Ajker Patrika

ইরানে ‘কয়েক সপ্তাহ’ অভিযানে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র, চলতে পারে ‘কয়েক মাসও’

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে ‘কয়েক সপ্তাহ’ অভিযানে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র, চলতে পারে ‘কয়েক মাসও’
যুক্তরাষ্ট্রের ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েকজন সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। এই লক্ষ্যে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা ও মেরিন ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তা সংঘাতকে এক বিপজ্জনক নতুন অধ্যায়ে রূপ দিতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, কর্মকর্তারা বলছেন—সম্ভাব্য স্থল অভিযান পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন হবে না। বরং এতে বিশেষ বাহিনী ও প্রচলিত পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে ছোট আকারের অভিযান বা রেইড হতে পারে। সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলার জন্য তারা সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন। এই পরিকল্পনাগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরেই তৈরি করা হচ্ছে।

এ ধরনের অভিযানে মার্কিন সেনারা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, স্থল গোলাগুলি এবং ইম্প্রোভাইজড বিস্ফোরক। শনিবার পর্যন্ত স্পষ্ট ছিল না, ট্রাম্প পেন্টাগনের সব পরিকল্পনা, কিছু অংশ, নাকি কিছুই অনুমোদন করবেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে দোদুল্যমান অবস্থান দেখা গেছে। কখনো বলা হচ্ছে যুদ্ধ শেষের পথে, আবার কখনো হুমকি দেওয়া হচ্ছে তা আরও তীব্র করার। ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত শেষ করার ইঙ্গিত দিলেও, হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সতর্ক করে বলেছেন, তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ না করলে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া না থামালে ট্রাম্প তাদের ওপর ‘নরক নামিয়ে আনবেন।’

এই প্রতিবেদনের প্রশ্নের জবাবে লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রধান সেনাপতির (কমান্ডার ইন চিফ বা প্রেসিডেন্ট) জন্য সর্বোচ্চ বিকল্প প্রস্তুত রাখা পেন্টাগনের দায়িত্ব। এর মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।’

গত এক মাসে প্রশাসনের ভেতরের আলোচনায় পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনাও উঠে এসেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যবহৃত অস্ত্র খুঁজে ধ্বংস করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন, এসব লক্ষ্য অর্জনে ‘মাস নয়, সপ্তাহ’ লাগতে পারে। আরেকজন সম্ভাব্য সময়সীমা ‘কয়েক মাস’ বলে উল্লেখ করেছেন।

শনিবার এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে পেন্টাগন কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

গত ২০ মার্চ ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। পাঠালে অবশ্যই আপনাদের বলতাম না, কিন্তু আমি পাঠাচ্ছি না।’

অন্যদিকে ফ্রান্সে শুক্রবার মিত্রদের বৈঠক শেষে কথা বলতে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি প্রশাসনের একটি পরিচিত কিন্তু অস্পষ্ট মূল্যায়ন পুনর্ব্যক্ত করেন যে অভিযান নির্ধারিত সময়ের আগেই এগোচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থলবাহিনী ছাড়াই সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।’

ইরানের খারগ দ্বীপ দখলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে জনমনে জল্পনা-কল্পনা থাকলেও, এমন অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন মাইকেল আইজেনস্ট্যাড। তিনি ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সামরিক ও নিরাপত্তা গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক। তাঁর মতে, দ্বীপটি ঘিরে মাইন পেতে রাখা এবং এটিকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই বেশি নিরাপদ হতে পারে, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে পাতা মাইন সরাতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন একটি ছোট জায়গায় থাকতে চাইব না, যেখানে ইরান ড্রোন ও সম্ভবত আর্টিলারির মাধ্যমে হামলা চালাতে পারে।’ ইরাক, ইসরায়েল ও জর্ডানে দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা কর্মকর্তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বুদ্ধিমান স্থল অভিযান হতে পারে ইরানের উপকূলীয় কিছু সামরিক ঘাঁটি ‘পরিষ্কার করে দেওয়া’, যেগুলো বাণিজ্যিক ও সামরিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

এসব ঘাঁটির কিছু হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি, যা বিশ্বে তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট এবং বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। অন্যগুলো উপকূলের আরও উত্তরে অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়। আইজেনস্ট্যাড বলেন, ‘আমার মনে হয়, দীর্ঘ সময় ধরে সেনাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখা ঠিক নয়। দ্রুত চলাচল এবং আক্রমণ করে বেরিয়ে আসার কৌশলই বাহিনীর নিরাপত্তার অংশ হওয়া উচিত।’

সম্প্রতি ৩ হাজার ৫০০ নাবিক ও মেরিন সদস্য নিয়ে গঠিত ৩১ তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে পৌঁছে গেছে। এই ইউনিটের এমন অভিযানে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও, অতিরিক্ত সরবরাহ ছাড়া কত দিন যুদ্ধ চালাতে পারবে, তা নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউনিটটির কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত এক অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তার মতে, পারস্য উপসাগরে খারগ দ্বীপ ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলেও, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আরও কিছু দ্বীপ রয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হতে পারে।

ইরানের এলিট আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। এ ছাড়া, খারগ দ্বীপের মূল্যবান তেল স্থাপনাগুলোও তারা প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী স্থল অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত আরেক সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, এসব পরিকল্পনা ব্যাপক ও বিস্তারিত। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছি। যুদ্ধ পরিস্থিতি ধরে অনুশীলনও হয়েছে। এটি কোনো হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়।’

ইরানের ভূখণ্ড দখল করলে দেশটির সরকার বিব্রত হবে এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ দর–কষাকষির উপকরণ তৈরি হবে বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, দখল করা এলাকায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘খারগ দ্বীপে থাকা সেনাদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। দখল করা কঠিন নয়, কিন্তু সেখানে অবস্থানরত সৈন্যদের রক্ষা করাই আসল চ্যালেঞ্জ।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত