
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান আকাশ যুদ্ধে এযাবৎকাল আমেরিকা বেশ ‘ভাগ্যবান’ ছিল। ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে তারা ২৮টি যুদ্ধবিমান হারিয়েছিল এবং সেই সংঘাতের সময় ইরাক ১৬ জন পাইলট ও ক্রুকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করেছিল। কিন্তু বর্তমান অপারেশন এপিক ফিউরিতে আমেরিকার ক্ষতি কেবল কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর ভুলে তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে গতকাল (৩ এপ্রিল) গণেশ উল্টে গেছে।
ইরানে আকাশসীমায় একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই যুদ্ধবিমানের একজন পাইলটকে উদ্ধার করা গেলেও অন্যজনের ভাগ্য এখনো অজানা।
এদিকে, পৃথক আরেক ঘটনায় একটি এ-১০ ওয়ার্টহগ আক্রমণকারী বিমান পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার একমাত্র পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করছে পেন্টাগন। তবে ইরান যদি কোনো মার্কিন বিমান সেনাকে জীবিত বন্দী করতে পারে, ঘুরে যেতে পারে এই যুদ্ধের মোড়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানে ১২ হাজারের বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং সমপরিমাণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতও করেছে। আকাশ ও ভূমি—উভয় স্থানেই হামলা চালাতে সক্ষম এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানগুলো সম্ভবত জর্ডান থেকে উড়ে এসে এই হামলায় প্রধান ভূমিকা রাখছে এবং অনেক ক্ষেত্রে খুব কাছ থেকে বোমা নিক্ষেপ করছে।
ইতিহাস বলে, আমেরিকার যুদ্ধবিমান হারানোর হার খুবই কম। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরানের বেশির ভাগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, তবে কিছু ব্যবস্থা এখনো সচল রয়েছে যা সুযোগ বুঝে আক্রমণ চালাচ্ছে। ইরানের আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজের দাবি, তারা বিমানটি ভূপাতিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষের ছবিতে ডানা ও লেজের অংশ দেখে ধারণা করা হচ্ছে এটি ইংল্যান্ডের আরএএফ লেকেনহিথ থেকে আসা বিমান। ঘটনাস্থলে একটি খালি ইজেকশন সিটও পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিধ্বস্ত বিমানের ক্রুদের খুঁজতে কুয়েত থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে এইচসি-১৩০ এবং এইচএইচ-৬০ ডব্লিউ হেলিকপ্টার দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে পেন্টাগন। এইচসি-১৩০ বিমানটি একটি উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট, যোগাযোগ এবং জ্বালানি সরবরাহের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে এবং হেলিকপ্টারগুলো ভূপাতিত পাইলটদের উদ্ধার করে। এই উদ্ধার অভিযানগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এগুলো ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বা কাঁধে বহনযোগ্য রকেটের সহজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
কিছু গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া একটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও হামলার শিকার হয়েছিল। তবে সেটি ইরাকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সের তথ্যমতে, এর ক্রুরা সুরক্ষিত আছেন।
এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগলে একজন পাইলট এবং একজন ওয়েপন সিস্টেম অফিসার থাকেন। নিখোঁজ সেই দ্বিতীয় ক্রুর ভাগ্য এখন সুতোয় ঝুলছে। ইরান সরকার নিখোঁজ সেনাকে খুঁজে দিতে পারলে পুরস্কার ঘোষণা করেছে। স্থানীয় একজন নাগরিক ১০ বিলিয়ন তোমান (প্রায় ৬০ হাজার ডলার) দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
এ ছাড়া ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে একটি ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে—‘সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় দেশবাসী, যদি আপনারা শত্রুপক্ষের পাইলটদের জীবিত ধরে পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারেন, তবে আপনাদের মূল্যবান পুরস্কার দেওয়া হবে।’ এই ঘোষণাটি মূলত নিখোঁজ সেনার কাছে পৌঁছানোর জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এক প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে।
বন্দী পাইলটদের নিয়ে যুদ্ধের ইতিহাস
মার্কিন যুদ্ধের ইতিহাসে বন্দী পাইলটরা সব সময়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনাম প্রায় ৫০০ মার্কিন ক্রুকে যুদ্ধবন্দী করেছিল, যাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন প্রয়াত সিনেটর ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাককেইন। ১৯৮৩ সালে লেবাননে সিরীয় বাহিনী একজন মার্কিন নাবিককে ৩০ দিন আটকে রেখেছিল এবং উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর তাঁকে মুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন ভূপাতিত মার্কিন পাইলটদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য করেছিলেন এবং তাদের প্রোপাগান্ডা হিসেবে টেলিভিশনে দেখিয়েছিলেন।
এদিকে যুদ্ধ ছাড়াও শান্তিকালীন সময়ে ইরান মার্কিনিদের আটক করেছিল। ১৯৭৯ সালে দূতাবাসে আটক কূটনীতিকেরা যুদ্ধবন্দী নয় বরং ‘জিম্মি’ ছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালে ১০ জন মার্কিন নৌসেনাকে পারস্য উপসাগরে ফার্সি দ্বীপের কাছে আইআরজিসি আটক করেছিল। তাদের একদিনের কম সময় আটকে রাখলেও হাঁটু গেড়ে বসিয়ে হাত মাথার ওপর রাখা অবস্থায় ছবি তোলা হয়েছিল, যা ছিল চরম অবমাননাকর।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন নেতাদের ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠোর। প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, ইরানের প্রতি ‘কোনো দয়া’ দেখানো হবে না এবং তিনি আকাশ থেকে দিনভর ‘মৃত্যু ও ধ্বংস’ নামিয়ে আনা উপভোগ করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১ এপ্রিল এক ভাষণে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, যা বন্দীদের জীবন আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
যদি ইরান কোনো মার্কিন কর্মকর্তাকে বন্দী করতে পারে, তবে তা তাদের জন্য বড় একটি দর–কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। ট্রাম্প যুদ্ধ আরও ২-৩ সপ্তাহ চলার ইঙ্গিত দিলেও, ইরান যদি জেনেভা কনভেনশন লঙ্ঘন করে কোনো যুদ্ধবন্দীকে টেলিভিশনে প্রদর্শন করে, তবে তাদের সক্ষমতা বাড়বে। পাইলটের অবস্থান গোপন রাখলেও তারা বাড়তি সুবিধা পাবে।
সার্বিকভাবে, পাইলট উদ্ধার হলে এটি আমেরিকার জন্য বড় কোনো সামরিক পরাজয় হবে না, যেমনটি ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার ক্ষেত্রে হয়েছিল (যেখানে তারা একটি স্টেলথ বিমান ভূপাতিত করেছিল)। কিন্তু এবার পাইলট যদি ইরানের হাতে বন্দী হয়, তবে তা মার্কিন জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেবে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে বাধ্য করতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। ইতিমধ্যে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ওয়াটার ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। গত ২ এপ্রিল ইরানের সবচেয়ে বড় সেতু ধ্বংস করে ট্রাম্প দম্ভোক্তি করেছেন। তবে একজন যুদ্ধবন্দীকে উদ্ধারের মরিয়া চেষ্টা এই যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে।
দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনূদিত

চলমান যুদ্ধে এটিই ট্রাম্পের শেষ আলটিমেটাম কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে জল্পনা চলছে। এর আগেও তিনি একাধিকবার এমন সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। এর একটি কালানুক্রমিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
১ ঘণ্টা আগে
ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বিয়ার শেবার কাছে নিওত হোভাব শিল্প এলাকায় কয়েক শ কেজি ওজনের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। উত্তর ইসরায়েলেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
ইরানের সাবেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাসেম সোলেইমানির ভাগনি ও নাতনিকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁদের আইনগত স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ‘গ্রিন কার্ড’ বাতিল করার পর শনিবার (৪ এপ্রিল) এই গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত...
৩ ঘণ্টা আগে
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানকে দেওয়া আগের ১০ দিনের সময়সীমার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, ‘মনে আছে, আমি ইরানকে একটি চুক্তিতে আসার অথবা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য ১০ দিন সময় দিয়েছিলাম? এখন সময় শেষ হয়ে আসছে। আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা বাকি, এরপর তাদের ওপর নরক নেমে আসবে।’
৩ ঘণ্টা আগে