালও সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখা গিয়েছে। পাশাপাশি ইনড্রাইভে ভাড়া নির্ধারণে বিডিং পদ্ধতি চালু রয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত