Ajker Patrika

সরকার আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে উভয়সংকটে পড়বে

  • পিডিবি থেকে বছরে অন্তত ৫০ কোটি ডলার বেশি নিচ্ছে: বিশেষজ্ঞ
  • বেশি দামে কেনায় বিশাল আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ
  • চাহিদার মোট ৯-১৩% আদানি থেকে আসছে
  • পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত কমিটি
  • দরপত্র ছাড়াই ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি আ.লীগ সরকারের
ফয়সাল আতিক, ঢাকা
আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯: ২৬
সরকার আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে উভয়সংকটে পড়বে

ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে আওয়ামী লীগ সরকার দৈনিক ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার যে চুক্তি করেছিল, সেখানে বড় ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ধরার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি এসব কথা বলেছে। রাষ্ট্রের ক্ষতি সামাল দিতে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু দেশের মোট চাহিদার ৯ থেকে ১৩ শতাংশ জোগানদাতা আদানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি পুনর্বিবেচনার কতটা সুযোগ আছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।

চুক্তির ফাঁকফোকরের ফলে ভারতের শিল্পপতি গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি পাওয়ার পিডিবির কাছ থেকে বছরে অন্তত ৫০ কোটি ডলার বেশি নিয়ে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, দুর্নীতি আর কারসাজির মাধ্যমে বিদ্যুতের এককপ্রতি মূল্য বাড়িয়ে ধরা হয়েছে। এ সূত্রে কিছু আমলাসহ সংশ্লিষ্টদের পকেটে ঢুকেছে মোটা অঙ্কের অর্থ। কমিটি এই দুর্নীতির কিছু প্রমাণ নির্বাচিত সরকারের হাতে দিয়ে যাবে। সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার পরামর্শও থাকবে।

অন্তর্বর্তী সরকার আদানির সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি থেকে সরে আসা; কিংবা পর্যালোচনার মাধ্যমে দাম কমিয়ে আনতে চাইলেও চুক্তির শক্ত ‘রক্ষাকবচের কারণে’ সেদিকে পা বাড়াতে পারেনি। তাই নির্বাচিত সরকারকে এ অনিয়মগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে নামার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে পর্যালোচনা কমিটি।

বিলুপ্ত বিদ্যুৎ, জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইনের অধীনে ২০১৭ সালে কোনো দরপত্র ছাড়াই ভারতের আদানি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৩ সালের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে আদানি। বিশেষ চুক্তিতে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে আদানিকে সীমাহীন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে সে সময় থেকেই সমালোচনা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে চুক্তির পদে পদে দুর্নীতির ছাপ রয়েছে বলে অনেক অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়েছে। পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ফ্যাকাল্টি অব ল অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের শিক্ষক অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘দুর্নীতি ছাড়া এমন চুক্তি যে সম্ভব নয়, এ বিষয়ে তাদের কমিটির সবাই একমত পোষণ করেছেন। কিন্তু সভরেন কন্ট্রাক্ট বা সার্বভৌম চুক্তি হওয়ায় বর্তমান সরকার চাইলেই এসব চুক্তি বাতিল করতে পারবে না।’

পরামর্শ দিয়ে মোশতাক খান বলেন, ‘ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে আদানির এই প্রকল্পের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আদানির প্রকল্প রয়েছে এবং এসব প্রকল্পে দুর্নীতির বিষয়গুলো বেশ আলোচিত। বিদেশি হুইসেল ব্লোয়ারদের (তথ্য ফাঁসকারী) কাছ থেকেও দুর্নীতিবিষয়ক নানা তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। নতুন সরকার এসব আমলে নিলে আদানি ইস্যুটির সঠিক সমাধান বের করতে পারবে।’

আজকের পত্রিকার এক প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘চুক্তি চলাকালে বাংলাদেশি আমলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আদানির কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে লেনদেনের প্রমাণ হাতে রয়েছে। কিন্তু এগুলো যতটা না প্রকাশ করার বিষয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আদালতে প্রমাণ হিসেবে উত্থাপন করা। আদানির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে যুক্তরাজ্যের থ্রি ভেরুলাম বিল্ডিংস নামের একটি আইনি সহায়তা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।’

হিসাবের গরমিলের কারণে আদানির সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের একটি অমীমাংসিত বিল এখন সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে তুলেছে আদানি। সেখানে আলোচনা চালিয়ে যেতে পিডিবির পক্ষ থেকে একটি আইনি ও কারিগরি দল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে যোগাযোগ করা হলে পিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সিঙ্গাপুরের আদালতে একটি টিম নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে ব্রিটিশ কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের বিষয়ে তাদের জানা নেই।

প্রায় এক দশক আগে করা এ-সংক্রান্ত চুক্তিতে বিদ্যুতের দাম ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান নির্ধারণের পাশাপাশি বিভিন্ন শর্তের ক্ষেত্রে আদানির পক্ষে উদারতা দেখানো হয়েছে। প্রাথমিক আলোচনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপনের কথা থাকলেও কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ভারতের ঝাড়খন্ডে স্থাপন করা হয়েছে। তখন ঝাড়খন্ডের কয়লা ভান্ডার ব্যবহারের কথা বলা হলেও পরে দেখা যায়, বিধি অনুযায়ী কেন্দ্রটিতে ভারতীয় কয়লা ব্যবহার করা যাবে না। অন্য দেশ থেকে বেশি দরে আমদানি করে চালানো হয় উৎপাদন। আদানির সঙ্গে সরকার প্রতি ইউনিট ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট এবং পরবর্তী সময়ে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে ক্রয় চুক্তি করেছিল। তখন একই দেশ থেকে জিটুজি ভিত্তিতে প্রতি ইউনিট ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট দরে বিদ্যুৎ কিনছিল বাংলাদেশ। একই উৎস থেকে কেনা বিদ্যুতে দামের এত পার্থক্যের ব্যাখ্যা চুক্তিতে নেই।

প্রসঙ্গত, আদানি পাওয়ারের মালিক গৌতম আদানি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত