Ajker Patrika

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন সংস্কার জরুরি

তানিম আহমেদ, ঢাকা 
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ০৮: ২৯
যাত্রীবাহী বাস ও ধানবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ছবি: সংগৃহীত
যাত্রীবাহী বাস ও ধানবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ছবি: সংগৃহীত

সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক পরিবহন আইন আরও যুগোপযোগী করার দাবি উঠেছে। অন্যদিকে চালকদের ক্ষেত্রে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারের ধারা বাতিলের দাবি জানিয়ে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছেন পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থায় সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না।

পরিবহনশ্রমিকদের আপত্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, আগে পরিবহন আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ৩০৪ ধারায় ৩ বছর সাজা। রাজধানীতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মীম ও আবদুল করিম রাজীবকে বাসচাপা দেওয়ার মতো ঘটনায় বলা হয়েছিল, ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা হবে; যেখানে যাবজ্জীবন ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে। সেটিতে আপত্তি পরিবহনসংশ্লিষ্টদের। তাঁদের চাপের মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইনটি পুনর্বিবেচনা করে সংশোধনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল ২০২৪ সালে।

কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সরকার কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরও আইনটি সংশোধনের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন পরিবহনশ্রমিকেরা। গত ১০ আগস্ট সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরে আন্দোলন প্রত্যাহার করেন তাঁরা।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, চালকদের সাজা ছাড়াও আইনের আরও কিছু দিক নিয়ে পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের আপত্তি রয়েছে। তবে শুধু চালক নয়, জনগণের স্বার্থটাও দেখা হবে। কমিটি পরিবহন খাত ছাড়াও যেসব সংগঠন নিরাপদ সড়কের দাবিতে কাজ করে, তাদেরও মতামত নেবে। সবার মতামত নিয়ে আইনের সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হবে।

সড়ক পরিবহন আইনে চালকদের জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেপ্তারের সুযোগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন সড়ক পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকেরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘এটা তো মৌলিক অধিকারের বিরুদ্ধে। আমাদের দাবি যথাযথ তদন্ত করে দোষীদের চিহ্নিত করতে হবে। সেটি আমলে নিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে চালকের গ্রেপ্তারের বিধানটি জামিনযোগ্য করতে হবে।’

২০১১ সালে মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশফাক মুনীর মিশুকসহ তাঁদের তিন সহকর্মী; যে মামলায় বাসচালককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি চলমান রয়েছে উচ্চ আদালতে।

এরপর ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় নিহত হয় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে প্রথমে মাঠে নামে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। পরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে এই আন্দোলন ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির চিত্র বদলায়নি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৪ সালে দেশে প্রাণহানি হয়েছে ৫ হাজার ৩৮০ জনের। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন তাদের হিসাবে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বলেছে ৭ হাজার ২৯৪ জনের। আবার যাত্রী কল্যাণ সমিতি ওই বছরে ৮ হাজার ৫৪৩ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল।

দেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরে ১৯৩৯ সালের ‘বেঙ্গল মোটর ভেহিকেল অ্যাক্ট’ এবং পরে ১৯৮৩ সালে মোটরযান অধ্যাদেশের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এই আইনে অপরাধের সাজা খুব কম ছিল। এরপর ২০১০ সালে নতুন সড়ক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১২, ২০১৩, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে চার দফা খসড়া প্রণয়ন করা হয়। শুরুতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায়ে সাত বছর থেকে যাবজ্জীবন পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবার খসড়ার সময় পরিবহনমালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে শাস্তি কমানোর দাবি আসে। শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের সাজার বিধান রেখে আইন পাস হয়।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ তৈরির সময় পরিবহনমালিক-শ্রমিকেরা বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা চালকদের লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর সুযোগ রাখার বিরোধিতাও করেছিলেন। ওই বছর সব পক্ষের সম্মতি নিয়েই আইনটি তৈরি করা হয়; যা পরে জাতীয় সংসদে পাস হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, প্রজ্ঞাপন হলেই আইনটি বাস্তবায়িত হবে; যে প্রজ্ঞাপন হয়েছিল ২০১৯ সালের শেষের দিকে; যার জন্য আদালতে রিটও করেছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের মাধ্যমে প্রত্যাশার ৮০ শতাংশ পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, ঘাটতি থাকলেও আইনটি কার্যকর করা হোক। এর মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। দুর্ঘটনায় জীবনহানি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

তবে মাঠপর্যায়ে সড়ক পরিবহন আইনের অনেক বিধান কার্যকর নয় বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত সাপেক্ষে চালকদের নেতিবাচক নম্বর দেওয়ার বিধান আছে আইনে; যার একপর্যায়ে লাইসেন্স বাতিলের কথা বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি প্রয়োগ হচ্ছে না বলেও মনে করেন তাঁরা।

এ ছাড়া সড়ক পরিবহন আইনে ক্ষতিপূরণের কথা বলা হলেও আইন দ্বারা গঠিত তহবিল সক্রিয় নয় বলে মনে করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ বা দেওয়ার জন্য কোনো মানদণ্ড বা প্রক্রিয়া কার্যকর নয়। অবহেলার কারণে হওয়া সড়ক দুর্ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে স্বীকৃতির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক এবং সমন্বিত যাত্রীবিমা (জলপথ, সড়ক ও বিমানপথের আওতাভুক্ত), ক্ষতিগ্রস্তদের হারিয়ে যাওয়া কর্মক্ষম সময়সীমা, মৃত্যুর কারণে নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের মানসিক ও শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতি তাদের উন্নতি ও কল্যাণকে প্রভাবিত করে এমন বিধান আইনে সংযুক্ত করার দাবি বিশেষজ্ঞদের।

সড়ক পরিবহন আইনের মূল লক্ষ্য সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, যদি কোনো পক্ষ বা গোষ্ঠী সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া। এ জায়গায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। সড়কের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করতে হবে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদ মনে করেন, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ পূর্ণাঙ্গ নয়। তিনি বলেন, ‘আইনের শিরোনামটিই ভুল বলে মনে করি। এটি হওয়া উচিত ছিল সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন। সেটা হলে সড়ক নিরাপত্তার সব বিষয় আইনে আনা যেত। কিন্তু সড়ক পরিবহন আইন হওয়ায় সব বিষয় থাকলেও ব্যাখ্যার জায়গাতে অসম্পূর্ণতা থাকে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত