Ajker Patrika

রয়টার্সের বিশ্লেষণ

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে উপসাগরীয় দেশের অর্থনীতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে উপসাগরীয় দেশের অর্থনীতি

ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের যুদ্ধ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৩ দিনের এই সংঘাতের প্রকৃতি পুরো বিশ্বব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অন্যান্য সংঘাতের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত। এই যুদ্ধের জেরে বড় বিপাকে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। এই প্রথম দেশীয় অর্থনীতি নিয়ে চিন্তায় পড়েছে তারা।

দুই সপ্তাহ ধরে চলা এ সংঘাতের কারণে ইতিমধ্যেই সাধারণ ভ্রমণ, বাণিজ্যিক চলাচল, জ্বালানিনির্ভরতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, যুদ্ধের কারণে বেড়ে গেছে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কৌশলগত জোটের যথার্থতা। যেমন সাইপ্রাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশ ইরানের পাল্টা হামলার মুখে পড়েছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, পশ্চিমা নিরাপত্তাবলয়ে যুক্ত হওয়া বাস্তবিক অর্থে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারছে। এ ছাড়া যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও পড়তে পারে, ইউক্রেন যুদ্ধের কৌশলগত হিসাব বদলে দিতে পারে এবং চীনকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমন্বয় করতে বাধ্য করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে এবং হরমুজ দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বন্ধ অব্যাহত থাকলে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামে উল্লম্ফন দেখা দেয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলার। তবে তেল পরিবহন জটিলতার ধাক্কা অর্থনীতির গণ্ডি পেরিয়ে সামরিক দিকেও মোড় নেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন দেশ তাদের জ্বালানি ট্যাংকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে। যেমন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গত সোমবার হরমুজ প্রণালিতে ১০টি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দেন।

এদিকে, চলমান যুদ্ধে চাপে পড়তে যাচ্ছে চীন। বিগত বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে চীনের পণ্যের বিক্রিও কমতে পারে। তবে তেলের দাম বাড়ায় উপকৃত হচ্ছে রাশিয়া। এতে তাদের জ্বালানি আয় বাড়ছে, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধের অর্থ জোগাতে সহায়তা করছে। এদিকে, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ইউক্রেন। ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের আশঙ্কা, ইরানের যুদ্ধ নিয়ে মার্কিনিদের ব্যয় যত বৃদ্ধি পাবে, ইউক্রেনের নিরাপত্তা সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা তত কমবে।

ইরানের যুদ্ধ নিয়ে শরণার্থীর ঢেউ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছে ইউরোপ। তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি ধসে পড়লে নতুন করে অভিবাসনের ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে, বিশেষ করে ইরান-তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে। এতে ইউরোপে এক দশক আগের মতো অভিবাসন সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

চলমান যুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের অর্থনীতি মূলত বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার এবং স্থিতিশীল বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। তবে আকাশসীমায় বিধিনিষেধের কারণে অনেক এয়ারলাইনসকে ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করতে হয়েছে বা বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন এই অঞ্চলে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর উত্থানের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল এ দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত গড়ে উঠেছে এই বিশ্বাসের ওপর যে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলো যথেষ্ট স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। এ কারণেই এই অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তবে বিগত দিনগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ নির্ভরতার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই আস্থা আর কখনো ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রথম আঘাত আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) হামলার ঘটনায়। যেমন দুবাই সম্পর্কে বিশ্বাসটা হলো, আঞ্চলিক অস্থিরতা এর সীমানায় এসে থেমে যায়। অথচ বিমানবন্দর ও বিলাসবহুল স্থাপনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সে ভাবমূর্তিতে ফাটল ধরিয়েছে।

দ্বিতীয় ধাক্কাটি অর্থনৈতিক। যুদ্ধ শুরুর পর গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বৃহত্তম সরবরাহকারী কাতার এনার্জি, সৌদি আরামকোর মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার ফলে যে সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা আগে অকল্পনীয় মনে হতো। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং উদার সামাজিক চুক্তি বজায় রাখার সামর্থ্য মূলত নিরাপদ জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভর করে। অথচ সে ধারণাটিই এখন হঠাৎ ধসে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কারণ এ দেশগুলোর আসল শক্তি শুধু অর্থসম্পদ নয়; বরং বিশ্বাসযোগ্যতা। তারা এত দিন বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশের আশ্বাস দিতে পারত। তবে এখন সে ধারণা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত