Ajker Patrika

সাজা খেটে মৃত্যুর ৯ বছর পর খালাস পেলেন তিনি

এস এম নূর মোহাম্মদ, ঢাকা
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০: ৩১
সাজা খেটে মৃত্যুর ৯ বছর পর খালাস পেলেন তিনি

রাস্তা পুনর্নির্মাণে কাবিখার ২৬৬ মণ গম আত্মসাতের অভিযোগে ১৯৮৭ সালে কিশোরগঞ্জের হোসেন্দী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং তিন মেম্বারকে আসামি করে মামলা করেছিল তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ওই মামলায় তাঁদের প্রত্যেককে ছয় বছর করে কারাদণ্ড এবং সবাইকে একসঙ্গে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন আদালত। আসামিরা ১৯৯০ সালে হাইকোর্টে আপিল করেন, যা নিষ্পত্তি হয়েছে এ বছর। রাষ্ট্রপক্ষ যথাযথভাবে প্রমাণ করতে না পারায় সবাইকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। কিন্তু এই রায় আর শোনা হয়নি মামলার আসামি মঞ্জুরুল হকের। ২০১৩ সালে মারা যান তিনি। 

এ ছাড়া আত্মসাতের মামলায় খালাস পাওয়া বাকি তিন আসামিও এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। যদিও মোট চার আসামির মধ্যে তিনজন এ মামলায় সাড়ে তিন বছর এবং একজন আড়াই বছর সাজা খেটেছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া খালাস পাওয়ার খবরও জানতেন না তাঁরা। এই প্রতিবেদক যোগাযোগ করার পরই তাঁরা বিষয়টি জানতে পেরেছেন বলে জানান ওই মামলার আসামিরা। 

মামলায় খালাস পাওয়া আব্দুল হাই মাস্টার আজকের পত্রিকাকে বলেন, মামলার পর সন্তানদের নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। মামলার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। পরে আপিল করলে হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের জামিন পেয়েছিলেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হলে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যেতে হয়। সাড়ে তিন বছর সাজা খাটার পর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের সময় ক্ষমা পান তিনি। তিনি বলেন, ‘মামলার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। কারণ, আমি তো চেয়ারম্যান থাকাবস্থায় অন্যায়ভাবে কোনো সম্পদ জমা করিনি। যা বরাদ্দ এসেছে, সবই জনগণের কল্যাণে খরচ করেছি। তবে সমাজের লোকজন জানত আমি কোনো অন্যায় করিনি। এ কারণে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর আবারও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলাম।’ 

মামলা থেকে খালাস পাওয়ার খবরটি জীবদ্দশায় পাননি মঞ্জুরুল হক। এ রায়ের নয় বছর আগেই মারা গেছেন তিনি। তাঁর ছেলে জুলকারুল হক ঝড়ু আজকের পত্রিকাকে বলেন, তাঁর বাবা ২০১৩ সালে মারা গেছেন। মামলার কারণে বাবাকে জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। তখন তাঁরা ভাইবোনরা অনেক ছোট। বাবা কারাগারে যাওয়ায় তাঁদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন কোনো রকমে চলছে সংসার। ঝড়ু বললেন, ‘বাবা ছিলেন সহজ সরল। তাঁকে বিনা অপরাধে ফাঁসানো হয়েছিল। বাবা মামলার চিন্তায়ই মারা গেছেন। একটাই আক্ষেপ, বাবা বেঁচে থাকতে জানতে পারলেন না আদালত তাঁকে নির্দোষ হিসেবে খালাস দিয়েছেন।’ 

জানা যায়, কিশোরগঞ্জের হোসেন্দী ইউনিয়নের হোসেন্দী কাচারিবাড়ি থেকে পাকুন্দিয়া কলেজ পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পের জন্য সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তর কাবিখার ১৫ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ করে। হোসেন্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই মাস্টারকে স্থানীয় প্রকল্প কমিটির চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্য মঞ্জুরুল হককে কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। সদস্য করা হয় ইউপি সদস্য মনসুরুল হক ও আব্দুল জব্বারকে। 

স্থানীয় প্রকল্প কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল হাই মাস্টার ওই কাজের জন্য ১৯৮৭ সালের ২৬ মে ১০ মেট্রিক টন গম খাদ্যগুদাম থেকে উত্তোলন করেন। তবে সেখান থেকে কাজের অনুপাতে ২৬৬ মণ ২২ সের গম আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে, যার তৎকালীন বাজার মূল্য ছিল ৪৯ হাজার ৬৪৫ টাকা। এই অভিযোগে ১৯৮৭ সালের ৩০ জুন পাকুন্দিয়া থানায় মামলা করেন তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর জেলা কর্মকর্তা আহাম্মদ আলী। মামলায় চেয়ারম্যানসহ চারজনকে আসামি করা হয়। 

ওই মামলায় ১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই চার্জশিট দেন তদন্ত কর্মকর্তা। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯০ সালের ৮ নভেম্বর রায় দেন আদালত। রায়ে চার আসামির প্রত্যেককে ৬ বছর করে কারাদণ্ড এবং সবাইকে একসঙ্গে ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রায়ের পর একই বছর আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করেন। এর পর থেকে মামলাটি পড়ে ছিল। প্রধান বিচারপতি পুরোনো মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দিলে বিষয়টি শুনানির জন্য সামনে আসে। 

দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ওই মামলার সব আসামিকে খালাস দিয়ে রায় দেন। খালাস পাওয়া মনসুরুল হক বলেন, ‘আমি আড়াই বছরের মতো সাজা খেটেছি। বাকি তিনজন সাড়ে তিন বছর করে সাজা খেটেছেন। সমাজের লোকজন জানত আমাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তবে আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। জমি বিক্রি করতে হয়েছিল। এখন তেমন কিছুই নেই আমাদের। একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। কারাগার থেকে বের হয়ে বিদেশেও যেতে হয় আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে। যারা মিথ্যা মামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁরা সবাই মারা গেছেন। তাঁদের তো শাস্তি দেওয়ার কিছু নেই।’ নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরে এই বয়সে বরং আর্থিক সহযোগিতা চাইলেন তিনি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে থাকা আইনজীবী শাহীন আহমেদ বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। এটা বিচারপ্রার্থীর সাংবিধানিক অধিকার। অনেক সময় আসামি দণ্ড মাথায় নিয়ে মারা যায়, পরবর্তীকালে খালাস পায়। এতে আসামি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত