লোহিত সাগরের পাড়। সবুজ আর সোনালি শস্যের ঢেউখেলানো অঞ্চল। মায়াবী ইয়েমেন। এখানে বাস করত এক ছোট্ট পরিবার। বাবা হারেসা বিন শুরাহবিল, মা সুদা বিনতে সালাবা, আর তাঁদের আদরের সন্তান জায়েদ। জায়েদ ছিল আট বছরের শিশু, কিন্তু তাঁর চোখেমুখে ছিল অসীম বুদ্ধিমত্তার ঝলক। হাসলে তাঁর ডাগর ডাগর চোখে যেন দুটি তাঁরা জ্বলে উঠত। বাবা-মায়ের ভালোবাসার উষ্ণ ছায়ায় তাঁর শৈশব ছিল রঙিন, আর মনটা ছিল মুক্ত পাখির মতো উড়নচণ্ডী।
আজ তাঁর মনটা আরও উৎফুল্ল, কারণ সে মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ি যাবে। তায়ি গোত্রের সেই গ্রাম, যেখানে তাঁর শৈশবের সব স্মৃতি জড়িয়ে আছে। মায়ের হাত ধরে যখন কাফেলার সঙ্গে সে যাত্রা করল, তাঁর ছোট্ট মনে তখন শুধু একটাই ভাবনা—কখন নানার বাড়ির খেজুর বাগানে ঘুরে বেড়াবে, সমবয়সীদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠবে। পথের দূরত্ব যতই কমে, তাঁর মন ততই আনন্দে নেচে ওঠে।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন কে খণ্ডাতে পারে? গন্তব্যের কাছাকাছি এসে তাঁদের কাফেলা শিকার হলো কায়েস গোত্রের দস্যুদের নির্মমতার। লুটপাট শেষে যখন দস্যুরা ফিরছিল, তাঁদের সর্দারের চোখ পড়ল জায়েদের ওপর। তাঁর বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি সর্দারের লোভে আগুন ধরিয়ে দিল। হ্যাঁচকা টানে জায়েদকে নামিয়ে আনা হলো উটের পিঠ থেকে। মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো তাঁর কলিজার টুকরাকে। সুদার করুণ আর্তনাদ আর হারেসার অসহায় আর্তিতেও পাষাণ দস্যুদের মন গলেনি। জায়েদ হারিয়ে গেল, আর তাঁর বাবা-মায়ের বুকে নেমে এল এক পাহাড়সম শূন্যতা।
উকাজের বাজারে জায়েদকে বিক্রি করা হলো। ভাগ্যের লিখন, তাকে কিনলেন মক্কার সম্ভ্রান্ত নারী খাদিজার ভাতিজা হাকিম বিন হিজাম। তিনি জায়েদকে উপহার দিলেন ফুফু খাদিজাকে, আর খাদিজা উপহার দিলেন স্বামী মুহাম্মদ (সা.)-কে। এভাবেই জায়েদ প্রবেশ করল আল-আমিন উপাধি পাওয়া এক মহামানবের ঘরে।
সময়ের ব্যবধানে জায়েদের মা-বাবার স্মৃতি ফিকে হতে শুরু করল। নবী-দম্পতির স্নেহ আর ভালোবাসায় ধীরে ধীরে জায়েদ তাঁর হারানো দুঃখ ভুলতে শুরু করল। কেননা তাঁরা তাকে ক্রীতদাস নয়, বরং নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা আর স্নেহের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা হয় না।
এদিকে, জায়েদের বাবা-মা শোকে কাতর হয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, বছর যায়—ছেলে আর ফিরে আসে না। পুত্রশোকে তাঁদের বুকফাটা কান্না আর অসহ্য যন্ত্রণা কোনোভাবেই শেষ হচ্ছিল না।
একদিনের ঘটনা। সেদিনের আকাশটা ছিল এক অন্যরকম। মক্কায় বইছিলো হিমেল বায়ু। নির্মল এ দিনে পবিত্র কাবার তাওয়াফ করতে এসে খুজাআ গোত্রের কিছু লোক হঠাৎ জায়েদকে দেখতে পায়। দেখেই তারা তাকে চিনে ফেলে। তাঁরা তাঁর বাবাকে খবর দেয়। খবর পেয়েই হারেসা তাঁর ভাইকে নিয়ে ছুটে আসেন মক্কায়। তাঁরা গিয়ে হাজির হন মুহাম্মদ (সা.)-এর দরবারে। তাঁদের মনে ভয়, না জানি কত টাকা চাইবেন তিনি।
জায়েদের বাবার মিনতি ভরা কণ্ঠ—‘হে আল্লাহর ঘরের পড়শি, আপনারা তো বন্দীকে মুক্ত করেন, ক্ষুধার্তকে আহার দেন। আপনার কাছে আমার ছেলে জায়েদ অনেক দিন ধরেই রয়েছে। তাকে ফিরে পেতে চাই। বিনিময়ে আপনি যত মূল্য চান, দেব। ছেলের শোকে জায়েদের মা দানাপানি মুখে তুলছে না। তার রঙিন জীবন ফিকে হয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। আমাদের ঘরের এই ছোট্ট আলোটাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।’
তখনো আমাদের দয়ার নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুওয়াত লাভ করেননি। কিন্তু তার উত্তম আচরণের সৌরভ মক্কার চারপাশে অনেক আগেই ছড়িয়ে আছে। তাঁর দয়া, মায়া, সহানুভূতি আর প্রজ্ঞার গল্প আরবের অলিগলির সবার মুখস্থ। জায়েদের বাবার হৃদয় বিগলিত আরতি শুনে নবীজি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘আমি জায়েদকে তাঁর ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেব। সে যদি যেতে চায়, তবে কোনো বিনিময় ছাড়াই সে যেতে পারে। আর যদি সে থাকতে চায়, তবে আমি তাকে কীভাবে ফিরিয়ে দিই! আদরের জায়েদকে তো আমি জোর করে তাড়িয়ে দিতে পারি না! তার নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্তটা সে নিলেই ভালো হবে।’
নবীজির কথায় মুগ্ধ হলেন হারেসা। এত সহজ সমাধান! তিনি অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। ভালোবাসার সাগরে ঢেউ খেলে গেল। মায়াভরা শব্দে বললেন, ‘বাবা, তোমার কী ইচ্ছা?’
উপস্থিত সবাই ভাবল, জায়েদ তাঁর বাবা-মায়ের কাছেই ফিরে যাবে। মা-বাবার টান তো আর সামান্য কিছু না! কিন্তু সবার সব ধারণা ভেঙে দিয়ে জায়েদ মাথা তুলে দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়ে দিলো, ‘বাবা, আমি এখানেই থাকতে চাই। ফিরে যেতে চাই না। তারা আমাকে অনেক আদর করেন। আমাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করেন। স্নেহের চাদরে ঢেকে রাখেন সবসময়।’
হারেসার চোখেমুখে বিস্ময়। তার ঘোর যেন কাটছেই না। একটা বড় ধাক্কাও খেলেন। তার মনে বারবার প্রশ্ন—কোন ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা পড়েছে জায়েদ? তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘তুমি স্বাধীন জীবন ছেড়ে দাসত্ব বরণ করতে চাও?’
জায়েদের সহজ উত্তর, ‘বাবা, তাঁর মাঝে ফুলের মতো অনুপম কিছু গুণের সমাহার রয়েছে। আরবের এই মরুর বুকে তিনি জীবন্ত ফুল। সেই ফুলের সুবাসে তিনি আমাকে সুবাসিত করেছেন। তিনি আদর-যত্ন মেখে আমাকে সব দুঃখ ভুলিয়েছেন। কখনো মা-বাবার অভাব বুঝতে দেননি। তাঁকে ছেড়ে আমি কখনই যেতে পারব না।’
জায়েদের কথায় মুহাম্মদ (সা.)-এর হৃদয় ভরে গেল। ভালোবাসার গভীর স্রোত তাঁর চোখে জল এনে দিল। তিনি জায়েদকে নিয়ে কাবার চত্বরে গেলেন, কুরাইশদের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘হে মক্কাবাসী, তোমরা শুনে রাখো, জায়েদ আজ থেকে মুক্ত। শুধু মুক্তই নয়—সে আমার সন্তান। সে আমার ওয়ারিশ, আমি তাঁর ওয়ারিশ।’
মুহাম্মদ (সা.)-এর এই ঘোষণা শুনে জায়েদের বাবা-চাচা যারপরনাই খুশি হলেন। তারা ভাবলেন—জায়েদ আমাদের পরিবারের চেয়েও এখানে বেশি নিরাপদ থাকবে। তারা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁদের মনে আর কোনো সংশয় থাকল না। শেষ বারের মতো আদরের সন্তানকে জড়িয়ে ধরলেন। চুমো এঁকে দিলেন। বললেন, ‘ভালো থাকিস বাবা। নিজের যত্ন নিস। বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করিস।’
সেদিনের ছোট্ট বালক জায়েদ বুঝতে পারেনি, তার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সে কী মহান নিয়ামত লাভ করেছে। সে স্বপ্নেও ভাবেনি, এই মানুষটিই একদিন হবেন মহানবী—যার আগমনের প্রতিশ্রুত সমস্ত আসমানি কিতাবে বর্ণিত আছে। আর তাঁর জীবন হবে এই মহান নবুওয়াতের রাজসাক্ষী। তার নাম সোনার হরফে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়। পবিত্র কোরআনের আয়াতে জীবন্ত হবেন তিনি। তাঁকে উদ্দেশ্য করে নেমে আসবে ওহি। কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ তাঁকে স্মরণ করবে।
মুহাম্মদ (সা.)-এর এই ঘোষণার পর থেকে জায়েদকে সবাই ইবনে মুহাম্মদ অর্থাৎ মুহাম্মদের ছেলে বলেই ডাকতেন। নবী করিম (সা.) তাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, তাঁর অনুপস্থিতিতে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন।
তথ্যসূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম

একজন মুমিনের জন্য নামাজ হলো আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও জীবনের বরকত লাভের সর্বোত্তম মাধ্যম। প্রতিদিন সময়মতো নামাজ আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ। নিচে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য আজকের নামাজের সময়সূচি তুলে ধরা হলো।
১ ঘণ্টা আগে
ক্ষমা একটি উচ্চতর মানবিক গুণ। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো অন্যকে ক্ষমা করার মানসিকতা রাখা। ক্ষমার এই গুণ মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুমিনদের জন্য একে জান্নাত লাভের অছিলা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
১৮ ঘণ্টা আগে
ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে যেসব মনীষী তাঁদের মেধা ও গবেষণার মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) অন্যতম। তিনি একাধারে শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ ও আইনবিদ। তাঁর পাণ্ডিত্য ও অবদানের কারণে তাঁকে আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস বা হাদিসশাস্ত্রের সেনাপতি বলা হয়।
১৯ ঘণ্টা আগে
পবিত্র রমজান মাস মুমিনের জন্য ইবাদতের বসন্তকাল। এই মাসে প্রতিটি আমলের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। রোজা পালনকালে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত কিছু শারীরিক বিষয় নিয়ে আমরা সংশয়ে ভুগি। এর মধ্যে অন্যতম হলো—রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হওয়া।
২০ ঘণ্টা আগে