Ajker Patrika

টিআইএন বাধ্যবাধকতা: ব্যাংক হিসাব-সঞ্চয়ে ভাটা পড়ার ভয়

শাহ আলম খান, ঢাকা 
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩: ৩১
টিআইএন বাধ্যবাধকতা: ব্যাংক হিসাব-সঞ্চয়ে ভাটা পড়ার ভয়

ঢাকার কেরানীগঞ্জের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রতিদিনের আয় থেকে ২০০-৩০০ টাকা করে জমিয়ে মাস শেষে ব্যাংকে রাখেন। রাজশাহীর এক কৃষিশ্রমিক মৌসুম শেষে কয়েক হাজার টাকা সঞ্চয় করে হিসাব খুলতে চান। ময়মনসিংহের এক গৃহকর্মী মেয়ের পড়াশোনার জন্য ছোট একটি ডিপিএস করতে চান। তাঁদের কারও আয় করযোগ্য নয়। কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। কিন্তু আগামী দিনে ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে তাঁদের সবারই ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) লাগবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্টসহ বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া সবার জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ জমা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, করের আওতা বাড়াতে এবং অর্থনীতিকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতে এ উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন সংযুক্ত হলে আয় ও সম্পদের তথ্য বিশ্লেষণ সহজ হবে, করফাঁকি শনাক্ত করাও কার্যকর হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ ২০২৫’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো ৫৭ শতাংশ মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে। মাত্র ৪৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আর্থিক হিসাব রয়েছে। বিশ্ব গড় যেখানে ৭৩ থেকে ৭৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। ফলে সরকার যখন আরও বেশি মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আনার চেষ্টা করছে, তখন নতুন এই শর্ত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

দেশের প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লাখ মানুষের মধ্যে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। তাদের বড় অংশের কোনো করযোগ্য আয় নেই। কিন্তু নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ সঞ্চয় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে তাদের একটি বড় অংশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে নো-ফ্রিলস ব্যাংক হিসাবের (দরিদ্রদের জন্য বিশেষ হিসাব) সংখ্যা ৩ কোটি ৪২ লাখ ছাড়িয়েছে। এসব হিসাবে জমা হয়েছে ৭ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ধীরে ধীরে বাড়ছে। কিন্তু নতুন প্রস্তাব সেই যাত্রাপথকে জটিল করে তুলবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ সহজ ও অবাধ হলে মানুষের আর্থিক কর্মকাণ্ডও ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে চলে আসে। তাই প্রকৃত করফাঁকিদাতা ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পরিবর্তে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক শর্ত আরোপ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।’

দেশে বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখ টিআইএনধারী রয়েছেন। কিন্তু রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪৬ লাখ ব্যক্তি। অর্থাৎ ৬২ শতাংশ টিআইএনধারীই নিয়মিত কর ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। এর মধ্যেই সাধারণ মানুষের কাছে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে—টিআইএন মানেই কর অফিস, রিটার্ন এবং ভবিষ্যতের ঝামেলা।

তবে সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এই উদ্যোগকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়েছে। সেগুলোকে হিসাবের মধ্যে আনতে ব্যাংক হিসাবে টিআইএন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে।’ তাঁর মতে, টিআইএন গ্রহণ এবং করযোগ্য হওয়া এক বিষয় নয়। বড় লেনদেন বা উল্লেখযোগ্য আমানত থাকলেই শুধু করের প্রশ্ন আসে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরীও মনে করেন, নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে শুরুতে ভয় ও বিভ্রান্তি থাকতেই পারে। তবে সেই বিভ্রান্তি দূর করার দায়িত্ব সরকারের। মানুষের কাছে পরিষ্কার করতে হবে যে টিআইএন থাকলেই কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।

তবু বাস্তবে মানুষের আচরণে ভয়ের প্রভাব স্পষ্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমি কর দিই না, কারণ আমার আয় করযোগ্য নয়। কিন্তু ব্যাংক হিসাব খুলতে যদি টিআইএন লাগে, পরে কোনো ঝামেলায় পড়ব কি না, সেই ভয় থাকে।’

কর বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকারদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এ ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকের পরিবর্তে ঘরে টাকা রাখতে শুরু করলে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ার গতি কমে যাবে, নগদনির্ভরতা বাড়বে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর সরকারি প্রচেষ্টাও চাপের মুখে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান গতকাল রোববার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রমের গতিতে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি এখনো একটি প্রস্তাব। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে এবং প্রয়োজন মনে করলে এ বিধান বাদও দেওয়া হতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত