Ajker Patrika

তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ

আদানির সঙ্গে চুক্তি বিদ্যুতে দুর্নীতির বৃহত্তম প্রতীক

  • ক্ষতি এড়াতে দ্রুত আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ।
  • ২৫ বছরে অন্তত হাজার কোটি ডলার অবৈধভাবে হাতানো হবে।
  • চুক্তিতে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি।
  • অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৫৫
আদানির সঙ্গে চুক্তি বিদ্যুতে দুর্নীতির বৃহত্তম প্রতীক
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে সম্পাদিত ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি। অস্বাভাবিক চুক্তিগুলোর ক্ষতি থেকে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে দুর্নীতির প্রমাণসহ দ্রুত আইনের আশ্রয় নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক মাস পরই ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

তদন্ত কমিটি ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল রোববার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর পর্যালোচনা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন কমিটির সদস্যরা।

কমিটির প্রধান বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনটি কাজে লাগিয়ে করা চুক্তিগুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও চতুরতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব দুর্নীতির প্রমাণ সরকারকে দেওয়া হয়েছে। সরকারকে দ্রুত এসব দুর্নীতির সুরাহা করতে হবে। এই আইনের আওতায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে প্রয়োজন ব্যতিরেকেই, প্রাথমিক জ্বালানির নিশ্চয়তা ছাড়াই।

কমিটির সদস্য ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, আদানি তার সবার ওপরের দিকে। এখানে বছরে ১০০ কোটি ডলারের মতো বৈদেশিক মুদ্রা যাচ্ছে। ২৫ বছরের চুক্তি থাকায় অন্তত আড়াই হাজার কোটি ডলার আদানিকে দিতে হবে। আমাদের ধারণা, এখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪ থেকে ৫ সেন্ট বা ৪০ শতাংশ বাড়তি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে এর মধ্যে অন্তত এক হাজার কোটি ডলার তারা চুরি বা দুর্নীতি করে আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে।’

আদানির সঙ্গে চুক্তির ত্রুটিগুলো তুলে ধরে মোশতাক হোসেন খান বলেন, একটা চুক্তিতে অস্বাভাবিক কোনো শর্ত থাকলে সেটাই দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ। একজন সুস্থ মস্তিষ্কের আমলা এমন চুক্তিতে সই করতে পারেন না। স্থান নির্ধারণ, দাম নির্ধারণ ও শর্ত আরোপ—এই তিন স্তরে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিক আলাপে মহেশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার কথা থাকলেও সেটা ভারতের (ঝাড়খন্ডের) গোড্ডায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এর কোনো ব্যাখ্যা কেউ জানেন না। বলা হয়েছে, গোড্ডায় কয়লার দাম খুব কম। কিন্তু ভারতে একটা আইন আছে, দেশের কয়লা ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রপ্তানি করা যাবে না। এই আইন জানা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র গোড্ডায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বলা হয়, কয়লা আনতে হবে অস্ট্রেলিয়া থেকে। এটা একটা রহস্য। পিডিবিতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনার রেকর্ড নেই।

কমিটি জানায়, তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আদানির বিদ্যুতের দাম ভারতের গ্রিড থেকে কেনা বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের গ্রিড থেকে যেখানে ৪ দশমিক ৪৬ সেন্টে বিদ্যুৎ আসছিল, সেখানে একই সময়ে আদানিকে শুরুতে ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট এবং পরবর্তী সময়ে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্ট পর্যন্ত পরিশোধ করতে হচ্ছে।

অধ্যাপক মোশতাক বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে আদানির কোনো ক্ষতি হলে তার দায়ও বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে। মাসিক সুদের হার ১.২৫ শতাংশ। সব অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হবে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ সবাই একমত, এই চুক্তি দুর্নীতি ছাড়া সম্ভব নয়।

আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তির দুর্নীতিতে কারা সম্পৃক্ত, এমন প্রশ্নের জবাবে সরাসরি কারও নাম বলতে পারেনি কমিটি।

কমিটির প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। তবে অর্থ লেনদেনে সরাসরি তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ধরনের দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরাসরি অর্থ লেনদেন হয় না। কয়েক স্তর ঘুরে হয়।

অধ্যাপক মোশতাক বলেন, ‘কমিটি বড় ধরনের একটি অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে। সেখানে অন্তত ৭ জন যুক্ত রয়েছেন। তবে এই মুহূর্তে আমরা নামগুলো বলছি না। দুদকের কাছেও তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে।’

মোশতাক হোসেন আরও বলেন, সমস্যা সমাধানে সরকারকে অর্থ পরিশোধ-সংক্রান্ত সব তথ্য প্রকাশ এবং ক্রয় চুক্তিগুলো সংশোধন করতে হবে। আদানির সঙ্গে করা চুক্তিটি সবচেয়ে বেশি দামের। সুতরাং সেখানে থেকেই সংশোধনী শুরু করতে হবে। এতে দেরি হলে মামলা দুর্বল হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে চুক্তি বাতিল করাও সম্ভব।

সরকারকে স্বাধীন জ্বালানি তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠনেরও পরামর্শ দেন মোশতাক হোসেন।

তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, আদানি চুক্তির পেছনে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট (কংক্রিট) প্রমাণ পাওয়া গেছে। হুইসেল ব্লোয়ারদের (তথ্য ফাঁসকারী) মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের নির্দিষ্ট তারিখ, ব্যাংক হিসাব নম্বর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

কমিটির অন্যতম সদস্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে কী ঘটেছে, কীভাবে ঘটেছে, কার স্বার্থে ঘটেছে ও ভবিষ্যতের পথচিত্র কী হতে পারে, তার নির্দেশনা দিয়েছে কমিটি। এই চুক্তিগুলো ঠিক রেখে লোকসান থামাতে পিডিবিকে দাম বাড়াতে হবে ৮৬ শতাংশ, যা দেশের শিল্পকারখানা ধ্বংসের কারণ হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ফলে ৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উদ্বৃত্ত থাকছে। এর অর্ধেকের কম ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয় হচ্ছে ৯৯ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৬৫ হাজার কোটি টাকা।

জাহিদ হোসেন উল্লেখ করেন, অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে চালুর কথা বলা হলেও বিশেষ আইনটি ১৪ বছরের বেশি সময় কার্যকর ছিল। আবার দ্রুত সরবরাহ আইন বলা হলেও এর অধীনে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চার-পাঁচ বছর সময় লেগেছে। বেসরকারি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে ঝুঁকি চাপানো হয়েছে সমাজের ওপর। তিনি বলেন, এই আইনের অধীনে সবগুলো ক্রয় চুক্তিই অস্বচ্ছ, দুর্নীতিপ্রবণ, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

তদন্ত কমিটির অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী ও কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ।

আদানির প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ সরকারের গঠিত এ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আদানি বলেছে, এ প্রতিবেদন তাদের কাছে পৌঁছায়নি। সে কারণে এখনই এর ওপর কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

ঢাকায় আদানির অফিশিয়াল পিআর এজেন্সি সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো বার্তায় আরও বলেছে, ‘আদানি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। চাহিদার ১০ শতাংশই আদানি পূরণ করে। আদানি প্রতিযোগিতামূলক দামেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখছি এবং সরকারকে বিদ্যুতের বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানাই।’

আদানি পাওয়ার ভারতের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য ও শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। আদানি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান গৌতম আদানি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত