Ajker Patrika

ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পক্ষে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে
আলোচনার টেবিলে ইরানই আপাতত এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির পথে হাঁটবে কি না—তা নিয়ে ইরানি রেজিমের কট্টর অংশের মধ্যে বিতর্ক ক্রমেই জোরালো, প্রকাশ্য এবং আরও জেদপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমনটাই জানিয়েছে দেশটির একাধিক সূত্র। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর থেকে রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী প্রভাবশালী হয়ে ওঠায় ইরানের পারমাণবিক নীতিতে কট্টর অবস্থানের জোর বাড়ছে বলে দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র জানিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মনে করে—ইরান পারমাণবিক বোমা চায়, অথবা অন্তত খুব দ্রুত তা তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করতে চায়। তবে তেহরান বরাবরই তা অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, খামেনি ইসলামে নিষিদ্ধ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রকে হারাম ঘোষণা করেছিলেন এবং ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য।

একটি সূত্র জানিয়েছে, এখনো ইরানের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা নেই এবং দেশটি বোমা তৈরির সিদ্ধান্তও নেয়নি। তবে ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে প্রভাবশালী কিছু মহল বিদ্যমান নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং পরিবর্তনের দাবি তুলছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাঝপথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা পরিস্থিতির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এতে ইরানি কৌশলবিদরা মনে করতে পারেন, বোমা তৈরির পথ ত্যাগ করে বা এনপিটিতে থেকে তাদের বিশেষ কোনো লাভ নেই।

এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ধারণা—যা আগে কট্টরপন্থীরা মাঝে মাঝে হুমকি হিসেবে ব্যবহার করত—এখন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে আরও ঘন ঘন আলোচিত হচ্ছে। পাশাপাশি একসময় প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ ছিল এমন ধারণা, অর্থাৎ সরাসরি বোমা তৈরির পথে যাওয়া, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে। রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি–ঘনিষ্ঠ তাসনিম সংবাদ সংস্থা বৃহস্পতিবার এক নিবন্ধে বলেছে, ইরানের উচিত যত দ্রুত সম্ভব এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, তবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া।

কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়াত প্রধান মোহাম্মদ জাওয়াদ লারিজানিকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলেছে ইরানের এনপিটি সদস্যপদ স্থগিত করা উচিত। তিনি বলেন, ‘এনপিটি স্থগিত করা উচিত। চুক্তিটি আমাদের কোনো কাজে লাগে কি না তা মূল্যায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা উচিত। যদি এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়, আমরা ফিরে আসব। না হলে তারা এটিকে নিজেদের কাছেই রাখুক।’

এর আগে মাসের শুরুতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক আলোচনায় রক্ষণশীল ভাষ্যকার নাসের তোরাবি বলেন, ইরানের জনগণ দাবি করছে—‘আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যায়। হয় আমরা এটি তৈরি করব, না হয় সংগ্রহ করব।’

দুটি সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন মহলেও পারমাণবিক নীতি নিয়ে ব্যক্তিগত আলোচনাও হয়েছে। সেখানে কট্টরপন্থী গোষ্ঠী, বিশেষ করে গার্ড বাহিনী, এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্য অংশের মধ্যে এ ধরনের পদক্ষেপের যুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমাদের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময় ইরান একাধিকবার এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছে, কিন্তু কখনো তা বাস্তবায়ন করেনি। তাই বর্তমান প্রকাশ্য বিতর্কটিও কৌশলগত চাপ তৈরির অংশ হতে পারে।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও বৈজ্ঞানিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছরও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমেয়াদি বিমান অভিযান চালিয়েছিল। এসবের পর ইরান কত দ্রুত বোমা তৈরির পথে এগোতে পারবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইসরায়েল বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছে যে ইরান মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তাদের দাবি, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরান প্রায় অস্ত্রমানের পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও উন্নত। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ কখনোই পাওয়া যায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য ছিল ‘থ্রেশহোল্ড স্টেট’ হওয়া, অর্থাৎ প্রয়োজনে দ্রুত বোমা তৈরি করতে পারবে, কিন্তু সরাসরি অস্ত্র অর্জনের ফলে যে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে তা এড়াবে। আইআরজিসি কমান্ডার এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আগেও সতর্ক করেছিলেন, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে ইরান সরাসরি বোমা তৈরির পথে যাবে। বর্তমান যুদ্ধ সেই পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে।

খামেনির ফতোয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি সেই ফতোয়া দিয়েছিলেন ২০০০-এর দশকের শুরুতে, যদিও এটি কখনো লিখিত আকারে প্রকাশিত হয়নি। ২০১৯ সালেও তিনি একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। দুটি সূত্রের একটির মতে, খামেনি এবং আলি লারিজানির মৃত্যুর পর এখন কঠোর অবস্থানের বিরোধিতা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, লারিজানি ছিলেন এমন কঠোর অবস্থানের ঘোর বিরোধী।

এ ছাড়া খামেনির লিখিত নয় এমন ফতোয়া তাঁর মৃত্যুর পরও বাধ্যতামূলক থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। নতুন সর্বোচ্চ নেতা যদি তা বাতিল না করেন, তবে এটি বহাল থাকতে পারে। নতুন নেতা হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির নাম উল্লেখ করা হচ্ছে, যিনি বাবার মৃত্যুর পর থেকে জনসমক্ষে দেখা দেননি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আ.লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

বিশ্বের সবচেয়ে অপছন্দের দেশের তালিকা প্রকাশ

ইসরায়েলের পরমাণু বোমার তথ্য ফাঁসকারী আরব ইহুদি ভানুনুর ভাগ্যে কী ঘটেছিল

ট্রাম্পের নীতিতে খেপেছে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাতে খুঁজছে দুর্বল জায়গা

গঙ্গাচড়ায় সহিংসতার মামলায় আ.লীগ নেতা গ্রেপ্তার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত