Ajker Patrika

বারবার হোঁচটের পর নতুন লক্ষ্য সংযম

মাহফুজুল ইসলাম, ঢাকা
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮: ২১
বারবার হোঁচটের পর নতুন লক্ষ্য সংযম

দেশের উন্নয়ন বাজেটের সাম্প্রতিক ইতিহাস যেন বড় লক্ষ্যের ঘোষণা আর সীমিত বাস্তবায়নের এক পুনরাবৃত্ত গল্প। অর্থবছর শুরু হয় উচ্চাভিলাষী অঙ্ক দিয়ে। সংখ্যার ভেতরেই থাকে অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময় যত এগোয়, বাস্তবতা তত স্পষ্ট হয়। মাঝপথে আসে সংশোধন, কাটছাঁট হয় লক্ষ্য। আর বছর শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশই থেকে গেছে অব্যবহৃত।

গত কয়েক বছরে বিগত সরকারগুলোর নেওয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণেও একই ধারা দেখা গেছে—ঘোষণা পায় জোরালো, কিন্তু বাস্তবায়নের গতি থাকে একেবারেই দুর্বল। লক্ষ্য বড় ছিল, অর্জন তুলনায় ছোট। এই ব্যবধানই এখন উন্নয়ন বাজেট আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এই দীর্ঘ ব্যবধান আর বারবার লক্ষ্য আর অর্জনের অমিল বিবেচনা করেই আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় এডিপি আগের লক্ষ্যগুলো থেকে বড় পরিসরে কমিয়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার সুপারিশ রেখে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থাৎ এবার কেবল অঙ্ক নির্ধারণ নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে বলা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে বড় লক্ষ্য ঠিক করলেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় না, বরং লক্ষ্য যাই হোক-কার্যকর বাস্তবায়নই হলো শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন বাজেটের আসল মাপকাঠি। মূলত—এই শিক্ষা থেকেই আগামী উন্নয়ন পরিকল্পনায় সংযমের সুপারিশ।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান সেই চিত্রই তুলে ধরে। ২০২১–২২ অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়ন হয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি। ২০২২–২৩ অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা, শেষে বাস্তবায়ন ব্যয় নেমে দাঁড়ায় ২ লাখ ১ হাজার কোটিতে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি, বাস্তবায়ন হয় মাত্র ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। পরিস্থিতি আরো তীব্র হয় ২০২৪–২৫ অর্থবছরে। ওই সময় এডিপির বরাদ্দ ধরা হয় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। বছর শেষে বাস্তবায়ন নেমে আসে মাত্র ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটিতে।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরুতে এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকায় নামানো হয়। এই লক্ষ্যের বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ ও বাস্তব ব্যয়ের ব্যবধান বড় হয়ে ওঠে। এই ধারাবাহিকতার ভেতরেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যয়ে হ্রাসকৃত লক্ষ্যের এই নতুন প্রস্তাব।

সদ্য সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছেন, বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এবার কাগুজে উচ্চাভিলাষ নয়, বাস্তবসম্মত পরিসরই অগ্রাধিকার পেয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সচিব বলেন, অতীতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য ছিল না। অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি, বরাদ্দের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকেছে। সেই অভিজ্ঞতাই সংযত লক্ষ্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, উন্নয়ন বাজেটের আকার নির্ভর করবে সরকারের দক্ষতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর। জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ অনেক সময় যথেষ্ট নয়, আবার বরাদ্দ হলেও তার পুরোটা বাস্তবায়িত হয় না। বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন সরকারকে বাজেট প্রণয়নে পুরোনো ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আগামী বাজেটে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, ২০৩২ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য, ঋণ নির্ভরতা কমানো, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত