Ajker Patrika

নতুন চাঁদ দেখা: অবহেলিত এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান

ইসলাম ডেস্ক 
নতুন চাঁদ দেখা: অবহেলিত এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

রোজা, হজ, কোরবানি, ঈদসহ ইসলামের মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বহু বিধান চন্দ্রমাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই একজন সচেতন মুসলমানের জন্য হিজরি মাসের হিসাব রাখা এবং প্রতি মাসে নতুন চাঁদের খবর নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীনি দায়িত্ব।

ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম সমাজের ঐতিহ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, নতুন চাঁদ দেখা ছিল মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও চাঁদ দেখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে চাঁদ দেখতে উৎসাহিত করতেন। বিশেষত রমজান ও জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার ব্যাপারে অসংখ্য হাদিসে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আজও সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের বহু দেশে রমজান ও ঈদের আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে জনসাধারণকে চাঁদ অনুসন্ধানের আহ্বান জানানো হয়। সাধারণ মুসলমানরাও অত্যন্ত আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে আকাশে নতুন চাঁদ খোঁজেন।

আমাদের দেশেও মাত্র দুই-তিন দশক আগে শহর ও গ্রামাঞ্চলে দল বেঁধে রোজা ও ঈদের চাঁদ দেখার এক অনাবিল সংস্কৃতি চালু ছিল। বিকেল গড়াতেই মানুষ বাড়ির ছাদে, খোলা মাঠে কিংবা নদীর তীরে জড়ো হতো। শিশু-কিশোরদের মাঝে বিরাজ করত ভিন্ন রকম এক উৎসবমুখর আমেজ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আধুনিকতার যান্ত্রিক প্রবাহে সেই সুন্দর ও ঐতিহ্যবাহী চর্চা আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।

বর্তমান যুগে আমরা অতিরিক্ত মাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছি। মোবাইল, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঁদ দেখার সংবাদ পাওয়ার অপেক্ষায় আমরা চাতক পাখির মতো বসে থাকি; অথচ নিজেরা চোখ মেলে আকাশ পানে তাকিয়ে চাঁদ দেখার প্রয়োজনই অনুভব করি না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে অনেক মুসলমান হিজরি মাসের নাম ও বর্তমান তারিখ সম্পর্কেও ন্যূনতম ধারণা রাখেন না। অথচ ইসলামে হিজরি ক্যালেন্ডার সংরক্ষণ ও নতুন চাঁদ অনুসন্ধানের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ইসলামি আইনজ্ঞ ও ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, চন্দ্রমাসের হিসাব সংরক্ষণ করা মুসলিম উম্মাহর জন্য ‘ওয়াজিব আলাল কিফায়া’। অর্থাৎ, মুসলিম সমাজের অন্তত একটি দল বা কিছু মানুষকে সর্বদা হিজরি মাসের হিসাব রাখা এবং নতুন চাঁদের অনুসন্ধানে নিয়োজিত থাকতে হবে। যদি সমাজের সবাই এই দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ গাফেল হয়ে যায়, তবে সামষ্টিকভাবে পুরো সমাজই গুনাহগার হবে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/১৯৭)

এই ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেই প্রতি আরবি মাসের ২৯ তারিখে প্রত্যেক এলাকার কিছু মানুষের উচিত অন্তত নিজ উদ্যোগে নতুন চাঁদ অনুসন্ধানের চেষ্টা করা। এটি কেবল কোনো সামাজিক রীতি বা লৌকিকতা নয়; বরং প্রিয় নবীজির সুন্নাহর অনুসরণ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

নতুন চাঁদ দেখার সময় নবীজি (সা.) একটি বিশেষ দোয়া পাঠ করতেন:

«اللَّهُمَّ أَهِلَّهُ عَلَيْنَا بِالأَمْنِ وَالإِيمَانِ وَالسَّلاَمَةِ وَالإِسْلاَمِ وَالتَّوْفِيقِ لِمَا تُحِبُّ وَتَرْضَى رَبُّنَا وَرَبُّكَ اللَّهُ»

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-আমনি ওয়াল ইমান, ওয়াস-সালামাতি ওয়াল-ইসলাম, ওয়াত-তাওফিকি লিমা তুহিব্বু ও তারদ্বা, রাব্বুনা ও রাব্বুকাল্লাহ।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, এই নতুন চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করুন নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে। আর আপনি যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। (হে চাঁদ!) আমাদের এবং তোমার রব হলেন আল্লাহ।’ (জামে তিরমিজি: ৩৪৫১)

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও দ্বীনি চর্চার মতো নতুন চাঁদ দেখার এই পুণ্যময় আমল থেকেও ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি। অথচ এটি আমাদের মুসলিম পরিচয় ও ইসলামি সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতীক।

লেখক: মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন

মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন ঢাকা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত