Ajker Patrika

জিএফআইয়ের প্রতিবেদন

বাণিজ্যের আড়ালে ১০ বছরে পাচার ৮ লাখ কোটি টাকা

  • শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নবম।
  • মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশই মিথ্যা ঘোষণা।
  • অর্থ পাচার বন্ধে কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও আমদানি-রপ্তানির ডিজিটাল যাচাইয়ের সুপারিশ।
‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
বাণিজ্যের আড়ালে ১০ বছরে পাচার ৮ লাখ কোটি টাকা

বাণিজ্যের খাতায় হিসাব মেলে; কিন্তু বাস্তবে বড় ফাঁক থেকেই যাচ্ছে। সেই ফাঁক দিয়ে গত এক দশকে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। এ সময়ে আমদানি-রপ্তানির মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার পাচার করা হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)। সেই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে—যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ১৬ শতাংশের সমান।

বাণিজ্যের আড়ালে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) হালনাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের বৈশ্বিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখানো হয়েছে, যত বড় বাণিজ্য, ততই সেখানে গরমিলের সুযোগ স্পষ্ট হয়েছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অর্থ পাচারের এই মহামারি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এশিয়ার উন্নয়নশীল ও বড় অর্থনীতির দেশগুলো আরও বেশি আক্রান্ত। তথ্যমতে, গত এক দশকে চীন থেকে ৬ দশমিক ৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশটির মোট বাণিজ্যের ২৪.৯ শতাংশ। একইভাবে থাইল্যান্ডে এই অঙ্ক ১ দশমিক ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার ও ভারতের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ০৬ ট্রিলিয়ন ডলার—এই দুই দেশ থেকেই মোট বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশের কাছাকাছি অংশ মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পাচার হয়ে গেছে।

মোট ২৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে জিএফআই দেখিয়েছে, পাচার হওয়া অর্থের বড় অংশ, যার পরিমাণ ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলারই গেছে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয়। তবে শতকরা হিসাবে বাংলাদেশ শীর্ষে না থাকলেও ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়। বরং ফিলিপাইন মোট বাণিজ্যের ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ হারিয়ে শীর্ষে রয়েছে, এরপরই চীন ও পূর্বতিমুরের অবস্থান। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ পাচারের বড় অংশই ঘটেছে রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণা এবং আমদানি-রপ্তানির মূল্য ইচ্ছাকৃতভাবে কম বা বেশি দেখানোর মাধ্যমে। বাণিজ্যিক চালানে তথ্য বিকৃত করে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার এ কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

এর আগেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানায়, ২০০৯-২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। ওই সময়ের বাজারদরে যার পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। গড়ে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশ ছাড়ে।

জিএফআইয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের সাড়ে ১৫ শতাংশ অর্থ পাচার হয়েছে, ২০১৬ সালে তা বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১৭ সালে একই প্রবণতা থাকলেও ২০১৮ সালে কিছুটা কমে ১৫ শতাংশের আশপাশে নামে। ২০১৩-২২ সালের মধ্যে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে গরমিলের পরিমাণ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এ ধরনের অর্থ পাচার উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য বড় বাধা। এতে কর রাজস্ব কমে, বাজেট ঘাটতি বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয় এবং দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি বাড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আমদানি-রপ্তানি তথ্যের ডিজিটাল যাচাই, আঞ্চলিক ডেটা শেয়ারিং, ফ্রি ট্রেড জোনে নজরদারি জোরদার এবং বেনামি কোম্পানির মালিকানা তথ্য প্রকাশের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে জিএফআই।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত