Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে সংকট: জ্বালানি-রেমিট্যান্সে নতুন শঙ্কা

রোকন উদ্দীন, ঢাকা
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ১১: ০৯
মধ্যপ্রাচ্যে সংকট: জ্বালানি-রেমিট্যান্সে নতুন শঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা এখনো সামলে উঠতে পারেনি বিশ্ব। এরই মধ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। এ সংঘাত এখন শুধু এই তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোও জড়িয়ে পড়ায় পুরো অঞ্চল অস্থির হয়ে উঠেছে। আর সেই অস্থিরতার সরাসরি কেন্দ্রে না থেকেও তার তীব্র চাপ অনুভব করছে বাংলাদেশ। কারণ জ্বালানি, রপ্তানি, আমদানি, শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স—সবখানেই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের রয়েছে বেশি নির্ভরতা। এখন সেখানেই সৃষ্টি হয়েছে নতুন শঙ্কা। প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এর ধাক্কা কতটা সামলাতে পারবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা জ্বালানি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। এই পথ বন্ধ বা ঝুঁকিতে পড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ে। ইতিমধ্যে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ দেখা গেছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাত অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের সামান্য পরিবর্তনও দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, বাড়ায় ভর্তুকির চাপ এবং শেষ পর্যন্ত প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

দ্বিতীয় বড় ধাক্কা আসতে পারে রপ্তানি খাতে। ইপিবির তথ্য বলছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ইরানে রপ্তানি হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ ডলারের পণ্য, যার মধ্যে ১ কোটি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৮৯৮ ডলারের পাটের সুতা, ৯৫ হাজার ৩১০ ডলারের নিট পোশাক এবং ৯ হাজার ৩৫১ ডলারের ওভেন পোশাক। অঙ্কটি তুলনামূলক ছোট হলেও কৌশলগতভাবে তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আরও বড় বাজার হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। শীর্ষ ২০ রপ্তানি বাজারের তালিকায় রয়েছে দেশ দুটি। গত অর্থবছরে আমিরাতে রপ্তানি হয়েছে ৩৫ কোটি ডলারের বেশি, আর সৌদি আরবে ২৯ কোটি ডলারের বেশি। যুদ্ধের বিস্তার হলে এ বাজারগুলোতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

পরিবহন ব্যয়ও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার কারণে জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপগামী অনেক জাহাজ এই রুট ব্যবহার করে। বিকল্প পথে গেলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়বে।

নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন সংকট। কার্গো ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে পড়ায় জরুরি চালান সময়মতো পাঠানো কঠিন হয়ে যেতে পারে। এতে ক্রেতাদের আস্থা নড়বড়ে হবে, সময়সীমা মেনে ডেলিভারি দেওয়াও ঝুঁকির মুখে পড়বে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। বিকল্প রুটে গেলে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়বে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সামনে আরও বড় চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রেমিট্যান্সও বড় ঝুঁকিতে। বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের অর্ধেকের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তা, চাকরি ও আয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। বায়রার সাবেক সভাপতি গোলাম মুস্তাফা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাপক হারে চাকরিচ্যুতি বা ওভারটাইম কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। তখন চাপ পড়বে রিজার্ভ ও বিনিময় হারে।

অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ মনে করেন, যুদ্ধ অনেকটাই একপেশে এবং দীর্ঘায়িত নাও হতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শক্তির ভারসাম্য একদিকে বেশি থাকায় সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, পরিস্থিতি যদি দীর্ঘ হয় তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং রপ্তানিকারকদের সক্রিয় সমন্বয় জরুরি।

পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, বাংলাদেশ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে না থাকলেও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বাড়বে, বাড়বে উৎপাদন খরচ। তার প্রভাব পড়বে রপ্তানির প্রতিযোগিতায়। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাপ সৃষ্টি হবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দ্রুত ও সমন্বিত নীতি-প্রতিক্রিয়া। বাণিজ্য, প্রবাসীকল্যাণ ও বেসামরিক বিমান চলাচল—সব মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো সক্রিয় রাখতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আয়ের বিষয়ে দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে নিবিড় যোগাযোগ রাখতে হবে। ব্যবসায়ীদেরও ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত