Ajker Patrika

কোচের বাজিতে গোলপোস্টে বাজিমাত

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
কোচের বাজিতে গোলপোস্টে বাজিমাত
তুরস্কের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দলকে জয় এনে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচ। ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল মাঠে রূপকথার গল্পগুলো সাধারণত লেখা হয় ফরোয়ার্ডদের জাদুকরি পায়ের ছোঁয়ায়। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ গতকাল ভ্যাঙ্কুভারের রাতটি উপহার দিল ভিন্ন এক মহাকাব্য, যার নায়ক ২২ বছর বয়সী গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচ। ১০৪ ম্যাচ খেলা অভিজ্ঞ অধিনায়ক ম্যাথিউ রায়ানকে বেঞ্চে বসিয়ে যখন এই তরুণকে নামিয়ে যে বাজি ধরলেন অস্ট্রেলিয়া কোচ টনি পোপোভিক, তখন অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন।

প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে আগে কখনো অভিষেক না হওয়া বিচ কি পারবেন বিশ্বকাপের চাপ সামলাতে? কিন্তু ম্যাচ শেষে দেখা গেল, তুরস্কের আক্রমণভাগের সামনে অদম্য সাহসের এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। জোয়ারের মুখে বালির দুর্গের মতো হারিয়ে না গিয়ে খাঁটি অস্ট্রেলিয়ান মানসিকতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে তিনি উপহার দিলেন এক ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স। যে পারফরম্যান্সে ভর করে অস্ট্রেলিয়া মাঠ ছাড়ে ২-০ গোলের দারুণ জয় নিয়ে।

পুরো ম্যাচে তুরস্কের ফুটবলাররা অন্তত ৩০টি শট নিয়েছেন গোলমুখে। ২০০৬ বিশ্বকাপের পর কোনো জয়ী দলের এত বেশি শট হজম করার রেকর্ড নেই। তবে তুরস্কের সেই আক্রমণের সুনামি একাই সামলেছেন বিচ। আটটি চোখধাঁধানো সেভ করেছেন তিনি, যা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ান গোলরক্ষকদের মধ্যে নতুন রেকর্ড। একই সঙ্গে ২০০২ সালে তুরস্কের রুস্তু রেকবারের পর বিশ্বকাপের অভিষেকে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ডও এটি। প্রথমার্ধে আব্দুলকেরিম বারদাকচির ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া উড়ন্ত ভলি যেভাবে আঙুলের ডগায় লাগিয়ে পোস্টে পাঠিয়েছিলেন, তা টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সেভ হয়ে থাকবে। বিরতির পর আরদা গুলেরের ফ্রি-কিকটিও রুখে দেন তিনি। শুধু শট ঠেকানোই নয়, বল পায়ে রেখে মাথা ঠান্ডা রেখে যেভাবে আক্রমণ তৈরি করেছেন, তাতে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না।

বিশ্বমঞ্চে এমন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পেছনে কোচের আস্থার কথা বলতে গিয়ে ম্যাচ শেষে প্যাট্রিক বিচ বলেন, ‘কয়েক দিন আগে বস আর গোলকিপিং কোচ আমাকে ডেকে বললেন যে আমি খেলছি। তাঁরা বললেন, আমার ওপর তাঁদের পূর্ণ আস্থা আছে। এই কথাটাই আজ রাতে মাঠে নেমে নিজের কাজটা করার জন্য প্রয়োজনীয় সবটুকু আত্মবিশ্বাস জুগিয়ে দিয়েছিল।’

টুর্নামেন্টের তৃতীয় পছন্দের গোলরক্ষক থেকে রাতারাতি মূল একাদশে জায়গা পাওয়া বিচের জন্য দলের সিনিয়রদের ভূমিকাও ছিল অনন্য। রায়ান ও পল ইজোর কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের কথা স্মরণ করে বিচ বলেন, ‘ম্যাটি আর পলি আমার জন্য দারুণ ভূমিকা রেখেছেন। ম্যাচের আগে আমার সঙ্গে কথা বলে তাঁরা আমাকে একদম শান্ত ও চাপমুক্ত রেখেছিলেন। স্রেফ বলেছিলেন—মাঠে যাও, উপভোগ করো, নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলো, সবাই জানে তোমার সামর্থ্য কতটুকু।’

ম্যাচের আগে তুরস্কের অধিনায়ক হাকান চালহানোগ্লু হুংকার দিলেও মাঠের লড়াইয়ে সেই জবাব পারফরম্যান্স দিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দলগত এই স্পিরিট নিয়ে বিচ বলেন, ‘এই যারা বিশ্বমঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার জন্য ভালো করতে মরিয়া। আমরা মুখে খুব বেশি কথা বলা পছন্দ করি না।’ ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে যখন সাউন্ড সিস্টেমে বেজে উঠছিল অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত গান ‘ডাউন আন্ডার’, তখন হাজার হাজার ভক্তের সঙ্গে উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন বিচ। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এই তরুণ আবেগময় কণ্ঠে বলেন, ‘এটি শৈশবের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো এক রাত। বিশ্বমঞ্চে নিজের দেশের হয়ে খেলাটাই তো চূড়ান্ত লক্ষ্য, আর প্রথম ম্যাচেই এমন একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভালো ফলাফল পাওয়াটা সত্যিই সেরা এক অনুভূতি।’

তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এই ২-০ ব্যবধানের জয় কেবল তিনটি পয়েন্ট নয়, ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিল এক নতুন নক্ষত্রকে, যিনি কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়ে চাপের মুখেও অবিচল থাকতে জানেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত